দেশ হতে দেশান্তরে

হজ ও প্যানডেমিক মোকাবেলা-২

সেলিম সোলায়মান | রবিবার , ২ আগস্ট, ২০২৬ at ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

করিডোর ধরে এগুতে এগুতেই, এলো ফোন সেলস হেড ও বন্ধু খলিলের।

হ্যালো সেলিম, ক্যান ইউ নাও কাম টু মাই মিটিং। আমার ম্যানেজারদের নিয়ে মিটিংয়ে বসেছি আমি। ওরা কথা বলতে চায় তোমার সাথে।”

ভাবলাম বলি ব্যস্ত আছি। প্রটোকলের ব্যত্যয় ঘটিয়ে ‘উঠ ছেরি তোর বিয়া মার্কা’ ডাকে সাড়া দেওয়া ঠিক হবে না। সেলস মার্কেটিঙয়ের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনেই, থাকে নানান টানাপোড়েন। খলিলের গলার স্বরেই পেয়েছি টের, উটকো একটা ঝামেলার মুখোমুখি হতে যাচ্ছি ।

এ ধরনের মিটিংয়ে বেশীরভাগ সময়ই যা হয়, তা হল ইংরেজিতে যাকে বলে মাংকি শিফটিং, তা। এ নিয়ে এক দশকের অভিজ্ঞতা ঝুলিতে। সমস্যা নাই। কিন্তু প্রটোকল অনুযায়ী আগে তো জানাতে হবে। নাকি, খলিলও আর সব সৌদিদের মতোই মিসকিন ভাবে আমাকে?

নাহ, যাবো না। আহ! না গেলেও তো ওরা ভাববে যে ভয় পেয়েছি। একাত্তরে কেচকি মাইর দিয়া আধুনিক অস্রশস্র সজ্জিত পাকহানাদার খেদানো বাঙ্গাল আমি! তদপুরি না গেলে মনোক্ষুন্নও হবে, খলিল। সেইই তো এখানে আমার ঘনিষ্ঠতমদের একজন। বিদ্যুৎগতিতে চিন্তা করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম, হচ্ছে মিটিং কোথায়? উত্তরে বুঝলাম, অফিসের পাশের নামকরা লেবানিজ রেস্টুরেন্টেই হচ্ছে মিটিংটি। অতএব করলাম হ্নটনের দিক পরিবর্তন। থমথমে ভাব রুমেজুড়ে। জেদ্দার পেইন সেলস ম্যানেজার, পড়েছে খলিলের তোপের মুখে। আসার পর থেকেই দেখছি, ঐ রিজিওনের পারফর্মেন্সে চোখে পরার মতো ঘাটতি। অবাক হইনি মোটেও তাই। রুমে ঢুকতে ঢুকতে ভেবেছিলাম বসবো পেছনের কোন এক কোনায়। সাথে সাথেই মনে হল, ভুল মেসেজ যেতে পারে এতে। চলে গেলাম তাই একদম সামনে। সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে নিঃশব্দ সম্ভাষন করে বসলাম খলিলের পাশে। এতো দ্রুতই হাজির হব, এমন আশা করেনি খলিল। থতমত খেয়ে, আলোচনার গতি পাল্টে আমাকে সুস্বাগতম জানানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু গলার স্বরে নাই অতিচেনা তার আন্তরিকতার ছাপ। ফলে দেরী না করে বললাম, বুঝতে পারছি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ছিলে তোমরা। তাতে ব্যাঘাত ঘটানোর জন্য দুঃখিত। বেশীক্ষণ থাকতেও পারবো না আমি। আমাকে কার কী বলার আছে তা শুনে বরং চলে যাই, কি বল? হাঁফ ছাড়লো খলিল! দ্রুত বলল তার টিমকে, যার যা বক্তব্য তা পেশ করার জন্য। সাথে সাথেই লাফিয়ে দাঁড়িয়ে গেল জেদ্দার ব্যাথা ম্যানেজার। একগাদা অভিযোগ তার মার্কেটিঙয়ের বিরুদ্ধে। ধুম ধাম ছুড়তে শুরু করলো তির সে হাসিমুখে মাথা নাড়তে নাড়তে শুনছি, চুপচাপ। তাতেই মনে হচ্ছে ভড়কে গেল বেচারা। বিভ্রান্তও কিছুটা। অভিযোগের তোড় থামিয়ে জিজ্ঞেস করল – ‘তুমি কিছু বলছ না যে ডঃ সেলিম?’ শেষ তো হোক তোমার বক্তব্য।

না, না আর কথা নাই। তুমিই বল এবার মার্কেটি যদি এভাবে সাপোর্ট কমিয়ে দেয়া, তাহলে এচিভ করবো কিভাবে?’

আর কিছু? ‘নাহ।’ তাহলে বাকী কারো বক্তব্য থাকলে বল? নীরবতা রুমজুড়ে।

ধরলাম টেনে রাশ দ্রুত। বললাম, ঠিক আছে, আর কারো যেহেতু কোনকিছুই বলার নাই, ধরে নিচ্ছি তোমার কথাই, সবার কথা। তা এখন বল, তোমার টিম যে সাপোর্ট পায়, বাকীরাও কিন্তু তাই পেয়েছে। তারা তো সব এচিভ করেছে!

সাথে সাথেই একযোগে গুজ গুজ করে উঠলো কয়েকজন!

শোন, এভাবে একসাথে অনেকজন কথা বললে এবং ঐসব কানে গেলেও, কারো কথাই বুঝতে পারবো না। থামছি আমি। বল এখন অন্য যে কোন একজন যা বলতে চাও

দাম্মামের হৃদরোগ টিমের আত্মবিশ্বাসী সেলস ম্যানেজার দাঁড়ালেন এবার। বললেন প্রোডাক্ট ম্যানেজাররা বলছে,

তুমি কষ্ট কন্ট্রোল করার জন্য সব গিফট কেনা বন্ধ করে দিয়েছ। আবার সায়ন্টেফিক মীটিঙও করতে দিচ্ছ না। আমাদের এচিভমেন্ট হবে কিভাবে তাহলে?’

পেলাম টের ঘরের শত্রু বিভীষণের অনিবার্য নিত্যতা। সাথে মনে পড়লো সারাক্ষণই ফিসফিস শুনি যে মিশরি মাফিয়ার কথা, তাও। বললাম তাই শোন, তোমরা এচিভ না করলে, খলিলের এচিভমেন্ট হবে না; মানে আমারও হবে না। অর্থাৎ আমাদের সবার বস ফিলেরও হবে না। ওরকম কিছুতো আমি হতে দেবো না। সুতরাং সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ যদি থাকে সেটাই বল! “আমার ৫ জন ডাক্তার লন্ডনের সেমিনারে যাবে। তাদেরকে ইজিপ্ট এয়ারের টিকিট দেয়া হয়েছে, খরচ কমানোর জন্য।” কোন এয়ারলাইন্সে কে যাবে তা তো আমি ঠিক করি না। সে যাক, তোমার ডাক্তারদের কোন এয়ারলাইন্সের টিকিট লাগবে, শুনি?

এমিরেটস।”

ওকে ডান। তাই হবে। সব টিকিট বদলে নিও। সাথে সাথেই গুনগুনিয়ে উঠলো কয়েকজন। করলাম আশ্বস্ত তাদেরও। মানে সবারই জন্যই এমিরেটস ফাইনাল। নীরবতায় থমকে থাকলো রুম কিছুক্ষণ। কিন্তু অচিরেই দাঁড়ালেন জেদ্দা ব্যাথা সাব। জোর দাবী তার, গিফটের বরাদ্দ দিতে হবে! শোন, সব স্টোরের হিসাব আমার নখদর্পণে। তোমার স্টোরে প্রচুর পরিমাণে গিফট পড়ে আছে, আগে তো ওসব শেষ করো। তারপর কথা হবে। আর কারো কোন কথা না থাকলে, আমি এখন যাচ্ছি । হ্যাঁ, খলিল এ বিষয়ে তোমার সাথে আলাদা বসবো। বাই ! “ইয়া হাবিবি, সেলিম মাই ব্রাদার, মাই ফ্রেন্ড, লাঞ্চ করে যাবে তো” বেশ আন্তরিক খলিল। ঘুরে বললাম, নাহ আজ না। কাজ আছে। হবে অন্য কোনদিন।

লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণসাহিত্যিক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআত্মবিশ্বাস : উপরে ওঠার সিঁড়ি
পরবর্তী নিবন্ধডলু নদীর সুখ-দুঃখের উপাখ্যান