কবি প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়ার কিশোরকবিতার অনন্য একটি গ্রন্থ ‘উড়ছি মনের ডানা মেলে’। প্রায় বিশটি কবিতা নিয়ে সাজানো। গ্রন্থটিতে প্রথমেই চোখে পড়ে তাঁর বিষয়ের বিস্তার। কিশোরকবিতায় সাধারণত প্রকৃতি থাকে। থাকে খেলাধুলা। থাকে স্বপ্নের কথা। কিন্তু প্রদ্যোত বড়ুয়া তার বাইরেও অনেক দূর হেঁটেছেন। শুকতারা, ধূমকেতু, কলম, বিদ্যুৎ, রাগ, সুখ, সময় –এমন নানা বিষয় তাঁর কবিতায় প্রাণ পেয়েছে। এই বৈচিত্র্যই তাঁর কবিতাকে আলাদা করে তোলে। কিশোর কবিতায় এমন বিষয়ের ব্যবহার সহজ নয়। কিন্তু তিনি তা স্বাভাবিকভাবে নিয়ে এসেছেন। ফলে কবিতাগুলোতে কৌতূহল জন্মায়। পাঠক নতুন কিছু ভাবতে শেখে।
বিশেষ করে আধুনিক পৃথিবীর প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানচেতনার ছোঁয়া তাঁর কবিতায় আলাদা মাত্রা পায়। কিশোর মনের কল্পনা এখানে অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়। ‘উড়ছি মনের ডানা মেলে’ কবিতায় সেই উড়াল ধরা পড়েছে– ‘হঠাৎ আসি মহাকাশে দেখি ঘুরে ঘুরে/ গ্রহের পথে দিচ্ছি পাড়ি দারুণ উড়ে উড়ে।/ বিশ্বজয়ের রোবট হয়ে জানার নেশায় মাতি/ চোখ জুড়ানো তৃপ্তি জাগে জ্বলে মনের বাতি।’ এখানে শিশুমনের স্বপ্ন আছে। মহাকাশের বিস্ময় আছে। নতুন পৃথিবীকে জানার আকাঙ্ক্ষা আছে। ফলে কবিতাটি শুধু স্বপ্ন নয়, জ্ঞানের অভিযাত্রাও হয়ে ওঠে।
প্রদ্যোত বড়ুয়ার কবিতায় শুকতারা নীরব এক দূত হিসেবে ধরা পড়ে। ‘রূপালি শুকতারা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন, ‘ভোর বিহানে নীরব ভাষায়/ শুভ সকাল বলে,/ জেগে থাকো সুখ বিলাতে/ টুক করে যাও চলে।’ শুকতারা এখানে নিঃশব্দ বার্তাবাহক। ভোরের আলো আসার আগে সে যেন পৃথিবীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে যায়।
আবার আকাশের বিস্ময়ও তাঁর কবিতায় জায়গা পেয়েছে। ‘আকাশে এ কোন সেতু’ কবিতায় ধূমকেতুর চিত্রকল্পটি বিশেষভাবে স্মরণীয়– ‘বাতাসে উড়ালো কোন সে বুড়ির একরাশ পাকা চুল,/ বেণী ছাড়া চুলে ফুটেছে সাদাটে শলা শলা কাশফুল।’ ধূমকেতুর লেজকে বুড়ির পাকা চুলের সঙ্গে তুলনা করা সত্যিই দারুণ কল্পনা। এতে আকাশের রহস্যও থাকে, আবার শিশুমনের বিস্ময়ও জাগে।
মানুষের অনুভূতিও তাঁর কবিতায় জায়গা পেয়েছে। ‘কলম সাথি’ কবিতায় কলম যেন জীবনের সহচর হয়ে ওঠে– ‘কখনো ছায়া কখনো মায়া দাও না কাজে যতি,/ ভাগিয়ে আনো নাম সুনামে সুখের প্রজাপতি।/ ছোটবেলায় বাবা তোমাকে দিল আমার হাতে/ বুঝিনি আমি কলমে আছে সরস্বতী সাথে।’ এই পঙক্তিগুলোতে সৃষ্টির আনন্দ ও লেখালেখির শক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আবার মানুষের আবেগের তীব্রতাও তিনি ধরেছেন। ‘রাগের আগুন’ কবিতায় দেখা যায় রাগের বিস্ফোরণ– ‘শিরায় শিরায় রক্ত নাচে থরথরিয়ে বিভোর হয়ে,/ এমনি করে এক নিমিষে মায়া মমতা পালায় ভয়ে।’ রাগের মুহূর্তে স্বাভাবিক মানুষ কীভাবে বদলে যায়–এই দৃশ্য বিমূর্ত হয়ে ফুটে উঠেছে।
প্রদ্যোত বড়ুয়ার কবিতায় প্রকৃতি একটি বড় আশ্রয়। কিন্তু তা নিছক বর্ণনা নয়। প্রকৃতি তাঁর কবিতায় নতুন চিত্রকল্পে ধরা দেয়। যেমন ‘পৌষের ভোর’ কবিতায় শীতের সকালের দৃশ্যকে তিনি দেখেন এক অভিনব চোখে– ‘পুকুর পাড়ে নদীর ধারে/ উড়ছে ধোঁয়া জলে,/ কে দিয়েছে আগুন জ্বেলে/ জলের গভীর তলে।’/ কুয়াশাকে ‘জলের ভেতরে জ্বলা আগুন’ হিসেবে কল্পনা করা নিঃসন্দেহে চমৎকার এক চিত্রকল্প। খুব সহজ দৃশ্য, কিন্তু নতুন করে দেখার চোখ তৈরি করে।
কিংবা ‘সাতরঙা সেতু’ কবিতায় তিনি লিখছেন– ‘আকাশি আকাশে আয়েশে পাহাড়/ হেলিয়ে রেখেছে মাথা,/ সাদা কালো মেঘ সারি সারি ভাঁজে/ ওড়ে যেন ছেঁড়া কাঁথা।’ এখানে পাহাড় যেন ক্লান্ত মানুষ। মেঘ যেন ছেঁড়া কাঁথা। এমন চিত্রকল্প শিশু–কিশোর পাঠকের কল্পনাকে সহজেই আন্দোলিত করে।
আবার ‘চাঁদ এনেছে’ কবিতায় জোছনার রাত যেন এক রূপকথার আবহ তৈরি করে– ‘চাঁদের সাথে সবাই কথক নাচে/ হাজার জোনাক বাতি/ ঝিকিমিকি সাথি/ জ্যোৎস্না আলোর মালা গাঁথার ধাঁচে/ চাঁদটা জেগে আছে।’ এখানে জোনাকির আলো যেন নৃত্য করছে। চাঁদ যেন সেই নৃত্যের মঞ্চ সাজিয়ে জ্যোৎস্না–আলোর মালা গাঁথছে। এই ধরনের কল্পনা কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
তাঁর কবিতায় মানবিক ও সামাজিক চেতনার উপস্থিতিও লক্ষণীয়। ‘যখন সন্ধ্যা নামে’ কবিতায় আমরা দেখি সহাবস্থানের এক পরিচিত ছবি–
‘মন্দিরে ঘরে শঙ্খ ঘণ্টা নাড়ে,/ নীরবতা ভেঙে উদাসী মনটা কাড়ে।
আযানের সাথে সন্ধ্যা তখন/ ধীরে ধীরে নামে পাখির সুরে’
এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির একটি সহজ দৃশ্য ধরা পড়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের বাস্তব আবহও এতে আছে।
দার্শনিক ভাবনাও তাঁর কবিতায় এসে পড়ে। যেমন ‘সুখ সে তো’ কবিতায় তিনি লিখেছেন– ‘সুখ সে তো স্বপ্নীল ছবি অজানার/ আলো–ছায়া হোক তবু চাই ছোঁয়া তার।’ সুখকে তিনি ধরেছেন এক স্বপ্নের ছবির মতো–ধরা যায় না, তবু তার আকাঙ্ক্ষা থাকে।
সময় ও জীবনবোধও তাঁর কবিতায় অনুপস্থিত নয়। ‘ফিরে তাকায় না সময়’ কবিতায় তিনি জীবনের সাথে সময়ের এক গভীর সত্য তুলে ধরেন– ‘জেঁকে বসে থাকে কখনো অটল পাহাড়ের রূপ নিয়ে/ সময়কে কেউ কিনতে পারে না সাতনরি হার দিয়ে।’
প্রকৃতির পাশাপাশি তাঁর কবিতায় আছে ভৌগোলিক ও ঐতিহ্যগত চেতনা। ‘বিরামহীন কর্ণফুলি’ কবিতায় কর্ণফুলি নদীকে তিনি শুধু নদী হিসেবে দেখেন না; তাকে তিনি ইতিহাস ও ভূগোলের জীবন্ত স্রোত হিসেবে দেখেন-‘পাহাড়ি ঝরনা/ লুসাই কন্যা/ এঁকে বেঁকে পথ বেয়ে/ ধেই ধেই নেচে উচ্ছ্বল হেসে কলকল সুরে গেয়ে।’ এখানে নদীর চলন যেন নৃত্য। তার স্রোত যেন সংগীত। এই উপমাগুলো কবিতাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
একই সঙ্গে তাঁর কবিতায় জাতীয় ইতিহাসের স্পর্শও আছে। ভাষা আন্দোলনের বেদনা ও গৌরব ‘একুশের গান’ কবিতায় ধরা পড়েছে–
‘একুশের গান খুলে দেয় দ্বার সামনে এগিয়ে যেতে
মায়ের ভাষাকে রক্তে কিনে/
দেশকে কেনার সে পথ চিনে
চাই বুক পেতে, চাই দেশ–মাটি মুক্ত স্বাধীন পেতে।’
এই পঙক্তি শুধু ইতিহাসের স্মরণ নয়; এটি আবেগেরও বহিঃপ্রকাশ।
স্বাধীনতার চেতনাও তাঁর কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ। ‘উড়ছে স্বাধীন পতাকা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-‘সবুজ জমিনে আঁকা/ রক্তের রঙমাখা/ স্বাধীন পতাকা উড়ছে বাংলাদেশের ঘরে।’ এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই স্বাধীনতার ইতিহাসের রক্তমাখা স্মৃতি যেন জেগে ওঠে।
ছন্দের দিক থেকেও প্রদ্যোত বড়ুয়া বেশ স্বচ্ছন্দ। তাঁর অধিকাংশ কবিতা মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। বিশেষ করে ছয় মাত্রা পর্বের ব্যবহার বেশি দেখা যায়। যা পাঠকের কাছে একঘেয়েমি লাগতে পারে। পাঁচ মাত্রা পর্বের একাধিক কবিতাও চোখে পড়ে। সেখানে ছন্দের গতি একটু ভিন্ন।
সব মিলিয়ে তাঁর কবিতায় বিষয়ের বৈচিত্র্য এবং প্রাণবন্ত চিত্রকল্পের সুন্দর সমন্বয় দেখা যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সময়বোধ, ইতিহাসচেতনা এবং দেশপ্রেমের আবহ। ফলে কিশোর পাঠক শুধু আনন্দই পায় না; তার ভেতরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কে একটি সচেতন অনুভূতিও।
দীর্ঘদিনের নিয়মিত লেখালেখি, শিশুসাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এবং কিশোরমানসের প্রতি তাঁর সংবেদনশীল অভিজ্ঞ দৃষ্টি–এই তিনটি বিষয় তাঁর কবিজীবনের ভিতকে শক্ত করেছে। প্রথম বই ‘পেখম খুলছে আলোর পাখি’ থেকে এবারের বই ‘উড়ছি মনের ডানা মেলে’–এই অগ্রযাত্রা দেখলে বোঝা যায়, তিনি ধীরে ধীরে নিজের একটি স্বতন্ত্র পথ তৈরি করে নিচ্ছেন। চট্টগ্রামের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শৈলী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত এই গ্রন্থটির চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন মোমিন উদ্দীন খালেদ ও ভেতরের ছবি এঁকেছেন নাটু বিকাশ বড়ুয়া।
প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়ার এই পথচলা যদি একই নিষ্ঠায় এগিয়ে যায়, তবে তাঁর কবিতায় সামনে আরও নতুন ভাবনা, আরও পরিণত অভিজ্ঞতা এবং আরও বিস্তৃত কাব্যভূমি যুক্ত হবে–এমন প্রত্যাশা করাই যায়। কবিতা শেষ পর্যন্ত পাঠকের মনে থাকে কিছু উজ্জ্বল পঙক্তির জন্য। কিছু চিত্রকল্পের জন্য। প্রদ্যোত কুমার বড়ুয়ার কবিতায় সেই উজ্জ্বল মুহূর্তের আভাস ইতিমধ্যেই রয়েছে। সেই আভাসই তাঁর কাব্যযাত্রাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
লেখক : কবি, সম্পাদক, শৈলী সাহিত্য বুলেটিন।












