মহান রবিউল আউয়াল মাসে পবিত্র মদিনা রওজা পাকে যেয়ারতের পরিবেশ নিয়ে আজকের প্রয়াস: উম্মতে মুহাম্মদী পবিত্র মদিনায় মুনাওয়ারা গমন করে থাকেন রওজা পাকে সালাম পেশ করে সৌভাগ্যবান হতে। উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্যে একটি অংশ এশারের নামাজের পরসহ অন্য সময় দরূদ শরীফ পড়ে থাকেন। তৎমধ্যে যারা তরিকতে আছেন তারা অন্যতম। করোনা মহামারীর পর মসজিদে নববীতে যেয়ারতকারীগণের কল্যাণে নিয়ম শৃঙ্খলা পরিবর্তন করায় যারা দরূদ শরীফ পড়তে চান তাদের জন্য বিব্রতকর তথা অনেকটা প্রতিকূল অবস্থা বলা যেতে পারে।
এমনিতে উম্মতে মুহাম্মদীর দৈনন্দিন আমলগুলোর মধ্যে দু’টি আমল শ্রেষ্ঠ। একটি ইস্তিকফার অপরটি দরূদ শরীফ পড়া।
যারা তরিকতে আছেন তাদের ক্ষেত্রে ফরজ নামাজের পাশাপাশি এশার এবং ফজরের পর দরূদ শরীফ পড়া নিয়ম শৃঙ্খলায় পড়ে। তবে আমাদের আজমগড়ী সিলসিলায় তরিকতের যে ইমামের আওতাধীন হোক না কেন এশারের পর এবং ফজরের নামাজের পর দরূদ শরীফ পড়া বাধ্যতামূলক।
মুজাদ্দেদিয়া, নকশবন্দিয়া, কাদেরিয়া, চিশতিয়াসহ ৭ তরিকায় পৃথক পৃথক নিয়মশৃঙ্খলা রয়েছে এশার এবং ফজরের পর দরূদ শরীফ পড়তে। দরূদ শরীফ হাজার হাজার কি.মি দূরত্বে নিজের দেশ থেকে পড়া হচ্ছে। পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারা গমন করলে রওজা পাক সামনে রেখে দরূদ শরীফ পড়তে পারাটা সৌভাগ্যের বিষয়। কিন্তু সৌদি কর্তৃপক্ষ মসজিদে নববীতে নিয়ম শৃঙ্খলার পরিবর্তন করায় নীরবে নিবৃত্তে ৫–১০ মিনিট বা ১০–১৫ মিনিট রওজা পাক সামনে রেখে দরূদ শরীফ পড়ার অনুকূল পরিবেশ এখন আর নেই।
১৯৯০ এর দশক পর্যন্ত রওজা পাক সামনে রেখে যার যতক্ষণ ইচ্ছা দাঁড়িয়ে বসে সালাম পেশ করার সাথে দরূদ শরীফ পড়ার সৌভাগ্য হত। কিন্তু ২০–২৫ বছরের ব্যবধানে সৌদি কর্তৃপক্ষ যেয়ারতকারীগণকে নিয়ম শৃঙ্খলায় রাখতে বারে বারে ঢেলে সাজাচ্ছে। এতে রওজা পাকের দক্ষিণপাশে তো নয়ই মসজিদে নববীর অন্যত্র দাঁড়িয়ে বা বসে নীরবে নিবৃত্তে দরূদ শরীফ পড়ার পরিবেশ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
ফলে গত হজে (২০২৬) ভাবতে ভাবতে সিদ্ধান্ত নিলাম রওজা পাকের ঠিক দক্ষিণপাশে গিয়ে দরূদ শরীফ পড়বো। যেখানে কর্তৃপক্ষের গেরোয়া রয়েছে; তার বাহিরে গিয়ে কিছুটা দূরত্বে রওজা পাক সামনে রেখে, বিশেষ করে পবিত্র সবুজ গম্বুজ সামনে রেখে যতটুকু সম্ভব অতীব ভক্তি সহকারে তরিকতের তরতীব মতে দরূদ শরীফ পড়তে চলে যাই।
আজমগড়ী সিলসিলার নিয়ম অনুযায়ী এশার পর মুজাদ্দেদিয়া ও নকশবন্দিয়া তরিকা হলে ৫০০ বার, কাদেরিয়া ও চিশতিয়া তরিকা হলে ৯০০ বার দরূদ শরীফ পড়া। আজমগড়ী সিলসিলা মতে দরূদ শরীফ পড়া বাধ্যতামূলক। তবে মুজাদ্দেদিয়া ও নকশবন্দিয়া তরিকার দরূদ শরীফ লম্বা এবং কাদেরিয়া ও চিশতিয়া তরিকার দরূদ শরীফ ছোট। রওজা পাকের এই দক্ষিণপাশে ব্যারিকেডের বাহিরে দাঁড়িয়ে নীরবে নিবৃত্তে দরূদ শরীফ পড়ার সময়ও পুলিশ অথবা হজ ওমরার নিরাপত্তার লোক এসে সরিয়ে দেয়। তখন আরেকটু পেছনে গিয়ে যেয়ারত তথা দরূদ শরীফ পড়া হয়।
মে মাসে হজের সময় গরম কমে আসলেও আমাদের দেশ থেকে অনেক বেশি। ফলে এশারের পরেও ফ্লোর গরম অনুভব হয়। ভালো মনে করলে পায়ে মোজা পরিধান করে রাখতে পারেন।
শুধুমাত্র ওমরাহ ও যেয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করলে তখন আবহাওয়া অনুপাতে হয়ত এখানের ফ্লোর গরম নাও হতে পারে। পুরুষগণ রওজা পাকের দক্ষিণ দিকে গিয়ে সালাম পেশ করতে একালে ২৪ ঘণ্টায় খোলা। শুধুমাত্র ৫ ওয়াক্ত নামাজের আজানের ৩০ মিনিট পূর্বে যেয়ারতে গমন ঘণ্টাখানেকের জন্য বন্ধ রাখা হয়। আগে দীর্ঘ সময় রওজা পাক এশারের নামাজের পর বন্ধ করে দিত। তাহাজ্জুদ এর আজানের সময় খুলে দেয়া হয়। বাদশাহ আবদুল্লাহর নির্দেশে এখন মসজিদে নববীতে সালাম পেশ করা সহ ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে অনেকটা মসজিদুল হারমের মত।
মহিলাগণ দক্ষিণ দিকে গিয়ে সালাম পেশ করতে পারছেন না বিধায় তাদের কল্যাণে যেয়ারতের সুবিধা দিতে কর্তৃপক্ষ নিরলস কষ্ট করে যাচ্ছে। এশারের পর ও ফজরের পর দীর্ঘ ৪–৫ ঘণ্টা মসজিদে নববীর ভিতর পর্দার লক্ষে গেরোয়া করে দেয়। এখানে হাজার হাজার মহিলা এসে যেয়ারত করেন সালাম পেশ করেন এবাদতে থাকেন। আগে ৩ ওয়াক্তে সময় দিত। এখন এশারের পর আর ফজরের পর দেয়া হচ্ছে। যেহেতু এই দুই ক্ষেত্রে সময় বেশি পাওয়া যায়।
এবাদতের লক্ষে মহিলাগণের নামাজ ও ইবাদতের মূল এরিয়া হল মসজিদে নববীর উত্তর–পূর্ব ও উত্তর–পশ্চিম পাশে।
বিশ্বে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজতর ও আরামদায়ক হওয়ায় মহিলা হজ ও ওমরাহকারীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। পাকিস্তান আমলে মহিলা ওমরাহকারী ছিল না বললেই চলে। বাংলাদেশ আমলে প্রথম দিকেও একই অবস্থা ছিল। বাংলাদেশ আমলের প্রথম দিকে মহিলা হজযাত্রী ছিল হয়ত শতকরা ৫–৭ জন। এখন মহিলা ওমরাহ ও হজযাত্রীর সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ।
আগেই উল্লেখ করেছি, মে মাসে হজ অনুষ্টিত হচ্ছে। সৌদি আরবে মূলত প্রচন্ড গরম পড়ে জুন–জুলাই–আগস্ট মাসে। তবে মে মাস হলেও গরম আমাদের দেশের চেয়ে অনেক বেশি। পুরুষগণ রওজা পাকে সালাম দিতে যাওয়ার সময় জুতা স্যান্ডেল পরে যায়।
বাবুস সালাম ১ নাম্বার গেইট দিয়ে প্রবেশ করার আগে জুতা স্যান্ডেল হাতে তুলে নেন। উম্মতে মুহাম্মদীকে অননোপায় হয়ে জুতা স্যান্ডেল পরেই যেয়ারতে যেতে হচ্ছে। ১ নাম্বার বাবুস সালাম গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে জুতা স্যান্ডেল হাতে বা ব্যাগে নিয়ে যেয়ারতে যেতে হচ্ছে।
বিশ্বের বুকে কোন যেয়ারতে জুতা স্যান্ডেল হাতে রাখতে হচ্ছে বলে মনে হয় না। কোথাও না কোথাও রাখার ব্যবস্থা থাকবে। দু’জাহানের সর্দার নবী রসূলগণের ইমাম আল্লাহর রসূল (স.) এর যেয়ারতে তাঁর উম্মতগণকে জুতা স্যান্ডেল হাতে নিয়ে যেতে হচ্ছে।
এমনিতে পবিত্র মদিনায় অবস্থানকালীন অনেকের পায়ে মোজা থাকে। দেশ থেকে যাওয়ার সময় এক বা দুই জোড়া মোজা নিয়ে যেতে পারেন। পায়ের নিচে মোটা মোজা থাকলে তখন সালাম পেশ করতে যাওয়া–আসার সময় গরম সহনীয় থাকে। জুতা স্যান্ডেল মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে রেখে আসা যায়।
বস্তুত উম্মতে মুহাম্মদীর দরূদ শরীফ পড়ার ফযিলত রয়েছে। তরিকতে এশারের নামাজের পর দরূদ শরীফ পড়ার নিয়ম থাকে। এই নিয়ম আমাদের আজমগড়ী সিলসিলার বাধ্যতামূলক। ফলে সময় লাগে ৮–১০ বা ১৫–২০ মিনিট। পবিত্র মদিনায় রওজা পাকে দরূদ শরীফ পেশ করতে সুবিধাজনক স্থান প্রয়োজন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার বিবেচনায়, রওজা পাকের দক্ষিণ দিকে ঘেরাও বা ব্যারিকেডের বাহিরে এসে দরূদ শরীফ পড়াটা সুবিধাজনক হবে বলে মনে করি।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।












