দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ৮ জুলাই, ২০২৬ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

সিডনির বোটানি বে’তে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করার পর ছোটভাই রুবেল আমাদেরকে আবারো গাড়িতে তুললো। তার আফসোস আমরা সময় বেশি নিয়ে আসিনি। অস্ট্রেলিয়ায় আসার এতোদিন পর গিয়ে তাকে সময় দিয়েছি। তাও একেবারে শেষসময়ে। রুবেল বললো, কত কিছুই আপনাদের দেখানো হয়নি। কত কিছু যে এখানে দেখার আছে! রুবেলের আফসোসের সাথে সাথে আমারো আফসোস হচ্ছিলো। তিন বছরের ভিসা আছে, কেন যে ফেরার টিকেটটা এতো তাড়াহুড়ো করে করলাম! অন্তত একমাস থাকতে পারলে আরো অনেককিছুই দেখার সুযোগ হতো!

রুবেল একা থাকে,তার পুরো বাড়ি খালি। যে কোন একটি রুমে অনায়াসে থেকে তার একটি গাড়ি নিয়ে রাতে দিনে চরকির মতো ঘুরতে পারতাম! অথচ। রুবেলের গাড়ি চলছিল। ঘড়ির কাঁটা রাত দশটা পার হয়ে গেছে। পরেরদিন অস্ট্রেলিয়ায় কিসের যেনো একটি সাধারণ ছুটি। তাই আজ রাতটি অনেকটা উইক অ্যান্ডের রাতের মতো হয়ে গেছে বলে জানালো রুবেল।

অফিসপাড়া ফাঁকা হয়ে গেছে, কিন্তু সিডনির প্রাণকেন্দ্র যেন আলসেমি ঝেড়ে তখনই জেগে উঠছে। শীতের রাত হলেও বাতাসে তেমন তীব্রতা নেই। রাস্তায় গায়ে একটি জ্যাকেট জড়িয়ে হাঁটছে বহু মানুষ। আমি এবং বিজয় দার গায়েও একই ধরনের জ্যাকেট। রুবেল অবশ্যই ব্লেজার পড়েছে। সিডনি শহরের উঁচু কাচের ভবনগুলোর গায়ে আলো ঝিলমিল করছে, দূরে সিডনি হারবারের দিক থেকে ভেসে আসছে শীতল বাতাস।

আমরা টাউন হলের সামনে পৌঁছালাম। রুবেল গাড়ি পার্ক করে আসলো। প্রচুর মানুষ, সবাই যেনো ব্যস্ত। এদের কেউ নাকি সিনেমা দেখে ফিরছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে ডিনারে এসেছে। আবার কেউ কেউ রাতের আড্ডার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাসস্টপ, ট্রামলাইন আর ট্রেন স্টেশনের প্রবেশপথে মানুষের চলাচল এক মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই। আশ্চর্যের বিষয়, এত মানুষের উপস্থিতি সত্ত্বেও কোথাও বিশৃঙ্খলা নেই। গাড়িগুলো নির্দিষ্ট গতিতে চলছে, পথচারীরা সিগন্যাল মেনে রাস্তা পার হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পুলিশের গাড়ি ধীরগতিতে টহল দিচ্ছে, কিন্তু তাদের উপস্থিতি ভীতির নয় বরং নিরাপত্তার চাদরে যেনো পুরো এলাকাটিকে ঢেকে রেখেছে।

রুবেল আমাদেরকে একটি রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলো। এখানে মানুষ তাড়াতাড়ি ডিনার করে জানতাম, তবে দশটার পরেও আজ ডিনার সার্ভ হচ্ছে। রুবেল আমাদের তিনজনের জন্য খাবারের অর্ডার করলো। বললাম যে, রাতের বেলায় বেশি কিছু খাবো না। হালকা কিছু খেলেই হবে। কিন্তু কে শুনে কার কথা! রুবেল নিজের ইচ্ছেমতো অনেকগুলো খাবারের অর্ডার দিলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই একজন বাংলাদেশী তরুণী খাবার সার্ভ করলেন। তিনি সিডনিতে কোন এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। সপ্তাহে বিশ ঘন্টা চাকরি করেন। চাকরির আয় দিয়ে তার থাকা খাওয়া থেকে টিউশন ফি সবই হয়ে যায় বলে জানালেন। স্বদেশের তিনজন মানুষের জন্য মেয়েটির মমতা আমাকে বেশ স্পর্শ করলো।

আমাদেরকে নিয়ে রুবেল জর্জ স্ট্রিট ধরে হাঁটতে শুরু করলো। বললো, রাতের সিডনি দেখেন। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও ছোট ছোট খাবারের দোকান। ইতালীয় পাস্তা, জাপানি সুশি, কোরিয়ান বারবিকিউ, থাই কারি, লেবানিজ কাবাবসহ পৃথিবীর নানা দেশের নানা খাবারের সুবাস বাতাসে মিশে আছে। কোনো রেস্তোরাঁয় অপেক্ষমাণ অতিথিদের দীর্ঘ সারি, কোথাও আবার খোলা আকাশের নিচে বসে তরুণতরুণীরা গল্পে মগ্ন। কেউ উচ্চৈঃস্বরে হাসছেন, কেউ নীরবে কফির কাপ হাতে বসে সিডনির রাত উপভোগ করছেন। কারো কারো টেবিলে ড্রিংকসের বোতল টোতলও দেখা গেলো। এগুলো অস্ট্রেলিয়াতে অবৈধ নয়। কারো মাঝে কোন রাখঢাকও নেই। বড় ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলো বন্ধ হয়ে গেলেও অনেক ছোট দোকান, স্যুভেনির শপ, কনভেনিয়েন্স স্টোর, মদের দোকানসহ কিছু কিছু দোকানপাট খোলা। শত শত পর্যটক ঘুরছে, সবার হাতে নানা ব্র্যান্ডের কেনাকাটার ব্যাগ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা যায় পথ শিল্পীদের। কেউ স্যাক্সোফোন বাজাচ্ছেন, কেউ গিটার হাতে পুরোনো ইংরেজি গান গাইছেন। কয়েন বা কার্ডের মাধ্যমে পথচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শিল্পীদের সম্মানী দিচ্ছেন।

১১টার পর শহরের বিনোদনকেন্দ্রগুলো আরও সরব হয়ে ওঠে। বারগুলোর দরজার সামনে ছোট ছোট লাইন। নিরাপত্তা রক্ষীরা পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে অতিথিদের প্রবেশ করতে দিচ্ছেন। ভেতর থেকে ভেসে আসছে সংগীতের তালে মানুষের উচ্ছ্বাস। কোথাও জ্যাজ, কোথাও রক, কোথাও আবার আধুনিক ইলেকট্রনিক সুর। নাইট ক্লাবগুলোর সামনে অপেক্ষমাণ তরুণদের পোশাকআশাকেও উৎসবের ছাপ। অনেকেই কাজের ক্লান্তি ভুলে এই রাতটুকু বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে এসেছেন। রুবেল বললো, কাল ছুটি না হলে এতো ভিড় দেখতেন না। অস্ট্রেলিয়ায় যারা বসবাস করেন, তাদেরকে জীবনযুদ্ধে সারাক্ষণই মশগুল থাকতে হয়। তবে আপনাদের মতো পর্যটকদের কথা আলাদা।

আমি খুব খেয়াল করে দেখলাম যে, আনন্দ আর শৃঙ্খলা এখানে পাশাপাশি চলে। কোথাও উচ্চৈঃস্বরে ঝগড়া নেই, অযথা হর্ন নেই, মাতলামির প্রকাশ্য প্রদর্শন নেই। রাস্তার পাশে অনেকেই শুয়ে আছেন। ছেলে মেয়ের ভেদাভেদ নেই। রুবেল বললো, এরা বেশি খেয়ে ফেলেছে। অবশ্য, কেউ অতিরিক্ত মদ্যপান করলে নিরাপত্তাকর্মীরাই তাদেরকে দ্রুত সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করেন। ফলে, কোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি দৃশ্যমান হলেও তা কখনো বিরক্তিকর মনে হয় না। রুবেল আমাদেরকে নতুন একটি জায়গায় নিয়ে গেলো। সার্কুলার কুয়ের দিকে গিয়ে মনে হলো, এটি সিডনির আরেকটি রূপ। পানির গায়ে আলো প্রতিফলিত হয়ে এক অপূর্ব আবহ তৈরি করেছে। দূরে আলোকিত হারবার ব্রিজ, আর তার পাশেই আলোর মায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অপেরা হাউসরাতের সিডনিকে যেন এক পোস্টকার্ডের ছবিতে পরিণত করেছে। জেটির পাশে কেউ বসে নীরবে গল্প করছেন, কেউ মোবাইল ক্যামেরায় স্মৃতি ধরে রাখছেন। মাঝে মাঝে ফেরি এসে ভিড়ছে, আবার যাত্রী নিয়ে নিঃশব্দে ছেড়ে যাচ্ছে।

রুবেলকে বললাম, অনেক ঘোরাঘুরি হলো। এবার আমাদেরকে হোটেলে পৌঁছে দিয়ে তুমি বাসায় চলে যাও। রুবেল আরো একটু ঘুরেটুরে দেখেন বলে আমাদেরকে নিয়ে নতুন পথে গাড়ি চালাতে শুরু করলো। রাস্তা অনেকটা ফাঁকা। তবে রুবেল একেবারে ধীরলয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। যাতে আশপাশের সবকিছুর যতটুকু সম্ভব আমরা একটু দেখে নিতে পারি। রাস্তার পাশে বহু ফাস্টফুডের দোকান। ভিড় লেগে আছে। কেউ বার্গার খাচ্ছেন, কেউ গরম পিজ্জার বাক্স হাতে ফিরছেন, আবার অনেকেই কফির কাপ নিয়ে রাতের আড্ডা চালিয়ে যাচ্ছেন। ট্যাক্সি, রাইডশেয়ার গাড়ি ও নাইট বাসের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে।

রাত ১২টা পেরিয়ে গেলেও সিডনি মনে হয় আজ ঘুমাবে না। অসংখ্য তরুণতরুণী, পর্যটক ও রাতের কর্মজীবী মানুষের আনাগোনা সমানতালে চলতে থাকে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এরই মধ্যে অনেক রাস্তায় কাজ শুরু করে দিয়েছেন। ডাস্টবিন খালি হচ্ছে, ফুটপাত পরিষ্কার করা হচ্ছে। এত মানুষের আনাগোনা সত্ত্বেও কোথাও আবর্জনার স্তূপ চোখে পড়ে না। এতো মানুষ এতো কিছু খাচ্ছে, এতো বারে এতো লোকের হল্লা, কিন্তু আশ্চর্য হলাম যে, কোথাও ময়লা নেই। রাস্তা ফুটপাত সবই যেনো এইমাত্র ঝাড় দেয়া!

ঘড়ির কাঁটা রাত ১টার কাছাকাছি। শহরের আবহ দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিলো। বড় বড় বাড়ির জানালার আলোগুলো নিভে যাচ্ছিলো। তবে বহু ভবনের আলো যেনো আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিলো। অনেকেই দেখলাম, ঘরে ফিরছে, আবার অনেকেই বার বা ক্লাবের সামনে এসে গাড়ি থেকে নামছে। বার ও নাইট ক্লাবের ভেতরে এখনও সংগীত বাজছে।

রুবেল আমাদেরকে হোটেলের সামনে পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিল। তার সাথে আর এখানে দেখা হবে না। আমাদের ফেরার সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। নিজেদের মতো করে সবকিছু গুছিয়ে আমাদেরকে ঘরে ফিরতে হবে।

আমি লায়ন বিজয় শেখর দা’কে নিয়ে হোটেলের লবিতে বসলাম। লায়ন ফজলে করিম ভাইকে ফোন দিয়ে ডিস্টার্ব করবেন কিনা জানতে চাইলেন তিনি। আমি না করলাম। বিজয় দা বললেন, একটি জিনিস কি খেয়াল করেছেন? আমি সরাসরি তাকালাম। বিজয় দা বললেন, রাতের সিডনি দেখে একটি বিষয় বুঝলাম যে, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশের অসাধারণ সমন্বয়ই কেবল একটি আধুনিক শহর এবং নগরজীবন তৈরি করতে পারে। খেয়াল করে দেখেন, সিডনির রাত মানেই শুধু উচ্ছ্বাস নয়, এখানে রাত মানে মানুষের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, পরিস্কারপরিচ্ছন্ন নগরব্যবস্থা এবং এমন এক নাগরিক জীবন, যেখানে গভীর রাতেও শহর প্রাণবন্ত থাকে কিন্তু কোনভাবেই নিয়মের সীমানা অতিক্রম করে না। বিজয় দা’ দার্শনিকের মতো আরো কি কি সব বলছিলেন। কিন্তু আমি শুধু তার শেষ কথাটিই ভাবছিলাম। আধুনিক নগরজীবন! আহা, আমাদের থেকে কতদূর! (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধগহন গভীরে
পরবর্তী নিবন্ধসুস্থ সমাজ গঠনে সত্যবাদিতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্ব