নাট্যান্দোলনে একজন মনি ইমাম এবং পঞ্চাশের দশক

রোকন উদ্দীন আহমদ | সোমবার , ৬ জুলাই, ২০২৬ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ

মনি ইমাম বাংলাদেশের নাট্যান্দোলনে অবিসংবাদিত একজন অভিনয় শিল্পী। পঞ্চাশ দশকের শুরুতে সমাজ গোঁড়ামি ভেঙে মঞ্চে অভিনয় করে ইতিহাস হয়েছেন। চট্টগ্রামে নারী পুরুষের মিলিত অভিনয়ের প্রথম নাটকে অভিনয় করে তিনি কিংবদন্তি। ১৯৩৪ সালের ২ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের রামপুর হাট সাব ডিভিশনের মাড়গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতার নাম ডা. আবুল খায়ের এবং মাতার নাম সিদ্দিকা খাতুন। পিতা মাতা প্রদত্ত নাম জেবুন্নেসা মঈনা। স্বামী আলী ইমামের নামের সাথে মিলিয়ে নাট্য চর্চায় মনি ইমাম নামে খ্যাত। পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামীর চাকরির সুবাদে ভারত ভাগের পরে মনি ইমাম স্বামীসহ চট্টগ্রামে এসে স্থায়ী আবাস গড়েন।

১৯৪৮৪৯ সালে চট্টগ্রামে নাটক হতো। তখন নারী চরিত্রে কাউকে পাওয়া যেত না। পুরুষরাই মেয়েদের চরিত্রে অভিনয় করতো। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ১৯৫০ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অভিনীত হয় ‘চির কুমার সভা’। অভিনয় করেছেন মৃণাল কান্তি দস্তিদার, আবদুল্লাহ আল হারুন, আবদুস সাত্তার, বিশ্বেস্বর ভট্টাচার্য্য, রমেন্দ্র মজুমদার, মকসুদুর রহমান, শামসুল হুদা, সিরাজুল ইসলাম (আজিজ মিসির)। নারী ভূমিকায় ছিলেন সুনীল বড়ুয়া, সুলতান আহমদ, রমেন্দ্র বিশ্বাস, আসাদুজ্জামান, জামাল উদ্দিন, নাসিরুল্লাহ খান। নাটকটি পরিচালনা করেছিলেন অধ্যাপক ইদ্রিস আলী। তখনকার সময়ে মঞ্চে ছেলেদের সাথে মেয়েরা নাটক করবে সেটি কল্পনা করা যেত না।

১৯৫২ সালে চট্টগ্রামে এক ইতিহাস রচিত হল। মাহবুব হাসান সম্পাদিত ‘চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রগতিশীল ধারা’ গ্রন্থে মাহবুব উল আলম চৌধুরী ‘সাংস্কৃতিক আন্দোলনে চট্টগ্রাম’ শীর্ষক লেখায় তথ্য দেনদেশ বিভাগের পর ১৯৫২ সালে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম স্ত্রী পুরুষের মিলিত অভিনয়ে নাটক মঞ্চস্থ হল। প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ সেবছর ১৪ অক্টোবর এনায়েত বাজারস্থ ওয়াজিউল্লাহ রঙ্গমঞ্চে কলিম শরাফীর পরিচালনায় বিজন ভট্টাচার্য্যের ‘জবান বন্দী’ নাটকটি সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চস্থ করে। এই নাটকে অভিনয় করেছিলেনকলিম শরাফী, মাহবুব হাসান, কাজী আলী ইমাম, আমিনুল ইসলাম, মন্টু ব্যানার্জি, মহিলা শিল্পী ছিলেন কামেলা শরাফী ও মনি ইমাম। শিশু শিল্পী ছিল নাজমা ও বুবু। কলেজ ছাত্রী তালেয়া খান নাটকটিতে অভিনয় করার জন্য মহড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু সামাজিক নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে মহড়া দিয়েও তিনি নাটকটিতে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ১৯৫২ সালে ত্রৈমাসিক ‘পরিচিতি’ নামে সাহিত্য পত্রিকা বের করত চট্টগ্রাম রেলওয়ের ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউট। পরিচিতির ১৯৫৯ বাংলা সনের কার্তিকপৌষ সংখ্যায় ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক মোসলেম উদ্দিন আহমদ লিখেছেন-“বিজন ভট্টাচার্য্যের ‘জবানবন্দী’ নাটকটি গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম ওয়াজিউল্লাহ রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়েছে। এতে যারা অভিনয় করেছেন তাঁদের মধ্যে বেন্দার ভূমিকায় কলিম শরাফী, পরাণ মন্ডলের ভূমিকায় মাহবুব হাসান, ভদ্রলোকের ভূমিকায় মন্টু ব্যানার্জি, বেন্দার মার ভূমিকায় কামেলা শরাফী, বেন্দার স্ত্রীর ভূমিকায় মনি ইমাম এদের অভিনয় বেশ ভাল হয়েছে।” এর আগে মনি ইমাম নাট্যচর্চায় জড়িত ছিলেন না। দেশের প্রয়োজনে এগিয়ে এসেছেন। স্বামী কাজী আলী ইমাম আগে থেকেই চট্টগ্রামে নাট্যচর্চা এবং নাট্যান্দোলনে জড়িত ছিলেন। কলিম শরাফীর চিন্তায় চট্টগ্রামের প্রথম নারী মনি ইমাম নাট্যমঞ্চে উদ্ভাসিত হলেন। জীবনের প্রথম নাটকে কলিম শরাফীর স্ত্রীর ভূমিকায় অভিনয় করে সফল হন। এতে তাঁর নাট্য প্রতিভার পরিচয় মেলে। জবানবন্দী নাটকটি চট্টগ্রামের নাট্যকর্মীদের দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ফলস্বরূপ পাইওনীয়ার ক্লাব ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর ‘ছেঁড়া তার’ মঞ্চস্থ করে। প্রান্তিক নবনাট্য সংঘ একবছর পর ‘পথিক’ নাটক মঞ্চস্থ করে। এই নাটকের শিল্পীদের অন্যান্যর মধ্যে ছিলেন কলিম শরাফী, মাহবুব হাসান, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্তী, মো. সাদেক আলী, কাজী আলী ইমাম, রমেন মজুমদার, চিরঞ্জীব দাশ শর্মা, এস.এ সামাদ, ফৌজিয়া সামাদ, বিমান, মনি ইমাম, আশীষ প্রমুখ।

উল্লেখ্য ‘চট্টগ্রামে সাংস্কৃতিক আন্দোলন প্রগতিশীল ধারা’ গ্রন্থে আবুল ফজল ‘কৃষ্টিকেন্দ্র প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে লিখেছেন– ‘১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে। রেলওয়ে ক্লাবে সিরাজদ্দৌলা নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে। বিখ্যাত নবী ডাইরেক্টর। হামিদ নিয়েছে লর্ড ক্লাইভের ভূমিকা। সিরাজদ্দৌলার পাঠ শেখ জববার। আরও অনেকেই আছে। তার মধ্যে ননী দাদাও আছে। মেয়েদের মধ্যে পূর্ণিমা’। আবুল ফজলের লেখাটিতে সিরাজদ্দৌলা নাটকটির রিহার্সেল হওয়ার তথ্য আছে। নাটকটি অভিনীত হওয়ার তথ্য নেই। তাই ১৯৫২ সালে ‘জবানবন্দী’ নাটকে মনি ইমামই চট্টগ্রামে প্রথম নারী ভূমিকাই অভিনয় করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। উল্লেখ্য ১৯৫২ সালে জবানবন্দী নাটকে শিশুশিল্পী হিসেবে নাজমা ও বুবু নামে দুই মেয়ে অভিনয় করেছিলেন। তারাও স্মরণীয়।

১৯৫০ সালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘প্রান্তিক নব নাট্য সংঘ’ সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংগঠনটিতে এক পর্যায়ে কবিয়াল রমেশ শীল সভাপতি এবং কলিম শরাফী সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। প্রান্তিকের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফী, তাঁর স্ত্রী কামেলা শরাফী, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, গোপাল বিশ্বাস, নির্মল মিত্র, রমেন্দ্র মজুমদার, গীতিকার চিরঞ্জীব দাশ শর্মা, হরি প্রসন্ন পাল, অচিন্ত্য কুমার চক্রবর্ত্তী, মাহবুব হাসান, কাজী আলী ইমাম, সুনীল চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম, স্নেহময় রক্ষিত, মহিউল ইসলাম, মনি ইমাম, বিধান ভট্টাচার্য্য প্রমুখ। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং নাট্যান্দোলনে কাজী হাসান ইমাম ও কাজী আলী ইমাম দুই সহোদরের নাম স্মরণীয়। ১৯৫০ এর দশকে তাঁরা অবদান রেখেছেন। সে সময় কাজী আলী ইমাম প্রান্তিক নব নাট্য সংঘের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মনি ইমাম আলী ইমামের স্ত্রী। তখন কলিম শরাফীর মতো মানুষের সান্নিধ্য পান মনি ইমাম। কলিম শরাফীর অভিমত (চট্টগ্রামে সাংষ্কৃতিক আন্দোলন প্রগতিশীল ধারাসম্পাদক মাহবুব হাসান)- ‘তখনও প্রান্তিক পুরোপুরি সংগঠিত হয়নি। আমরা ভালো নাটক করবো, এমনই চিন্তা ভাবনা নিয়ে মহড়া শুরু করেছিলাম। নারীদের মধ্যে কাজী আলী ইমামের স্ত্রী মনি ইমাম এবং কামেলা এলো নাটক করতে। মনিকে আমরা তৈরি করে অভিনয়ে নামিয়েছিলাম।’

১৯৫৪ সালে ঢাকার কার্জন হলে পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মাহবুব উল আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের শিল্পী সাহিত্যিকের দল যোগদান করে। সম্মেলনে চট্টগ্রাম দল ‘বিভাব’ নাটক এবং লেডি গ্রেগরী রচিত ‘রাইজিং অব দি মুন’ অবলম্বনে সলিল চৌধুরী অনুদিত ‘অরুণোদয়ের পথে’ নাটক মঞ্চস্থ করে সুনাম অর্জন করে। নাটক দুটিতে কলিম শরাফী, মনি ইমাম এবং আরো অনেকে অভিনয় করেন।

ঢাকার পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলনে ‘প্রান্তিক’ অংশগ্রহণ করে দেশের সংস্কৃতি কর্মীদের মাঝে সাড়া ফেলে। এতে প্রান্তিক সরকারের রোষানলে পড়ে। কেউ কেউ কারাগারে গেলেন। সরকারি নির্যাতন থেকে বাঁচতে ১৯৫৬ সালে ‘কৃষ্টি কেন্দ্র’ নাম দিয়ে সংগঠন চালু রাখা হয়। কৃষ্টিকেন্দ্রের সভাপতি নির্বাচিত হন আবুল ফজল এবং সাধারণ সম্পাদক হন এ.জি. নবী। কৃষ্টিকেন্দ্রের নাট্যবিভাগে অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন মনি ইমাম, মীরা সেন প্রমুখ। কৃষ্টিকেন্দ্র থেকে তুলসী লাহিড়ী রচিত ‘লক্ষ্মী প্রিয়ার সংসার’ নাটকটি সেন্ট প্লাসিড স্কুল মিলনায়তনে অভিনীত হয়েছিল। সেটিতে মনি ইমাম অভিনয় করেন। সেই সময়ে চট্টগ্রাম কৃষ্টিকেন্দ্র সংস্কৃতি জগতে উল্লেখযোগ্য নাম হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৭ সালে চট্টগ্রাম যুবলীগের উদ্যোগে জে.এম. সেন হল প্রাঙ্গণে চট্টগ্রাম যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নাটকে মনি ইমামসহ আরো অনেকে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

১৯৬০ সালে নজরুল জন্মজয়ন্তী উদ্‌যাপনে মমতাজউদ্দিন আহমদ নজরুলের ‘রাক্ষুসী’ গল্পের নাট্যরূপ দেন। ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটে অভিনীত রাক্ষুসী নাটকে অভিনয় করেন মনি ইমাম, নাসরীন, কাজী আলী ইমাম, মাহবুব হাসানসহ অনেকে। পাকিস্তান সরকারের প্রচন্ড বিরোধিতার মধ্যেও চট্টগ্রামে ১৯৬১ সালে সেন্ট প্লাসিড হাইস্কুল প্রাঙ্গণে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে মুক্তধারা গোষ্ঠী পরিবেশিত মুক্তধারা নাটকে মনি ইমাম অভিনয় করেন। নাটকটিতে মমতাজ উদ্দিন আহমদও ছিলেন। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের প্রথম নাটক মমতাজ উদ্দিন আহমদের লেখা ডা. কামাল এ. খানের পরিচালনায় ‘সাগর থেকে এলাম’এ তিনি অভিনয় করেন।

স্বামী আলী ইমাম সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং নাট্যশিল্পী ছিলেন। চট্টগ্রামের নাট্যান্দোলনে আলী ইমামের অবদান অপরিসীম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি হানাদারের গুলিতে শহীদ হন। স্বাধীনতার পর মনি ইমাম চট্টগ্রামে স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন। সন্তানদের লালন পালনের জন্য এই শহীদ জায়া স্বাধীনতার পর আর মঞ্চে অভিনয় করেননি। মুক্তিযুদ্ধের পূর্বে ২৫টি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। স্বাধীনতার পর মঞ্চে অভিনয় না করলেও চট্টগ্রাম বেতারে নাটকে অভিনয় এবং অনুষ্ঠান করতেন। মনি ইমাম এবং স্বামী আলী ইমাম প্রথম সন্তান মুনিরুল ইসলাম কাঁকরকে নাট্যশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন। মনি ইমাম সন্তান কাঁকরকে অভিনয়ের বিভিন্ন কলা শিক্ষা দিয়েছেন। কাজী কাঁকর, সদরুল পাশা ও খসরুল কবির মিলিতভাবে ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামের প্রথম নাটকের দল ‘থিয়েটার ৭৩’ প্রতিষ্ঠা করেন।

মনি ইমাম ছিলেন নিভৃত দেশপ্রেমিক নাট্যশিল্পী। শিল্প সংস্কৃতিতে চট্টগ্রামের সমৃদ্ধিতে স্মরণীয়। দেশের নাট্যান্দোলনের ইতিহাসে অনন্য নজির। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিংবদন্তি এই নাট্যশিল্পী অবদানের জন্য সরকারি কোনো স্বীকৃতি পাননি।

দেশের প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক শওকত ওসমান ‘স্মৃতি খণ্ডঃ চট্টগ্রাম’ প্রবন্ধে লিখেছেন– ‘চট্টগ্রামে নাট্যান্দোলনের কথায় প্রথমে মনে পড়ে ইমাম ভাতৃ যুগলের কথা। কাজী হাসান ইমাম ও কাজী আলী ইমাম। বেড়াভাঙ্গা দলের মানুষ উভয়ে। নারী ভূমিকায় নাটকে কোনো মুসলমান মেয়ে অভিনয় করবেতা কল্পনা করা যেতো না ১৯৪৮৪৯ সনে। কাজী আলী ইমামের স্ত্রী বেগম মনি ইমাম সেদিক থেকে এ দেশে নাট্যান্দোলনের ইতিহাসের অন্তর্গত। নমস্য মহিলা। ’

পূর্ববর্তী নিবন্ধরাশেদ রউফ – এর অন্ত্যমিল
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্বকাপ ও বাংলাদেশের আবেগ