দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর | বুধবার , ১৭ জুন, ২০২৬ at ৮:২৪ পূর্বাহ্ণ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার সাথে জমকালো অনুষ্ঠানটি একসময় শেষ হলো। আমরা দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পুরো অনুষ্ঠানটি উপভোগ করলাম। আমাদের তাড়া থাকলেও অনুষ্ঠানটি এতোই মনোমুগ্ধকর ছিল যে মাঝখানে উঠে যেতে পারি নি। অনুষ্ঠানে যুদ্ধে নিহত সৈনিকের স্বজনদের যেভাবে সম্মানিত করা হলো তা আসলেই ছিল আন্তরিক, অসাধারণ।

আমরা চারজন নিচে নেমে আসলাম। ওয়ার মেমোরিয়ালের ভবনটি থেকে বের হওয়ার পথও দুর্দান্ত। পথের দুপাশের দেয়ালে দেশকে ভালোবাসার নানা বাক্য বিশাল বিশাল হরফে লিখে রাখা হয়েছে। যোদ্ধাদের প্রতি সম্মান এবং ভালোবাসার কথাও। আমি মুগ্ধ হয়ে একটির পর একটি বাক্য পড়ে পড়ে বের হচ্ছিলাম। তারেক ভাই বললেন, অস্ট্রেলিয়ানরা তাদের যোদ্ধাদের অনেক বেশি সম্মান করে। দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদেরকে বিশেষ দিনগুলোতে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। শুধু আত্মীয় স্বজনই নয়, সাধারণ মানুষও জীবন দেয়া সৈনিকদের ব্যাপারে অন্তরে ভিন্নমাত্রার শ্রদ্ধা রাখে।

ওয়ার মেমোরিয়াল থেকে বের হয়ে কয়েক কদম এগুনোর পর অপর একটি ছোট ভবন চোখে পড়লো। যাওয়ার সময়ও ভবনটি দেখেছি। তবে মূল ফোকাস ওয়ার মেমোরিয়ালে থাকায় সেটার দিকে খুব একটা নজর দিইনি। এখন বেরোনোর সময় চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। ভবনটির পাশেই বিশাল পাথরের গায়ে একটি নাম লেখা রয়েছে। পপি’স। বুঝতে পারলাম যে, এখান থেকেই কৃত্রিম পপি ফুল কিনে নিয়ে হয়তো ভিতরে লাখ লাখ ফুল শহীদদের নামের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

বিশাল সাইজের পাথরে পপি’স নামটি দেখেই আমার অন্তর হু হু করে উঠলো। ‘পপি’ আমার জীবনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম। রাতে দিনে কত শতবার যে এই নামটি ধরে ডাকাডাকি তার কোন ইয়ত্তা নেই। যৌবনের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে ডাকতে শুরু করা নামটি এই পড়ন্ত বেলায়ও আমার সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা, সবচেয়ে আপনজনের নাম। পপি আমার স্ত্রী শামীমা নার্গিসের ডাকনাম।

আমার অন্তর হু হু করে উঠার কারণ শুধু তার নামই নয়। আসলে সেও লায়নিজম করে। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে লায়ন্স কনফারেন্সে আসার জন্য আমরা দুজনই একসাথে ভিসার আবেদন করি। দুজনই ভিসা পাই। পপিকেও তিন বছরের ভিসা দেয়া হয়েছে। অথচ সরকারের জিও ( গভর্মেন্ট অর্ডার) না পাওয়ায় তার কনফারেন্সে যোগ দেয়া সম্ভব হয়নি। আমরা দুজন একসাথে অস্ট্রেলিয়ায় ঘুরবো বলে নানা স্বপ্ন দেখলেও সরকারি চাকরির কারণে তাকে রেখেই আমাকে বিমানে চড়তে হয়েছিল। এতে আমার অন্তরে কষ্ট থাকলেও কিছু করার ছিল না। এখন বিশাল পাথরে খোঁদাই করা তার নাম দেখে আমাদের হৃদয়ের ক্ষতটা যেনো তরতাজা হয়ে উঠলো। আমি পাথরটির কাছে গেলাম, নামের উপর হাত বুলালাম। মনে মনে ভাবার চেষ্টা করলাম যে, তার নামটি এতো বিশাল করে খোঁদাই করা দেখলে তার চোখজোড়া কেমন নেচে উঠতো!

আমরা পার্কিংয়ে গিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। তারেক ভাই বললেন, দেখার অনেক কিছু আছে, কিন্তু আপনাদের সময় নেই। চলেন, শহরটা একটু ঘুরিয়ে দেখাই। আমি বললাম ক্যাঙ্গারু দেখান। জীবন্ত ক্যাঙ্গারু ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন কোন জায়গায় নিয়ে যান।

অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার নাম শুনলেই অনেকের চোখে ভেসে ওঠে সংসদ ভবন, দূতাবাস আর সরকারি অফিসের ছবি। কিন্তু দিনের ব্যস্ততা শেষে সন্ধ্যার ক্যানবেরা যেন এক ভিন্ন শহর। কর্মচাঞ্চল্যের আবরণ সরিয়ে তখন শহরটি নিজেকে মেলে ধরে শান্ত, পরিচ্ছন্ন এবং সুশৃঙ্খল এক রূপে।

সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। পশ্চিম আকাশে কমলা, গোলাপি আর বেগুনি রঙের মিশেলে তৈরি হয়েছে এক অপূর্ব ক্যানভাস। আমাদের গাড়ি চলছে। তারেক ভাই ক্যাঙ্গারুর খোঁজে বেশ গাছগাছালীতে ঢাকা মাঠের মতো একটি জায়গায় নিয়ে আসলেন। আমরা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু কোন ক্যাঙ্গারু দেখা দিল না। না, একটিও না। তারেক ভাই বেশ আশ্চর্য হয়ে বললেন, বিকেলে এখানে অনেক ক্যাঙ্গারু ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু আজ একটিও না থাকার কারণ বুঝতে পারছি না।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। আমরা আর অপেক্ষা না করেই ফিরে আসার পথ ধরলাম। আবারো বার্লি লেকের পাশ দিয়ে ছুটলো আমাদের গাড়ি। দিনের তুলনায় মানুষের সংখ্যা কমে এলেও বিখ্যাত সেই লেকপাড়ে এখনও হাঁটছেন অনেকে। কেউ জগিং করছেন, কেউ সাইকেল চালাচ্ছেন, আবার কেউ বেঞ্চে বসে নীরবে সূর্যাস্ত উপভোগ করছেন।

লেকের পানি আয়নার মতো শান্ত। দূরে আলোকিত হয়ে উঠছে পার্লামেন্ট হাউস। পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটির আলো সন্ধ্যার আকাশের সঙ্গে মিশে এক অন্যরকম সৌন্দর্য তৈরি করেছে।

সন্ধ্যা নামতেই ক্যানবেরার রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। তবে যানজট বা হর্নের তীব্র শব্দ নেই। প্রশস্ত সড়কগুলোয় গাড়ি চলাচল করে নির্দিষ্ট গতিতে। প্রতিটি মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে গাড়ি থামে, আবার সবুজ বাতি জ্বলার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে যায়। কোন পুলিশ রাস্তায় দেখলাম না। না কেউ গাড়ি থামানোর সিগন্যাল দিচ্ছে, না কেউ মামলা দিচ্ছে। অথচ আইন লংঘন করে একটি গাড়িকেও যেতে দেখলাম না।

শহরটির পরিকল্পিত নকশা বিশ্বখ্যাত। পৃথিবীর সবচেয়ে গুছানো কয়েকটি শহরের মধ্যে ক্যানবেরা একটি। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি গাছ। শীতকালে নাকি অনেক গাছের পাতা ঝরে পড়ে, বসন্তে নতুন পাতায় ভরে ওঠে পুরো শহর। সন্ধ্যার আলোয় সেই গাছপালাগুলো যেন শহরকে আরও শান্ত ও মনোরম করে তোলে।

নানা পথ ঘুরে আমরা ক্যানবেরা সেন্টারে পৌঁছালাম। এটি ক্যানবেরার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র। দোকানগুলোতে উজ্জ্বল আলো, থরে থরে সাজানো নানা পণ্য। প্রচুর ব্র্যান্ডশপ দেখা গেলো। পোশাকের দোকান, বইয়ের দোকান, ইলেকট্রনিঙ শোরুম, সুপারমার্কেটসবই রয়েছে এই ক্যানবেরা সেন্টারে। সবই সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো, গোছানো। কোথাও উচ্চৈঃস্বরে ডাকা বা ক্রেতা টানার প্রতিযোগিতা নেই। কোথাও কোন হুড়োহুড়ি নেই। সবই যেনো অমোঘ নিয়মে চলছে।

সন্ধ্যায় অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর শপিং সেন্টার, রেস্তোরাঁ এবং ক্যাফেগুলো যেনো আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। ক্যানবেরা সেন্টারে প্রচুর তরুণতরুণী ঘুরছে, কেউবা পরিবার পরিজন নিয়ে শপিং করতে বা ডিনার করতে এসেছেন। পর্যটকদের আনাগোনাও বেশ চোখে পড়ছিল। পিঠে হ্যাভারশেক ঝুলিয়ে অনেকেই হাঁটছেন, ঘুরছেন, ছবি তুলছেন।

ক্যানবেরার সন্ধ্যার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ক্যাফে সংস্কৃতি। ছোট ছোট ক্যাফেগুলোতে বসে মানুষ কফি পান করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন কিংবা ল্যাপটপে কাজ করছেন।

অস্ট্রেলিয়ানদের জীবনে কফি যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

তারেক ভাই বললেন, এখানে মানুষ কফি খাবেই। তবে রাত দশটার মধ্যে শহর আরো শান্ত হয়ে যায়। রাতে কোথাও উচ্চৈঃস্বরে কিছুই হয়না। একটি গাড়ির হর্ণও কোথাও শুনবেন না। বার আছে, নাইট ক্লাব আছে। কিন্তু সর্বত্রই শব্দ নিয়ন্ত্রিত। ঘরের ভিতরের আওয়াজ বাইরে আসবে না।

আমাদেরকে সিডনি ফিরতে হবে। প্রায় তিনশ’ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। চার ঘন্টার বেশি সময় লাগবে সিডনি পৌঁছাতে। রাতের ব্যাপার। রাস্তায় আপদ বিপদের শংকাও রয়েছে। চোর ডাকাত বা ছিনতাইয়ের ঘটনা না ঘটলেও গাড়িও তো বিকল হতে পারে। যদিও রুবেলের নতুন গাড়ি, তবুও যন্ত্রের উপর কতটুকুই বা ভরসা করা যায়! ফলে আমাদের ফেরার তাড়া ছিল। তারেক ভাইকে আমাদের গাড়ি যেখানে পার্কিংয়ে আছে, সেখানে যাওয়ার অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি গোঁ ধরলেন ডিনার করানোর জন্য। বললেন, এখানে সবাই সন্ধ্যায় ডিনার করে। ডিনার টাইম হয়ে গেছে। কিছু খেয়ে তারপর রওয়ানা হয়ে যেতে পারবেন। কিন্তু ছোটভাই রুবেল কোনভাবেই রাজি হলো না। বললো, ডিনার সিডনিতে করবো। ডিনার করে গাড়ি চালাতে অসুবিধা হবে বলেও উল্লেখ করলো সে। গাড়ি চালানোর ব্যাপারটি এমন যে, তারেক ভাই আর জোর করলেন না। আমাদের গাড়ি পর্যন্ত আসলেন। আমি লায়ন বিজয় শেখর দাকে নিয়ে রুবেলের গাড়িতে চড়ে বসলাম। রুবেল জিপিএস সেট করে সিডনির পথ ধরলো। তারেক ভাই তখনো ড্রাইভিং সিটে বসে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছিলেন। (চলবে)

লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধমেঘবালিকার বর্ষাকথন
পরবর্তী নিবন্ধরবিরাগে অনুরাগে শীলা মোমেন