নির্বাচন যাতে বিলম্বিত না হয়, সেজন্য বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদে আপস করেছে মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, অনেক কথা তারা তখন বলেননি। সেইসঙ্গে তিনি এও বলেছেন, স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কিছু তারা মানবেন না; এ কথা তাদের দল শুরু থেকেই বলে এসেছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংস্কারের নামে নির্বাচন ঠেকানোর আশঙ্কা থেকেই তাদের ওই অবস্থান নিতে হয়েছে। আমাদের একটা তাগাদা ছিল যে এরা সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচনটা না হতে দেয়, সেজন্য আমরা সব কিছুতে আপস করে জুলাই জাতীয় সনদেও স্বাক্ষর করেছি। একত্রিত হয়েছি, সমঝোতা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের স্বার্থে আমরা অনেক কথা বলি নাই। বিএনপি এবং আমাদের সাথে যারা আছে, আমরা কেউ জুলাই জাতীয় সনদের বাইরে অন্য কিছু মানতে রাজি না। খবর বিডিনিউজের।
জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে বিরোধীদের বক্তব্যের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সনদ থেকে সরে যায়নি, বরং সেটাকেই আঁকড়ে আছে। তিনি দাবি করেন, ৩০টি দলের মধ্যে ২৬টি দল সই করেছে, চারটি দল করেনি। এনসিপি নিজেও কয়েকটি জায়গায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছিল। সুতরাং নোট অব ডিসেন্টের বিরোধিতা করে আবার সেটি দেওয়ার সুযোগ নেই। যারা নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে তারা তো স্বীকৃতি দিলই যে নোট অব ডিসেন্ট দেওয়া যায়।
সালাহউদ্দিন বলেন, গণভোটের প্রস্তাব তিনিই করেছিলেন। তবে তা ছিল জুলাই জাতীয় সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য। জুলাই জাতীয় সনদের উপরে গণভোট হলে তাদের আপত্তি থাকত না। কিন্তু পরে ‘জুলাই বাস্তবায়ন আদেশ’ নামে যে দলিল জারি হয়, তার সঙ্গে বিএনপি একমত ছিলেন না বলে জানান ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে দলটির নেতৃত্ব দেওয়া সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, ওই আদেশ এবং তার ভিত্তিতে আনা কিছু প্রশ্নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদের পুরো মিল নেই। যেটা প্রথম থেকেই অবৈধ, সেই জিনিসটার উপরে কোনো সম্মতি ছিল না, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছিল না, জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে কোনো মিল ছিল না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন, কিন্তু অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের ধারা, উপধারা বা তফসিল বাতিল বা সংশোধন করতে পারেন না। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদের পর চতুর্থ তফসিলের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা আর বহাল নেই। তাই ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ সাংবিধানিকভাবে টেকসই নয় বলে তার ভাষ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগ নিয়ে কটাক্ষ করে সালাহউদ্দিন বলেন, শ্বেতশুভ্র কেশের কিছু বড় ভাই–বুদ্ধিজীবী বিদেশ থেকে এসে নানা সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে অবতরণ করেছিলেন। তাদের সেই প্রস্তাব, আলোচনা আর সমঝোতার ভেতর দিয়েই জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে। তাই যারা এখন নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে আপত্তি করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত, শুরু থেকেই এ ব্যবস্থার কথা ছিল। সালাহউদ্দিন বলেন, সরকার সংসদে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি করার প্রস্তাব দিয়েছে। সেখানে সব পক্ষের আলোচনা, টার্মস অব রেফারেন্স ও ঐকমত্যের সুযোগ থাকবে।
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা ১২ জনের নাম ঠিক করেছি, আপনারা ১২ জনের নাম দেন। বিরোধীরা এখনো নাম দেয়নি অভিযোগ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনের পথে না এলে অনেক বিতর্কিত বিষয় বহাল থাকবে, যেগুলো নিয়ে আগে ঐকমত্য হয়েছিল।
এদিন আলোচনায় অংশ নিয়ে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা, জুলাই সনদ, গণভোট, সংবিধান সংশোধন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, ছায়া মন্ত্রিসভা এবং আওয়ামী লীগ আমলের অর্থনৈতিক অনিয়ম নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সরকারবিহীন অবস্থায় রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় রাষ্ট্রপতি ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর সংসদ কার্যত অচল হয়ে পড়ে, মন্ত্রিপরিষদও ছিল না। এ অবস্থায় রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আলোকে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ চান, যার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য, বিশেষ করে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন বলেন, তারা রাষ্ট্রপতির কাছেই শপথ নিয়েছিলেন (অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে), এখন আবার সেই রাষ্ট্রপতির বিরোধিতা করছেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যারা শপথ নিয়েছিলেন, তারা তখন রাষ্ট্রপতিকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভিতরে–বাইরে দুই দলের সমর্থন মন্তব্য করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একদল ছিল যমুনার অভ্যন্তরে, আরেকদল ছিল যমুনার কিনারে।














