প্রবাহ

প্রসঙ্গ : ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ

আহমদুল ইসলাম চৌধুরী | বুধবার , ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৪৬ পূর্বাহ্ণ

সম্প্রতি আইনমন্ত্রীর একটি বক্তব্য বেশ সাড়া জাগিয়েছে। তিনি মূলত বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের দেশের ইসলামী ব্যাংকগুলোতে টাকা আমানত রাখার বিনিময়ে যে লভ্যাংশ দেওয়া হচ্ছে, তা সুদমুক্ত কি না, কিংবা লভ্যাংশ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে কি না। দেশের বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংক জমাকৃত টাকার উপর গ্রাহকদের একটি নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। আবার কয়েক বছর বা নির্দিষ্ট মেয়াদে টাকা জমা রাখলে আরও বেশি লভ্যাংশ দেওয়া হয়; যেখানে ক্ষতির কোনো আশঙ্কা থাকে না।

১৯৮০এর দশকে ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে প্রথম এই ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ধারণা করা হয়েছিল, ইসলামী ব্যাংক যেহেতু ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক পরিচালিত হবে, তাই এখানে সুদের কোনো প্রশ্নই আসবে না। এর কিছুদিন পর আলআরাফাহ ইসলামী ব্যাংকপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রচলিত সুদি ব্যাংকও তাদের নিজস্ব ইসলামী ব্যাংকিং শাখা চালু করে।

আমাদের দেশের উচ্চমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সাধারণত ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে ভয় পায়, কারণ ব্যবসায় লাভের পাশাপাশি লোকসানের ঝুঁকিও থাকে। ফলে ইসলামী ব্যাংক বা প্রচলিত সুদি ব্যাংকের ইসলামী শাখাগুলোতে টাকা রাখা তারা নিরাপদ মনে করে। এতে চোরডাকাতির ভয় যেমন থাকে না, তেমনি মূলধন বা টাকার কোনো ক্ষতি বা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে না। বরং এককালীন বা মাসিক নির্দিষ্ট হারে লভ্যাংশ পেয়ে থাকে।

এই ইসলামী ব্যাংকগুলোতে একটি করে ‘শরিয়াহ বোর্ড’ বা কাউন্সিল থাকে। দেশের বিশিষ্ট কোনো আলেম এই বোর্ডের প্রধান হন এবং ন্যূনতম ৩ থেকে ৪ জন প্রখ্যাত আলেম এর সদস্য হিসেবে থাকেন। ব্যাংক এর প্রতিনিধি হিসেবে শরিয়াহ বোর্ডের দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য ম্যানেজিং ডাইরেক্টর (এমডি) এই বোর্ডের সদস্য সচিব বা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

দীর্ঘ প্রায় ৪০৪৫ বছর ধরে বাংলাদেশে এই ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও সাধারণ ব্যাংকের ইসলামী শাখাগুলোর কার্যক্রম চলছে। ধর্মপ্রাণ লাখ লাখ মানুষ সুদমুক্ত লভ্যাংশ পাওয়ার আশায় এসব ব্যাংকে টাকা জমা রাখছেন। এমন অনেকেই আছেন যারা চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে কিংবা জমিজমা বিক্রি করে সমস্ত সঞ্চয় সুদমুক্ত মনে করে ব্যাংকে রেখেছেন। তারা এই লভ্যাংশের টাকায় প্রতি মাসে পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন।

শুরুর দিকে ইসলামী ব্যাংকে টাকা জমা রেখে লভ্যাংশ নেওয়া নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা বা সমালোচনা ছিল না। মানুষের মাঝে এক ধরনের ধর্মীয় আবেগ কাজ করত। যেহেতু ইসলামী ব্যাংকনাম এবং দেশের বিজ্ঞ আলেমদের নিয়ে শরিয়াহ বোর্ড গঠিত, তাই এই লভ্যাংশ যে সম্পূর্ণ সুদমুক্ততা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে কোনো দ্বিধা ছিল না।

তবে বিগত ২০২৫ বছরের ব্যবধানে এই লভ্যাংশ কতটুকু সুদমুক্ত, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করে। ব্যাংকের কর্মকর্তাকর্মচারীদের অনেকেই এখন গ্রাহকদের প্রশ্নের উত্তরে দৃঢ়তার সাথে এটিকে সুদমুক্তবলতে ইতস্তত করছে। শতকরার মধ্যে মাত্র কয়েকজন হয়তো সুদমুক্ত বলেন, কিন্তু অধিকাংশ ব্যাংক কর্মকর্তার বক্তব্যেই এক ধরনের ইতস্তত ভাব লক্ষ্য করা যায়। কারণ, এই ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখলে কোনো ধরনের লোকসান বা ক্ষতি সইতে হয় না বরং নির্দিষ্ট মেয়াদে বা মাসিক ভিত্তিতে নিশ্চিত লভ্যাংশ পাওয়া যায়।

অথচ ব্যবসা করা সুন্নাত হলেও তাতে লাভ ও লোকসানউভয়েরই সম্ভাবনা থাকে। কোনো লোকসান ছাড়া এভাবে নিশ্চিত মুনাফা গ্রহণ করার কারণেই মূলত সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

রিবা বা সুদ সম্পর্কে পবিত্র কোরআন মাজিদে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন:

যারা সুদ খায়, তারা দাঁড়াবে সেই ব্যক্তির মতো, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। এটা এই জন্য যে, তারা বলে বেচাকেনা তো সুদের মতোই; অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে, তারপর সে বিরত হয়েছে, অতীতে যা হয়েছে তা তার, আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর ইখতিয়ারে। তবে যারা পুনরায় সুদে লিপ্ত হবে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী, সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।” (সূরা বাকারা: ২৭৫)

পবিত্র কোরআনে আরও এরশাদ হয়েছে: “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বর্ধিত করেন। আর আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ গুনাহগারকে ভালোবাসেন না।” (সূরা বাকারা: ২৭৬)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আলে ইমরান: ১৩০)

মানুষের ধনসম্পদে বৃদ্ধি পাবে বলে তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকো, আল্লাহর দৃষ্টিতে তা সম্পদ বৃদ্ধি করে না। কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তোমরা যে জাকাত দাও, (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ লাভ করে।” (সূরা রূম: ৩৯)

সুদের ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহর রসূল (.) বলেন: সুদ ব্যভিচারের চেয়েও মারাত্মক পাপ: রাসুলুল্লাহ (.) বলেছেন, “সুদের ৭০টি পাপের স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সর্বনিম্ন হলো নিজের মায়ের সাথে ব্যভিচার করার সমতুল্য।” (ইবনে মাজাহ: ২২৭৪, মুসতাদরাক হাকেম)

অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, “জেনেশুনে এক দিরহাম সুদ খাওয়া ৩৬ বার ব্যভিচার করার চেয়েও জঘন্য পাপ।” (মুসনাদে আহমাদ: ২২০৭)

আল্লাহর রসূল (.) বলেন, “নিশ্চয় সুদের ৭০টিরও বেশি প্রকার রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে হালকা অপরাধ হলো আপন মায়ের সাথে ব্যভিচার করা। আর সবচেয়ে মারাত্মক বা জঘন্য সুদ হলো কোনো মুসলমান ভাইয়ের সম্মানহানি করা।” (সুনানে বাইহাকি ও সুনানে ইবনে মাজাহ)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (.) বলেছেন, “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে দূরে থাকো।সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! কাজগুলো কী কী?” তিনি বললেন: . আল্লাহর সাথে শরিক করা, . জাদু করা, . আল্লাহ যাকে হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা, . সুদ খাওয়া, . এতিমের সম্পদ ভক্ষণ করা, . যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭. সতীসাধ্বী ও সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ দেওয়া। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)

হজরত জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, সুদের হিসাব লেখক এবং সুদের সাক্ষীদ্বয়ের ওপর লানত বা অভিশাপ দিয়েছেন এবং বলেছেন, “অপরাধের দিক থেকে তারা সবাই সমান।” (সহিহ মুসলিম)

সম্প্রতি আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য জনগণের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০০ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনার জন্য দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইসলামী বিজ্ঞজনদের মতামত গ্রহণ করেছিল। পরবর্তীতে আদালত ৪০০ পৃষ্ঠার একটি রায় দেয়। সেই রায়ে পরিষ্কার বলা হয়েছে যে, ব্যাংকগুলো যে নামেই লেনদেন বা টাকা গ্রহণ করুক না কেন, তা মূলত এক ধরনের সুদ।

আমাদের দেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ সুদ থেকে বেঁচে থাকার জন্য এবং আমানতের নিরাপত্তার আশায় ইসলামী ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখছেন এবং মাসিক বা এককালীন লভ্যাংশ নিচ্ছেন। বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য এবং পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের সেই ৪০০ পৃষ্ঠার রায়ের আলোকেএই অর্জিত মুনাফা আসলেই লভ্যাংশনাকি সুদ‘, তা নিয়ে দেশের লাখ লাখ আমানতকারী এবং ব্যাংকগুলোর শরিয়াহ বোর্ডকে নতুন করে গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট

পূর্ববর্তী নিবন্ধদুরের টানে বাহির পানে
পরবর্তী নিবন্ধজুতা রপ্তানিতে ৫ বিলিয়ন ডলারের স্বপ্ন বাংলাদেশের