প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি

সাইফুল্লাহ কায়সার | শুক্রবার , ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ at ৫:১২ পূর্বাহ্ণ

একবিংশ শতাব্দীতে একটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রযুক্তি। আধুনিক বিশ্বে যে দেশ উদ্ভাবনে যত উন্নত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ তত জোরালো। দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গত এক দশকে ডিজিটাল বিপ্লবের পথে হাঁটলেও, প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা এবং গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছি। বিশেষ করে চীনের মতো বৈশ্বিক টেকজায়ান্টে রূপান্তরিত হওয়া দেশগুলোর তুলনায় আমাদের প্রকৌশলীদের সক্ষমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ব্যবধান আজ স্পষ্ট।

যেকোনো দেশের টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হলো তার গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। বাংলাদেশে গবেষণা কেন্দ্রের সংখ্যা কেবল অপ্রতুলই নয়, বরং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোতে বিশ্বমানের উদ্ভাবনী কার্যক্রমের অভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষা মূলত তাত্ত্বিক ও রক্ষণাবেক্ষণ (Maintenance) কেন্দ্রিক। ফলে আমাদের প্রকৌশলীরা বিদ্যমান প্রযুক্তি সচল রাখতে দক্ষ হলেও নতুন কিছু উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকছেন।

অন্যদিকে, চীনের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিল্প সংস্কৃতি প্রকৌশলীদের “Hands-on Experienceবা সরাসরি যন্ত্রাংশ নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করে। চীনের প্রকৌশলীরা তাত্ত্বিক জ্ঞানের চেয়ে ব্যবহারিক প্রয়োগে বেশি জোর দেন, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় কয়েক ধাপ এগিয়ে রেখেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীন প্রতি বছর প্রায় ১৩১৪ লক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। বিশাল এই জনশক্তি কেবল সংখ্যার দিক থেকেই নয়, কাজের গতি এবং স্কেলের দিক থেকেও অনন্য। চীনের প্রকৌশলীরা বিশাল অবকাঠামো প্রকল্পে কাজ করার সুবাদে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে প্রকল্প শেষ করতে অভ্যস্ত। বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা ব্যক্তিগত মেধার স্বাক্ষর রাখলেও বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়ন বা উচ্চ গতির কাজের অভিজ্ঞতায় এখনো পিছিয়ে আছেন।

আমাদের দেশে বড় প্রকল্পগুলোতে এখনো বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, যা দেশীয় মেধা বিকাশের পথকে সংকুচিত করছে। অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (ASPI)-এর তথ্যমতে, বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৬৪টি প্রযুক্তির মধ্যে ৫৭টিতেই চীন উন্নত দেশগুলোর সমকক্ষ বা শীর্ষে অবস্থান করছে। চীনের এই সাফল্যের মূল কারণ হলো তাদের প্রতিযোগিতামূলক কাজের পরিবেশ এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। তারা পশ্চিমা কর্পোরেশনগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

ভারতের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষায় ভারত কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে থাকলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান এবং কারিগরি সরবরাহের সূচকে চীন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের জন্য এই মডেলটি একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তা অনস্বীকার্য। তবে এই নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত চীনের প্রযুক্তি কেবল ব্যবহার করা নয়, বরং সেই প্রযুক্তিকে ভিত্তি হিসেবে ধরে দেশীয় দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করা। বর্তমানে আমাদের প্রকৌশলীদের উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত, যা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে হলে সরকারের দৃষ্টি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো এই পরিবর্তন আনতে পারে: গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি: জাতীয় বাজেটে গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি স্থাপন।

শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন: প্রকৌশল শিক্ষাকে রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রিকতা থেকে বের করে উদ্ভাবন ও ব্যবহারিক প্রয়োগমুখী করা। শিল্পএকাডেমিয়া সংযোগ: কলকারখানার বাস্তব সমস্যার সমাধান যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করা। বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে হলে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের মেধা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, প্রয়োজন শুধু সঠিক প্ল্যাটফর্ম এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। চীন যেভাবে নিজেদের রক্ষণশীল অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিগত পরাশক্তিতে রূপান্তর করেছে, সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকেও তার গবেষণা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। তবেই প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি ও ডিজিটাল বিপ্লব পূর্ণতা পাবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধভূমির ক্ষতিপূরণ পেতে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর প্রতি আবেদন
পরবর্তী নিবন্ধভালোবাসা ও বিরহের মুখোমুখি জীবন