‘না, না কিছুতেই না, অবশ্যই না। একদমই একমত নই আমি, ড. আমির।’ ‘তাহলে যে গত বছর তুমি এনাকেই, বেইজিং এর সায়েন্টিফিক সেমিনারে নিয়ে গিয়েছিলে। এছাড়া কাস্টমার ডাটাবেইজে উনিই তো আছেন এক নম্বরে, তাই না ডঃ ইসাম?’ ‘প্রথমত তাকে বেইজিঙয়ে নিয়ে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে,সেই কারণেই তো তাকে আর নেয়া যাবে না। দ্বিতীয়ত কাস্টমার ডাটাবেইজ ভুল। তৃতীয়ত, উনি হলেন মৃগীরোগ বিশেষজ্ঞ, আমাদের তো দরকার মাল্টিপল স্ক্েলরোসিস স্পেসিয়ালিস্ট।’ আল গা’রের দ্বিতীয় কারণটি, উস্কে দিল এতক্ষনের আলোচনায় নিশ্চুপ ইসামকে। জানালো শক্ত আপত্তি
‘তা আমি বা আমার লোক কাস্টমার ডাটাবেইজ, নিজে নিজে বানাই নাকি? তোমাদের টিম থেকেই তো আসে ইনপুট!’
নাহ, গঠনমূলক বিতর্ককে আক্রমণাত্মক বিতণ্ডায় পরিণত হতে দেয়া যায় না। যে তিনজনকে নিয়ে বসেছি তাদের দুজন সরাসরি আমার টিমের হলেও, আল গা’র সেলস টিমের। অতএব আম্পায়ারের ভূমিকা নিয়ে বললাম, শোন কাজ করলে ভুল হবে। ভুল ধরা পড়লে তা থেকে শিখে শোধরাতে হবে। গা’র তুমি এখন বরং সেই বেইজিঙ অভিজ্ঞতাই বলো।
‘কী যে বলি? লজ্জার ব্যাপার। তবে এটা বলছি, আমি যতদিন নিউরোলজি টিমের দায়িত্বে আছি, ঐ প্রফেসরকে কোনদিনই কোন সেমিনারেই পাঠানোর জন্য প্রস্তাব করবো না!’ ‘ওনার তো প্রচুর রোগী! তাকে বাদ দিলে নিউরোলজি টার্গেটের কী হবে?’ গা’রের ধনুভঙ্গ পণ শুনে আঁতকে উঠলো প্রোডাক্ট ম্যানেজার আমির শামীম। ‘আরে ঐ টার্গেট তো আমারও। আমি জানি কাকে দিয়ে কী করাতে হয় আর এই মার্কেটে কার গুরুত্ব কতটুকু!’ তুমুল আত্মবিশ্বাসী আল গা’র! চোখে চোখে আমিরকে তাই থামবার ইঙ্গিত দিয়ে বললাম ফের গা’রকেই, একটু ঝেড়েই কাশো না। তাতেই তো বুঝবে সবাই। কী আর এমন লজ্জার বিষয় যে ওটা বলতে বাঁধছে তোমার? সবাই তো প্রাপ্তবয়স্ক এখানে।
“ব্যাপারটা প্রাপ্তবয়স্কই, তাই লজ্জারও। বলছি। সেবার ঐ প্রফেসরসহ আরো দশজনকে নিয়ে গিয়েছিলাম ঐ সেমিনারে। দলে সেই ছিল সবার সিনিয়র। একমাত্র সৌদিও। বেইজিং এয়ারপোর্টে নেমেই, আমাকে একপাশে নিয়ে বলেছে সে, শোন হোটেলে পৌঁছানোর পর, যে ক দিন বেইজিং থাকবো, আমার খোঁজ করবে না! আমি আমার মতো থাকবো। ফেরার দিন দেখা হবে এয়ারপোর্টেই। এর মাঝে, খবরদার! মোটেও বিরক্ত করবে না। শুনে তো থ আমি! ভাবি, সেমিনারে যোগ না দিয়ে করবেটা কী সে তবে? কিন্তু কী আর করা। বাধ্য হয়ে মানতে হয়েছে তাঁর হুকুম।” উনি কি ঐ কয়দিন বেইজিং ঘুরে বেরিয়েছেন নাকি? হুম! এরকম কাউকে তো অবশ্যই স্পন্সর করতে পারি না। করলাম স্বাগত মন্তব্য।
“ঘুরে বেড়ালেও তো হতো! ঐ কয়দিন, একেকদিন কোত্থেকে যে একেকটা চায়নিজ মেয়ে যোগাড় করেছে সে, জানি না! তারপর হোটেলেই রুমে পড়েছিল! চুপে চুপে তার খোঁজ নিয়েছি বলে, ভেবেছিলাম আমিই বুঝি জানি ঐ খবর। পরে দেখি জানেন তা, দলের সবাই! এমনকি আরব আমিরাত, কাতার, লেবানন মানে মধ্যপ্রাচ্যের আর যে সব দেশের নিউরোলজিস্টরা গিয়েছেন, তাঁরাও কিভাবে জানি জেনে গেছেন!
সবচেয়ে বিব্রতকর হল, কোন কোন ডাক্তার মনে করেছে ঐ সব বুঝি আমিই তাকে ব্যবস্থা করে দিয়েছি, কোম্পানির খরচে! মানে আমার আর কোম্পানির ইজ্জত হয়েছে এক্কেবারে ফানা ফানা! অবশ্য ঐ কারনে মধ্যপ্রাচ্যের নিউরোলজিস্ট কমিউনিটিতেও গুরুত্ব হারিয়েছে সে” –তীব্র রাগ ক্ষোভ আর বিরক্তিতে মন বিষিয়ে, চোখ উঠেছে কপালে আমার। অন্যদিকে পিনপতন নিরবতা। অতপর খুললো মুখ স্বল্পভাষী ইসাম– “আজই ডাটাবেইজ আপডেট করবো। এ লোকের যতো রোগীই থাকুক, তাকে কেউ মানবে না। এইরকম কেউ আমাদের ‘কী অপিনিয়ন লিডার’ হতেই পারে না।”
ইসামকে ধন্যবাদ দিয়ে তাকালাম আমিরের দিকে। নিশ্চুপ তার চেহারাজুড়ে লেপটে আছে বিব্রতভাব। অতএব গা’রের সাথে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করে বললাম, দাও তবে তোমার প্রস্তাব “প্রফেসর সাইদ বোহলেগা। কিং ফয়সাল স্পেশালিস্ট হসপিটাল এন্ড রিসার্চ সেন্টার, রিয়াদ।” তোমার কথাই সই। তবে শর্ত হচ্ছে কোম্পানির “মিডলইস্টার্ন এডভাইসরি বোর্ড” এর সদস্য হিসেবে, প্রফেসর বোহলেগার নাম সুপারিশ করার আগে, আমি তাঁর সাথে দেখা করতে চাই। কথা বলতে চাই। কবে নিতে পারবে এপয়েন্টমেন্ট? সময় কিন্তু নাই হাতে খুব একটা। “উঠছি এখনি তাহলে আমি। এপয়েন্টমেন্ট নেবার জন্য আজই দেখা করার চেষ্টা করবো প্রফেসরের সাথে।”
আল গা’র নিষ্ক্রান্ত হতেই মুখ খুললো আমির, “আমিও কি যেতে পারি তোমার সাথে এই প্রফেসরের সঙ্গে পরিচিত হতে?” নাহ, তা ঠিক হবে না। একই সাথে তিনজন গিয়ে হাজির হবার কোন মানে নাই। আমি ঘুরে আসার পর যেও অন্য কোনদিন। তুমি কী ঐ বেইজিংকাণ্ড ঘটানো ডাক্তারকে কখনো ভিজিট করেছ? “নাহ! আসলে সময় পাই নাই তো।” তাহলে এখন দ্রুত আগে তাঁর সাথে দেখা করে আসো? তারচেয়ে বড় কথা মার্কেটে তার ইমেজ কেমন ওটাও তো তোমারই বোঝা দরকার, কি বলো? ঠিক আছে এই মিটিং এখানেই শেষ।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, নিশ্চয় নিশ্চয়” বলতে বলতে আমির চলে গেলেও, চুপচাপ দাঁতে আঙুলের নখ কাটছে দেখছি, ইসাম! জানি, বস হিসেবে আমাকে মেনে নিতে তার সেই আপত্তির কথা। তদোপরি গোটা কোম্পানিতেই পরিচিতি তার, বাংলায় যাদেরকে গুটিবাজ বলা হয়, ঐরকম। উপস্থিতি তার তাই গলার কাঁটা হয়েই খোঁচায় বেশীরভাগ সময়। কিন্তু এমুহূর্তে তার দিকে তাকিয়ে মনে হল –আহারে, ঈদ উপলক্ষে কতোজনই তো গেছে, নিজ নিজ দেশে। আমার টিমের কানাডিয়ান পাকিস্তানি আমির শামিম, দেশী ছোটভাই জিয়া, পাপ্পু ভাই এরা তো ইচ্ছে করেই যায়নি দেশে। অথচ ইসাম তো ইচ্ছা করলেও যেতে পারে না প্যালেস্টাইনে! আচ্ছা জিজ্ঞেস করবো নাকি, কখনো গিয়েছে কী না সে তার মাতৃভূমিতে? নাহ, এরকম প্রশ্ন, হয়ে যাবে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা। “ড. সেলিম, বুঝলে তো, কেন ডাটাবেইজে গোলমাল? আসলে কেউ এ নিয়ে এতদিন মাথা ঘামায়নি। না সেলসের, না মার্কেটিঙয়ের। ফিল্ডের ছেলেরা যা দেয় তাই তো ডাটাবেইজে ঢোকায় আমার লোকজন। তারপর খালি ভুল ধরে সবাই। আজ এ মিটিঙয়ে আসার আগেই, প্রথমবারের মতো ড. আমির আমার কাছে ডাটা চেয়েছে। এর আগে মার্কেটিং টিমেরও কেউ কখনো ঐসব ডাটার খোঁজ ও নেয়নি। তুমি আমাকে এ মিটিঙয়ে না রাখলে, দুজনে মিলে কিন্তু আমাকেই দোষী বানাতো আজ!” শোন আমি তো নতুন, তাই নানানজনের কাছ থেকে নানান কিছু জেনে শুনেই এগোই। এরকম মিটিং তো সবসময় করবো না। তবে যখনই করবো, ডাকবো তখনই তোমাকে। এখন বলোতো, ঐ ডাটাবেইজের যে কাজ দিয়েছিলাম তার অগ্রগতি।
“এগুচ্ছে, তবে খুব ধীরে। তুমি যদি একটু ড. খলিলকে বলে দিতে। এই যে আজ যেমন, আল গা’রের মতামত পেলাম। এরকমভাবে যদি সেলসের ফার্স্ট লাইন ম্যানেজাররা আর প্রোডাক্ট ম্যানেজাররা বসে আমার সাথে, তাহলেই হবে কাজ।”
ঠিক আছে। আজই প্রোডাক্ট ম্যানেজারদের বলে দিচ্ছি। খলিলের সাথেও বলব কথা এ বিষয়ে শিগগির। ‘থ্যাংকস ড. সেলিম।’ ইসাম চলে যেতেই, ভাবলাম গা’র যদি কাল বা পরশুর মধ্যে এপয়েন্টম্যান্টটা করে ফেলতে পারে তাহলে খুব ভাল হয়। আর প্রফেসর বোহলেগার সাথে কথা বলে যদি বুঝতে পারি, গা’র যে রকম আত্মবিশ্বাসের সাথে তার নাম প্রাস্তাব করলো, তা যুক্তিযুক্ত, তাহলেই কেল্লা ফতে! গতকালই ফিরেছি দেশ থেকে ১৫ দিনের ঈদঅবকাশ কাটিয়ে।
হেডকোয়ার্টার বাসেলে তো ঈদের ছুটি বলতে কিছু নাই, কাজটা এসেছিল তাই তখনই, জরুরি ভিত্তিতে। অনেকদিনই ঢাক ঢাক গুড় গুড় শুনেছি মাল্টিপল স্ক্েলরোসিস নামের দুরারোগ্য এক স্নায়ুরোগের নিদান আবিষ্কারের। ইদানীং হঠাৎ করেই হেডকোয়ার্টার ওটা নিয়ে দ্রুতগতিতে মার্কেটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই ঔষধটির জন্য মধ্যপ্রাচ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট। প্রথমত এখানে টাকা উড়ে বাতাসে। দ্বিতীয়ত কী এক অজানা কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তরুণীদের মধ্যে এই রোগটির প্রাদুর্ভাব বেশি। ফলে সৌদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট। জরুরি এলান হয়ে আসা কাজটি তাই ঘাড়ের উপর খাড়া হয়ে ঝুলছিল। দেশে বসেই সেজন্য আজকের এই মিটিংটি ডেকেছিলাম। বাহ, ভালই ম্যাজিক দেখিয়েছে আল গা’র ! কালকের মিটিং থেকে বেরিয়ে ঠিকই সে প্রফেসর বোহলেগার আজ সকালের ১১টার এপয়েন্টমেন্ট নিতে পেরেছিল। সে মোতাবেক অত্যন্ত ফলপ্রসূ এবং দীর্ঘ একটা মিটিং শেষ করে বেরুলাম এইমাত্র সেই অফিস থেকে। ড. বোহলেগার সাথে দীর্ঘ আলোচনায় এ এক্কেবার স্ফটিকস্বচ্ছ মানে ক্রিষ্টাল ক্লিয়ার হয়েছে যে, যে বিষয়ে কোম্পানি “মধ্যপ্রাচ্য উপদেস্টা পর্ষদ” গঠন করতে চাচ্ছে, সেটির জন্য ইনি শুধু সৌদি না, বা চলে গোটা মধ্যপ্রাচ্যেরই অন্যতম এক্সপার্ট। বলা যায় না আরব আমিরতাকে টেক্কা দিয়ে সৌদি এই প্রফেসরই হয়ে উঠতে পারেন এই পর্ষদের, চেয়ারম্যান। এমনকি স্থান হতে পারে তাঁর কোম্পানির বৈশ্বিক উপদেষ্টা কমিটিতেও! সর্বোপরি কানাডায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করা প্রফেসর সাইদ বোহলেগা, একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক ও চমৎকার মানুষ। সহকর্মী খলিলের পর এই দ্বিতীয় একজন সৌদির দেখা পেলাম, যাঁর কথায় ও আচরণে প্রকাশিত হয়েছে নিখাদ আন্তরিকতা! মজার বিষয় হল, আলোচনা জটিল ঐ দুরারোগ্য স্নায়ুরোগ নিয়ে শুরু হলেও গড়িয়েছিল তা তরুণীদের দিকে। কারণ, খেয়ালী প্রকৃতির খেয়ালে এ রোগ যে হয় তরুণীদেরই প্রধানত, তা তো বলেছিই। তারই লেজ ধরে চলে এসেছিল সুন্দরীরা। তারুণ্যের বিশেষ লাবণ্য ছটার কারণে তরুণী মাত্রই আমার কাছে সুন্দরী। তারপরও নিজেরই কারণে গুরুগম্ভীর ঐ বৈজ্ঞানিক আলোচনায় হয়েছিল, কৌতূহলে মার্জার হত অবস্থা আমার। হাঁসফাঁস করে সেই দমবন্ধ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করেছিলাম তাই, প্রফেসর, সার্জনদের মধ্যে পিত্তথলির পাথর বিষয়ে থ্রি না কি যেন ফোর এফ যে মিথ, মানে ফেয়ার, ফিমেল, ফারটাইল, ফ্যাট প্রচলিত যে আছে, এরকম কিছু কি এখানেও আছে? ছাদ ফাটানো হাসিতে বলেছেন, ‘বাহ খুব ভাল পয়েন্ট তো দিয়েছ ড. সেলিম! দেখি ঐরকম কিছু একটা বের করতে পারি কি না। তাতেই তো বিশ্বের তাবৎ এক্সপার্টদের মধ্যে বিখ্যাত হয়ে যাবো! সে সূত্র ধরেই চলে গিয়েছিলেন তিনি প্রাচীন আরবি মিথে। বুঝেছি তাতে আমাদের দেশে ঐ যে, যিনি রাঁধেন তিনি চুলও বাঁধেন, বলে যে প্রবাদ আছে, লিঙ্গবিষয়ক সমস্যা না থাকলে এটি অবলীলায় তাঁর ক্ষেত্রে খাটে। লেখক : ভ্রমণসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক।












