বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হলো বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের অভাব, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব, জনসংখ্যার আধিক্য এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য। এছাড়াও আছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংকিং খাতে উচ্চ ঋণের বোঝা।এর মধ্যে বেকারত্ব দূর করা গেলে অন্যান্য সমস্যাগুলো আস্তে আস্তে দূর হয়ে যাবে। তাই বর্তমান সরকার প্রাথমিকভাবে এক কোটি লোকের কর্মসংস্থানের লক্ষ নিয়ে কাজ করছে। তবে দেশে প্রকৃত বেকার সংখ্যা কত এর সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। সরকার বেকারের যে হিসাব দেয়,তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব মতে, এক দশক ধরে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৫–২৭ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ১৮ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ বেকার, তা অতি সামান্য। কিন্তু বেকারের সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এটাই সত্য।
দেশে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ তেমন কোন কাজ পান না। তারা না করে পড়ালেখা, না করে কোন স্থায়ী কাজ–তাঁরা ছদ্মবেকার। কোনো রকমে জীবনধারণের জন্য কাজ করে। দেশে প্রতিবছর কমপক্ষে ২০–২২ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। যাদের এক–তৃতীয়াংশ বিদেশে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়। বাকি ১৪–১৫ লাখ দেশে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়। তবে বেকারের সংখ্যা যেহেতু প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। এর মানে প্রতিবছর যত তরুণ–তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করে, ঠিক তত সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হয়।
সরকারের দেওয়া এই পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অর্থনীতিবিদদের। তাঁদের মতে,সরকার যে হিসাব দেয়, প্রকৃত বেকারের সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে মজুরি পেলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হবে না। এক মাস ধরে কাজ প্রত্যাশী, সর্বশেষ এক সপ্তাহে কেউ যদি এক ঘণ্টা মজুরির বিনিময়ে কাজ করার সুযোগ না পান, তাঁদের বেকার হিসেবে গণ্য করা হবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সংজ্ঞা। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করে জীবন ধারণ অসম্ভব। উন্নত দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উন্নত দেশের মানুষ সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ করলে মজুরির পাশাপাশি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাঁদের বেকার ভাতা দেওয়া হয়। ফলে জীবন ধারণের খরচ জোগাতে তাঁদের খুব বেশি সমস্যা হয় না।
বাংলাদেশে বিপুল সংখ্যক নিষ্ক্রিয় তরুণ–তরুণী আছেন। এই সংখ্যা প্রায় এক কোটি। যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। যেকোনো দেশে এ বয়সের তরুণ–তরুণীরা হয় পড়াশোনায় থাকে, নতুবা কাজের মধ্যে থাকে কিংবা প্রশিক্ষণে থাকে। কিন্তু দেশে তাঁরা এই তিনটির কোনোটিই করছেন না, তাহলে তাঁরা কী করেন? তাঁরা মূলত ‘ছদ্মবেকার’ নামেই পরিচিতি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এমন নিষ্ক্রিয় তরুণ–তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ–তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। ১০ বছর ধরে এমন ছদ্মবেকার বা নিষ্ক্রিয় তরুণ–তরুণীর সংখ্যা এক কোটির মতো রয়েছে। এর মানে দেশে সংজ্ঞা অনুসারে ২৭ লাখ লাখ বেকার আছেন। এর সঙ্গে ছদ্মবেকার এক কোটি যুক্ত হলে দেশের প্রায় সোয়া কোটি মানুষকে বেকার বলা যায়।
সাধারণত বেকারত্ব তিন ধরনের। যেমন সামঞ্জস্যহীনতাজনিত বেকারত্ব, বাণিজ্য চক্রজনিত ও কাঠামোগত বেকারত্ব। শ্রম বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ঘাটতি থাকলে সেটিকে সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব বলে। উত্তরবঙ্গ ও হাওর অঞ্চলে এমন বেকারত্ব দেখা যায়। শিল্পকারখানা ও সেবা খাতে যে ধরনের লোক প্রয়োজন, সেই ধরনের লোকের সরবরাহ কম থাকলে তা সামঞ্জস্যহীন বেকারত্ব। এই বেকারত্ব নিয়েই বেশি কথা হচ্ছে। এ ছাড়া অর্থনীতিতে চাঙাভাব কিংবা মন্দাভাবের কারণেও অনেক সময় বেকারত্ব বাড়ে–কমে। যেমন কোভিডের কারণে বেকারের সংখ্যা বেড়েছিল। এটি বাণিজ্য চক্রজনিত বেকারত্ব। আবার প্রযুক্তির পরিবর্তনের কারণেও বেকারত্ব বাড়ে। এ ধরনের বেকারত্বকে কাঠামোগত বেকারত্ব বলে।
বাংলাদেশে বেকারত্বের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের তুলনায় শ্রমশক্তির বেশি জোগান, শিক্ষাব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের মধ্যে অমিল (ংশরষষ মধঢ়), কারিগরি শিক্ষার অভাব এবং ধীর শিল্পায়ন অন্যতম। এছাড়া দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং কৃষি খাতে মৌসুমি বেকারত্বও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তবে সবকিছু ছাড়িয়ে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, যার পেছনে রয়েছে কারিগরি দক্ষতার অভাব। অন্যদিকে কায়িক পরিশ্রমের কাজ ও কৃষি ক্ষেত্রে রয়েছে শ্রমিকের অপ্রতুলতা। দেশে জমির বৃহৎ একটি অংশ চাষাবাদের বাহিরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। মৎস্য পোল্ট্রি ফিশারিজ ক্ষেত্রে রয়েছে দক্ষ লোকের চরম আকাল।
বাংলাদেশে বর্তমানে হাজার হাজার বিদেশী বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে কাজ করছে। এর মধ্যে শুধু রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কাজ করছে পাঁচ হাজারের অধিক রাশিয়ান নাগরিক। এর বাহিরে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ইস্পাত শিল্পে রয়েছে প্রচুর চাইনিজ ভারতীয় শ্রীলঙ্কানসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাস সেক্টরে রয়েছে অনেক পশ্চিমা দেশের নাগরিক। এখন প্রশ্ন হলো দেশে এতো শিক্ষিত বেকার থাকার পরও কেন বিদেশের এতো মানুষ এখানে কাজ করছে? কারণ হলো বিদেশের এসব লোকের কর্মদক্ষতার সমকক্ষের জনশক্তি দেশে এখনো তৈরী হয় নাই। এর বাহিরে রয়েছে এসব বিদেশী লোকের কাজের প্রতি একাগ্রতা সততা দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। তাই দেশে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ তৈরী না করে কারিগরি শিক্ষার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। আগেই বলেছি দেশে কৃষিখাতসহ কায়িকশ্রমের কাজ করার মত দক্ষ লোকের অভাব প্রকট। তাই কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অন্যান্য কায়িক পরিশ্রমের কাজের জন্য প্রান্তিক পর্যায়ে ট্রনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনবোধে প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত প্রাইমারি স্কুলগুলোতে বৈকালিক বা সান্ধ্যকালীন ভোকেশনাল ট্রেইনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পিউর সাবজেক্টের বদলে বিশেষায়িত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষার শেষ বর্ষে অবশ্যই বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে হাতেকলমে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদেরকে কঠিন সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ বিদেশে কাজ করে। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভিত্তি করে টিকে আছে দেশের অর্থনীতি। যারা বিদেশে আছে তারা অমানুষিক পরিশ্রম করে এই অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠায়। সেখানে তারা অনেক কষ্ট করে, যা দেশে করলেও ভালো অংকের অর্থ ইনকাম করতে পারে। কিন্তু মনমানসিকতার অভাবে তারা দেশে একই ধরনের কাজ করে না। দরকার হলে বেকার জীবনযাপন করবে হাত পেতে চলবে তবুও একই রকমের কাজ করবে না। তাই আমাদের মনমানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। আর সেটি করা গেলে অচিরেই দেশে বেকারের হার কমবে সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।











