চট্টগ্রাম নগরীর ২৬ থেকে ৩০টি পাহাড়ে মৃত্যুফাঁদে বসবাস করছে লাখো মানুষ। সরকারি তালিকায় পাহাড়ে বসবাসকারী পরিবারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৫৮, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাস করছে। চট্টগ্রামে পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষগুলোর তালিকা হালনাগাদ হয়নি গত তিন বছরে। সবকিছু মিলে নগরে পাহাড়ে বসবাসকারী লাখো মানুষের জীবন হুমকিতে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মন্তব্য করেছে।
প্রতি বছর বর্ষা আসে, একইসাথে ফিরে আসে আতঙ্ক। ভারী বর্ষণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়, একসময় ধসে পড়ে। টানা বর্ষণে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো কখন যে ধসে পড়ে তা নিয়ে শঙ্কিত থাকলেও নিম্নআয়ের লাখো মানুষ বসতি ছাড়ে না। জীবনকে বালিশের পাশে রেখে হাজার হাজার মানুষ ঘুমায় মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে। অথচ বছরের পর বছর ধরে নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাসকারীদের তালিকা হালনাগাদ হয়নি। উচ্ছেদ অভিযানও কার্যত বন্ধ। ফলে একদিকে সরকারি হিসাব বলছে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮টি পরিবার বাস করছে; অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও আশপাশে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস। পাহাড় ধসের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে সরকারের কাছেও নির্ভুল তথ্য নেই।
২০০৭ সালের ১১ জুন টানা ভারী বর্ষণে নগরী ও আশপাশের এলাকায় পাহাড় ধসে ১২৭ জন নারী–পুরুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা চট্টগ্রামে এসে প্রশাসনকে পাহাড় ধসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষায় গঠিত হয়েছিল ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’। এই কমিটি বিভিন্ন সময় বৈঠক করেছে। ইতোমধ্যে কমিটির ৩১তম বৈঠক হয়েছে। আগামী ১৩ জুলাই ৩২তম বৈঠকের দিন ঠিক করা হয়েছে। তবে কমিটির সুপারিশের অধিকাংশই কার্যকর হয়নি বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০০৭ সালের পাহাড় ধসের ঘটনার পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে কমিটি গঠনসহ নানা ধরনের সুপারিশ করে। কিন্তু পাহাড় ধস থামেনি। এরপর ২০১২ সালে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি স্থানে পাহাড় ধসে ২৮ জন নিহত হন। ২০১১ সালের ১ জুলাই বাটালী পাহাড়ের দেয়ালসহ পাহাড় ধসে ১৭ জন নিহত হন। ২০১০ সালে তিনজন নিহত, ২০০৯ সালে তিনজন আহত, ২০০৮ সালে মতি ঝরনায় ১৪ জন, লালখান বাজার টাংকির পাহাড়ে দুজন নিহত হন। পাহাড় ব্যবস্থাপনায় নানা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাস্তবে পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি কমেনি। সুযোগ বুঝে পাহাড় কাটার হার বেড়েছে। মরেছে মানুষ।
সর্বশেষ সরকারি হিসাবে নগরের ২৬টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সরকারি এবং ১০টি ব্যক্তি মালিকানাধীন। এসব পাহাড়ে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার সরকারি পাহাড়ে এবং ৩৮৩টি পরিবার ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়ে বসবাস করছে।
সরকারি নথি, জেলা প্রশাসন এবং পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো হচ্ছে আকবর শাহ থানার ফয়’স লেক সংলগ্ন ১ নম্বর, ২ নম্বর ও ৩ নম্বর ঝিল এলাকার পাহাড়, শান্তিনগর পাহাড়, বেলতলি ঘোনা, জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়, বায়েজিদ লিংক রোড সংলগ্ন পাহাড়, ফিরোজ শাহ কলোনি পাহাড়, লালখান বাজারের মতি ঝরনা পাহাড়, বাটালী হিল, পোড়া কলোনি পাহাড়, টাংকির পাহাড়, ষোলশহর রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়, বিজয়নগর পাহাড়, আমিন জুট মিলস পাহাড়, ভেড়া ফকিরের পাহাড়, বার্মা কলোনির পাহাড়, নাসিরাবাদ শিল্প এলাকা সংলগ্ন পাহাড়, লেক সিটি আবাসিক এলাকার পাহাড়, এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানির পাহাড়, ইস্পাহানী পাহাড় এলাকা এবং সিডিএ অ্যাভিনিউ সংলগ্ন কয়েকটি ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড়।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আকবর শাহ থানার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল সংলগ্ন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। শুধু এই এলাকাতে ৪ হাজার ৪৭৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে, যা নগরের মোট ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের প্রায় ৬৮ শতাংশ।
জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তালিকায় ২৬টি পাহাড়ে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবার বসবাস করছে বলে তথ্য রয়েছে। পরিবারপ্রতি গড়ে ৪–৫ জন ধরে হিসাব করলে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। অবশ্য পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসেবে ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও আশপাশে প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস। রেলওয়ের সাতটি পাহাড়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ বসবাস করছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, জেলা প্রশাসনের তালিকায় কেবল সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের হিসাব রয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর পুরো পাহাড়ি অঞ্চল ও সংলগ্ন বসতি বিবেচনায় নিয়ে জনসংখ্যার হিসাব করেছে। এ কারণে দুই সংস্থার তথ্যের মধ্যে এত বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ জরিপ তিন বছর আগের। এরপর নতুন করে কোথাও বসতি গড়ে উঠেছে কি না, কত পরিবার বেড়েছে, কত মানুষ নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে, তার কোনো সরকারি তথ্য নেই। পাহাড় থেকে লোকজন সরানোর উচ্ছেদ অভিযানও কার্যত বন্ধ রয়েছে। ঝুঁকি তৈরি হলে পাহাড় থেকে মানুষকে সরানোর জন্য জেলা প্রশাসন মাইকিং করে, আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষগুলো নিজেদের বসতি ছেড়ে পারতপক্ষে কোথাও যেতে চায় না।
চট্টগ্রামে একসময় দুইশটির উপরে পাহাড় ছিল। অধিকাংশ পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক এলাকা, বাড়িঘর। পাহাড় কাটার সাথে সাথে পাহাড় ধসের শঙ্কা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। এরপরও পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি কমেনি, বরং বেড়েছে।
পাহাড়ে বসবাসকারী অধিকাংশ বাসিন্দা নিম্নআয়ের। তারা ওখানে স্বল্প খরচে বসবাস করে। তাদের সামনে বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পাহাড়ের মালিকানা একাধিক সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তির মধ্যে বিভক্ত হওয়ার সুযোগে অনেক মানুষ সেখানে বসবাস করে। বিভিন্ন সময় প্রশাসনের তরফ থেকে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও রাজনৈতিক প্রভাব ও দখলদারদের কারণে উচ্ছেদ টেকসই হয় না বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।








