পেরোইনি তো কম, কালবোশেখির কাল !
আছে অভিজ্ঞতা, ভয়ংকর সব নম্বর গলায় ঝুলিয়ে আসা নানান নামের টর্নেডো, সাইক্লোনেরও। কিন্তু চোখ মেলে তো দেখি নাই, তার কোনোটাই। তাহলিয়া স্ট্রিট থেকে ডানে মোড় নিয়ে, দীর্ঘ সরল রেখা হয়ে শুয়ে থাকা অজগর, কিং ফাহাদ হাইওয়েতে মাত্রই উঠলাম। এতে সোজা দূর দিগন্তে চোখ যেতেই মনে হল, ঐখানে কোটি কোটি বোতল থেকে কালচে কুণ্ডলী পাকিয়ে বেরিয়ে পড়েছে আরব্য উপন্যাসের শত কোটি দৈত্য! কে বা কারা খুললো হঠাত একযোগে এতো এতো বোতল!
নাহ, একাকী না। দল পাকিয়েছে দৈত্যরা সব। তারপর হাত হাত ধরে একযোগে উঠে গেছে সবাই আকাশের দিকে, শরীরে শরীর মিশিয়ে কোথাও বাদামি কোথাও কালচে রং নিয়ে বিশাল এক হিমালয় হয়ে। দুদিকে বিশাল দুই বাহু ছড়িয়ে সম্মিলিত সেই দৈত্য, আছে যে ভঙ্গিতে, মনে হচ্ছে পড়িমরি করে আসছে দৌড়ে, রিয়াদে শহর কে গিলে খেতে! চাপ তাই পড়লো আরো এক্সেলেটরে।
মনে পড়লো ধাই করেই এসময়, হ্যাঁ একবারই করেছিলাম প্রত্যক্ষ, সাইক্লোন। চড়েছিলাম সেই কৈশোরে যখন রেঙ্গুনগামী জাহাজে। দেখেছিলাম তখন সমুদ্রে সাইক্লোনের রুদ্র ভয়ংকর রূপ। কিন্তু হায়! আমি তো হতে চেয়েছিলাম, শ্রীকান্ত না ইন্দ্রনাথ! যাক, বাঁচা গেল। চোখের সামনে বিশাল কালাপাহাড় হয়ে দৌড়ে আসা দৈত্যটা দেখছি না। এরই মধ্যে ডানে মোড় নিয়ে উঠে পড়েছি কমপাউন্ডমুখী রাস্তায়। এই দুপুরের খাপখোলা ধারালো চক চকে তলোয়ার রোদকে ঘিরে আরেকটু হয়েছে ঘন মরচে। দশদিকেই নামছে ধীরে তাই জীবনানন্দীয় অদ্ভুত আঁধার।
ততোক্ষণে কমপাউন্ডে ঢোকার মুখের তিনস্তরের নিরাপত্তা পেরুতে পেরুতে পেলাম টের, সব গেইটেই সন্ত্রস্তভাব, গার্ডদের চলনে বলনে, দেহভঙ্গিতে। বাংলোর সামনের পার্কিং শেডে, গাড়ী থিতু করে ড্রাইভিং সিট থেকে বেরুতেই খেলাম ঝাপটা, এরই মধ্যে আরো শক্তি সঞ্চয় করা বাতাসের। ধূসর মরুর মাঝের একটুকরো সবুজ আর্কেডিয়া, কমপাউন্ডের গাছগুলো এরই মধ্যেই হয়ে উঠেছে ধূসরিত, ধূলায়। নানান দেশ থেকে আনা গাছগুলোর দিকে তাকাতেই মনে হল, হয়ে আছে সবাই জুবুথুবু, সন্ত্রস্ত। শুধু খেজুর গাছগুলোই মোটেও দিচ্ছে না পাত্তা। তিরতির কাঁপাচ্ছে তো না, নাচাচ্ছে তারা তাদের প্রতিটি ডানার শক্তপোক্ত পাতাগুলো। যাহ, দু চোখ কচ কচ খচ খচ করছে দুচোখ। দ্রুত চশমা খুলে হাতে নিয়ে হাতের পিঠ দিয়ে চোখ কঁচলাতে কচলাতে এগুলাম সিঁড়ির দিকে ত্রস্ত পায়ে। ঘরে ঢুকেই, বা কাঁধে ঝুলতে থাকা ল্যাপটপটি সোফার উপর ছুঁড়েই, দিলাম ছুট বাথরুমে দিকে। বেশ কিছুক্ষণ চোখে জলের ঝাপটা দেয়ার পর, প্রাকৃতিক ক্রিয়াদি সেরে ফিরলাম ড্রইংরুমে। সোফায় গা এলিয়ে, ধীরেসুস্থে ধরালাম সিগারেট একটা। বেশ ক’টা টান দিয়ে একটু থিতু হতেই, দিলাম ফোন জিয়াকে। ফোন ধরেই ওপাশ থেকে এলো ভেসে
“এই যে দেখেন সেলিম ভাই। আমিই এখন যখন ফোন করবো করবো ভাবছিলাম, তখনই আপনি করলেন। বাসায় ফিরছেন তো?”
হুম ফিরছি। আপনি কই? ভাবি, জুনাইরা কই?
“সবাই বাসায় এখন আমরা। আপনার ভাবীর আর জুনাইরার স্কুল সকালেই ছুটি দিয়া দিছিল। আর আমার অফিস তো কাছেই। আপনি কি এর আগে এখানকার ঝড়ে পড়েছিলেন?”
না তো– “ওহ হো, মাস দুই আগে যখন আসছিল যখন শামাল আরেবার তখন তো দেশে ছিলেন। মনে আছিল না। শোনেন ভাই, দরজা জানালা সব টাইট কইরা লাগাইয়া রাখেন। আর ঘরের থেইক্কা বাইর হইবেন না একদম ঝড় না থামা পর্যন্ত। কাল সকালে ভাবসাব বুইঝা বাইর হইয়েন।”
জানালা তো খুলিই না। সবই বন্ধ আছে।
“তাও সব জানালা একটু চেক কইরা দেখেন। ওহ হো আরেকটা কথা, এসি খুইলেন না। ধুলা ঢুইকা পড়ব ঘরে। আর এমনিতে তো ঠাণ্ডা পরে এই ঝড়ের সময়।”
শুনেই, দ্রুত সোফা থেকে উঠে সেন্টার টেবিলে থাকা রিমোটটা নিয়ে, বন্ধ করলাম ড্রইংরুমের এসি । সিগারেট ধরানোর আগে বরাবরের অভ্যাসবসত, এই রুমের এসিটা চালিয়ে দিয়েছিলাম। ভাল যে, খোঁজ খবর নেবার জন্য ফোন করে, পেয়ে গেলাম গুরুত্বপূর্ণ মরুঝড় টিপস! ভাল কথা বলছেন জিয়া। দাঁড়ান আমি একটু সব জানালাগুলি আবারো চেক কইরা দেখি। কেমন যেন একটু শব্দ আসছে ঐদিক থেকে। ঐ রুমের জানালাগুলাই চেক কইরা আসি। বলা তো যায় না, আরিফ ঘর পরিষ্কার করার সময়, কোন জানালা বন্ধ করতে ভুইলা গেছিল কি না। পরে কথা হইবো। বলেই ফোন কেটে দিয়ে প্রথমেই গেলাম একদম ডানের বেডরুমটাতে। ঐ রুমে তো ঢোকাই হয় না। তবে প্রতি সপ্তাহে আরিফ সব রুমই ঝাড়াপোছা করে যখন, তখন তো সে গোটা ঘরই পরিষ্কার করে। দেখা দরকার ঐ রুমেরসহ, পাশের রুমের আর বাথ রুমগুলোর ছোট জানালাগুলোও। একে একে এদিকটার সব জানালা পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হয়ে এগুলাম রান্নাঘরের দিকে। আসলে প্রতিদিন অন্তত দু বার ঐ জানালাগুলিই তো খুলি আমি। খুলি জানালার কার্নিশে কমপাউন্ডের অধিবাসি ঘু ঘু আর চড়ুইদের জন্য খাবার ছড়িয়ে রাখার মানসে। থাকলে ওগুলোরই সম্ভাবনা আছে খোলা থাকার।
সারা ঘরের সব জানালায় দুই স্তরের পর্দা থাকলেও, একদম পর্দাহীন এই জানালা দুটোই রান্নাঘরে ঢুকেই তাই জানালার কাঁচের ওপাশে চোখ যেতেই বোঝা গেল রোদের গায়ে মরচে ধরার যে ভাব দেখেছিলাম গাড়ী চালাতে চালাতে, সেই মরচে ঢের জমাট ও গাঢ় হয়েছে এরইমধ্যে।
নাহ, এগুলো বন্ধই আছে। তবে নিয়মিত খোলাখুলি কারণে, এই জানালা দুটোর কব্জাগুলো সম্ভবত ঢিলা হয়েছে। বাতাসের তোড়ে তাই কিন কিন কিট কিট শব্দ হচ্ছে ওখান থেকে।
এসময় রান্নাঘরের সিংকের ওপাশের প্রথম জানালাটার কার্নিশটা দেখার জন্য, উপুড় হয়ে কাঁচরে ওপাশে চোখ ফেলতেই দেখি, গায়ের পালক ফুলিয়ে, নিজ নিজ ডানার ভেতরে মাথা গুঁজে, অনেকটা বলের মতো হয়ে, কার্নিশের একদম কোনায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছেন এক ঘু ঘু দম্পতি। আহা রে! খুলে দেব নাকি জানালা? ঢুকুক ঘরে বেচারারা।
নাহ, তা করা যাবে না। ঐ রকম খাতির তো হয় নাই। জানালা খুললে বরং এই দুর্যোগেও ভয় পেয়ে উড়তে বাধ্য হবে। অন্যদিকে হুড়মুড় ঢুকবে ধূলা বালি ময়লা ভেতরে। ভাবতে ভাবতে শরীর বাঁকিয়ে অন্য জানালাটির কার্নিশে চোখ ফেলতেই দেখি, ছোট ছোট বল হয়ে ওখানে বসে আছে বেশ ক’টা চড়ুই!
না থাক। আছে ওরা যেভাবে, ওভাবেই। আমার জন্য এটি প্রথম মরুঝড় শামাল দর্শন হলেও, এ বিষয়ে এরা ঢের ঢের অভিজ্ঞ। প্রকৃতির সকল সন্তানই, যার যার তার তার মতো শিখে নেয় নিজ নিজ পরিবেশের নানান দুর্যোগে টিকে থাকার উপায়।
আচ্ছা, দুপুরের খাওয়ারও তো সময় হয়ে গেছে। ভাত চড়িয়ে দেই না কেন? তরকারি তো আছেই। ওহ গতকাল রাতে যে ইলিশ মাছ আর আইড় মাছ এনেছিলাম বাথার দেশী দোকান থেকে, ওগুলো তো ওভাবেই ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম ডিপফ্রিজে। গত সন্ধ্যায় মিষ্টির প্যাকেট ফ্রিজে ঢোকানতেই তো ব্যস্ত ছিলাম। এখন ওগুলোও গোছগাছ করা দরকার।
হুম। তার আগে ধরাচূড়া মুক্ত হওয়া তো দরকার। আহহা, স্যুটের দুটো হাতাই তো দেখছি ভিজেছে!
হালকা বেগুনি রঙ্গয়ের টাইয়েও পড়েছে পানি, কয়েক ফোঁটা। শামালের ধুলায় ধূসরিত টাইয়ে পানি পড়ায়, সাধের এই টাইটার তিন জায়গায় তৈরি হয়েছে এবড়ো থেবড়ো গড়নের তিনটা দ্বীপ মানচিত্র! হায় রে, কি যে করলাম!
হ্যাঁ এখানকার তরিকা মোতাবেক এই গরমেও তো যাই অফিসে, স্যূটকোট শোভিত হয়ে গলায় টাই ঝুলিয়ে। গলার ফাঁস ঢিলা করতে করতে দ্রুত বেডরুমে এসে ধরাচূড়া মুক্ত হয়ে, সন্তর্পণে টাই টা ঝুলিয়ে রাখলাম। কাপড় বদলে এরপর রান্নাঘরে ফিরে রাইস কুকারে ভাত চড়িয়ে, ডিপ ফ্রিজ থেকে দোকান থেকে কেটে আনা মাছের প্যাকেটগুলো বের করে রাখলাম সিংকে। ছেড়ে দিলাম কল ।গলুক আগে ওগুলোর জমাট বরফ। তারপর ছোট ছোট প্যাকেটে ভাগ করে ফের ঢোকাবো ফ্রিজে ওগুলো। তবে আইড় মাছ কিছুটা রান্না করবো আজই। অনেকদিন পর আইড় পেয়েছি তো, খেতে ইচ্ছে করছে। যদিও সকালে গোসল করেছি, কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে যেটুকু সময়ই পেয়েছি দূর থেকে ছুটে আসা শামালের অগ্রবর্তী হাওয়ার ছোঁয়া, টের পাচ্ছি গা কুট কূট করছে তাতে। নাহ, ফের গোসল করা জরুরী। অতএব এগুলাম বাথরুমের দিকে। শাওয়রের কুসুম কুসুম গরম জলে বেশ কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে দলাই মলাই করে চমৎকার একটা গোসল সেরে, ড্রয়িংরুমে এসে সোফায় ফের গা এলিয়ে দিয়ে আরেকটি সিগারেট ধরিয়ে, করলাম ফোন এবার পাপ্পু ভাইকে।
“জি সেলিম ভাই, কেমন আছেন? বাসায়? নাকি অফিসে?”
বারোটার পর অফিস ছুটি হয়ে গেছে। ফিরেছি তাই। আপনি কোথায়?
“অফিসে আছি সেলিম ভাই। এমনিতেই এই সময়ে ডিউটি পড়ছিল আজ রিয়াদের অনেক বাইরের একটা পাওয়ার হাউজে। তার উপর এই ঝড়ের সময় পাওয়ার হাউজের সব ঠিকঠাকও তো রাখা জরুরি।”
আরে তাইতো, বুয়েটের ইলেক্ট্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাস দিয়েই বছর বিশেক আগে সৌদি আসা পাপ্পু ভাইদের মতো ইঞ্জিনিয়ারদের তো এই সময়েই কর্মক্ষেত্রে থাকা জরুরি। আমাদের দেশের মতো ইঞ্জিনিয়ারদের তো আর ম্যানেজার বা এডমিনিষ্ট্রেটর হওয়ার যো নাই, এখানে। তদুপরি উনিওতো এদের চোখে, আমারই মতো মিসকিন। শেষবার পাপ্পু ভাইয়ের বাসায় ডিনার করার সময় ওনার স্ত্রী, দুই বালিকা কন্যার মাতা, ভাবীকে দেখে মনে হয়েছিল ফের সন্তানসম্ভবা উনি। আর এ দুর্যোগে কী না পাপ্পু ভাই আছে রিয়াদের বাইরে? বলেন কী? ভাবি আর বাচ্চাদের কী খবর?
“ওরা সবাই ভাল আছে। একটু আগেই কথা হইল। সকালে টিভিতে আবহাওয়ার খবর দেখে, বাচ্চাদের পাঠাই নাই স্কুলে। বুঝলেন অভ্যাস ভাই হইয়া গেছে। অনেক বছর হইল তো, আছি।”
প্রায় বলেই ফেলেছিলাম, ঠিক আছে পাপ্পু ভাই, যে কোন সমস্যায় ভাবীকে বলবেন ফোন করতে আমাকে। ভাবীর কাছে কি আমার ফোন নম্বর আছে? সাথে সাথে ফিরল সম্বিৎ! আরে আছি তো ঢাকায় না, রিয়াদে! এই মরুতে আমি আবার হইলাম কবে, কোন কুতুব! “ওহ সেলিম ভাই, এই প্রথমই তো মনে হয় আপনি শামালের পাল্লায় পড়ছেন। তাই না? আরে আমারই তো খবর নেয়া দরকার ছিল আগে।” বলেই জিয়ার মতোই জানালেন পাপ্পু ভাই, শামালের সময় নিজেকে সামলানোর মন্ত্র জানালের গড়গড় করে।
লেখক : প্রাবন্ধিক, ভ্রমণ সাহিত্যিক।











