অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর ভিডিও নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন। তিনি বলেছেন, তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে বিব্রত না হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ আড়ালে পড়ে না যায়, সেজন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গতকাল সোমবার দুপুরে কয়েকশ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক। ঢাকা–৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাকের ভাষ্য, ১৭ অক্টোবর গেণ্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান সমন্বয় করতে গিয়ে তিনি নিজের নিরাপত্তার জন্য বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে অভিযানটির মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়। গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো।
ইশরাক বলেন, আমি মনে করছি যে আমার এই মাদকবিরোধী অভিযান কেবলমাত্র শুরু হলো, এটি চলমান থাকবে। যতদিন চলমান থাকবে, আমার কারণে যাতে আপনার কোনো কর্মকাণ্ড ম্লান হয়ে না যায়, ঢাকা না পড়ে যায়, আমার দল যাতে কোনো কারণে বিব্রত না হয়।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইশরাক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাওয়ার পাশাপাশি তিনি মাদক নির্মূলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতিও চেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাতে সম্মতি দিয়েছেন।
এদিকে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, দল চাইলে মেয়র নির্বাচন করতে শতভাগ প্রস্তুত আছি। এছাড়া বলেছেন, এ বিতর্কের পেছনে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র দেখছেন না। তবে জামায়াতের এক শীর্ষ নেতার মন্তব্যে ব্যথিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। খবর বিডিনিউজের।
কেন ওই অভিযান : সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেন, ঢাকা–৬ আসনের গেণ্ডারিয়া এলাকার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার তার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ইশরাকের ভাষ্য, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা–পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঢাকা–৬ আসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও বিএনপির নেতারাও উপস্থিত থাকতেন। তিনি বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা–সরকারিপত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।
ইশরাকের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন ইরশাক। তবে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে–এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেওয়া হতো বলে তার ভাষ্য।
হাতে কেন অস্ত্র ছিল : সেদিনের অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ইশরাক বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছুটোছুটি করতে দেখেন তারা। এ সময় নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন ইশরাক। অভিযানের পর ছয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় বলেও তিনি জানান। কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং অভিযানে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল লক্ষ্য।
ইশরাক দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। নিজের নিরাপত্তার জন্য অল্প সময়ের জন্য হাতে রেখেছিলেন। তার বক্তব্য, অস্ত্র হাতে থাকার দৃশ্যটি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যাতে মাদকবিরোধী অভিযানের মূল উদ্দেশ্য আড়ালে চলে যায়। এক প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, তার নামে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে–একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল। অভিযানের সময় দ্বিতীয় অস্ত্রটি লাইসেন্সধারী এক সহকর্মীর কাছে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের চাপের মুখে মাদকবিরোধী অভিযানের সমন্বয় ও নেতৃত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এক্ষেত্রে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততার কথাও তিনি বলেন।
ইশরাকের দাবি, অভিযানে তার কোনো ব্যক্তিগত, দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না। মাদকের মূল সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই তার লক্ষ্য। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের আটক করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি। মাদকবিরোধী অভিযানের সময় কেউ আহত হয়ে থাকলে তার জন্য দুঃখ প্রকাশের কথাও বলেন ইশরাক। তবে তিনি দৃঢ়ভাবে দাবি করেন, নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়ে তিনি কোনো ভুল করেননি।
অভিযান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা, মেয়র নির্বাচনের ভাবনা : সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী তাকে মাদকবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছেন।
ঢাকার মেয়র পদে ভবিষ্যতে নির্বাচন করার সম্ভাবনা নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের মুখে পড়েন ইশরাক। জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএনপি ও দলের প্রধান তারেক রহমানের। ২০২০ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নগরীর বিভিন্ন সমস্যা এবং সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। দল চাইলে মেয়র পদে নির্বাচন করতে তিনি প্রস্তুত। আবার দল অন্য কাউকে মনোনয়ন দিলেও তার পক্ষে কাজ করবেন। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লেও মাদকবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক।
সংবাদ সম্মেলনে হট্টগোল–হাতাহাতি : সংবাদ সম্মেলনে হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে কয়েকশ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে প্রেস ক্লাবের তিনতলার আব্দুস সালাম হলে প্রবেশ করেন ইশরাক। অতিরিক্ত লোকসমাগমের কারণে শুরু থেকেই সেখানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি দেখা দেয়। তাতে সাংবাদিকদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।
সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগে ইশরাক দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মোবাইল সাংবাদিকদের কক্ষ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। তার কথায় উপস্থিত সাংবাদিকদের অনেকের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। শুরু হয় বাক্বিতণ্ডা ও হট্টগোল। একপর্যায়ে কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিকদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। ইশরাক যেখানে বসে সংবাদ সম্মেলন করছিলেন, সেখানেই তার পাশের চেয়ারে বসা দুই দলীয় নেতার মধ্যেও মারামারি হয়। প্রায় পাঁচ মিনিট মারামারি চলার পর দলীয় নেতাকর্মীরা একজনকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে যান।
হট্টগোলের মধ্যে অনেকটা বাধ্য হয়ে পূর্বনির্ধারিত সময়ের কাছাকাছি সময়ে সংবাদ সম্মেলন শুরু করেন ইশরাক। তবে পুরো আয়োজনজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বজায় ছিল। এ সময় দৈনিক যুগান্তরের এক মাল্টিমিডিয়া প্রতিবেদকের আইফোন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এর আগে প্রেস ক্লাব চত্বরে পৌঁছে গাড়ি থেকে নামার পরপর নিজের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন হারিয়ে ফেলেন ইশরাক। এ সময় ইশরাককে বলতে শোনা যায়, আমার ফোন কই, পকেটে ছিল। এই খুঁজে দেখ। প্রায় পাঁচ মিনিট খোঁজাখুঁজির পর একজন মাটি থেকে ফোনটি পেয়েছেন বলে জানান। পরে ফোন হাতে নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রবেশ করেন তিনি।












