(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
সিডনি–ক্যানবেরা মহাসড়ক ধরে ছুটছে আমাদের গাড়ি। ছোটভাই রুবেল রাস্তার নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনেই গাড়ি চালাচ্ছে। দামি গাড়ি, নতুন। তাই আরামের কোন কমতি নেই গাড়িতে। এমন গাড়িতে দু’চারদিন চড়ার পর নিজের ভাঙ্গা গাড়িকে শত্রুর মতো লাগে! কথাটি বলতেই গাড়ির ভিতরে হাসির রোল উঠলো। রুবেল বললো, এখানে গাড়ি সস্তা, আমাদের দেশে তো ট্যাক্সের জন্য গাড়ি কেনা যায় না। চড়া ট্যাক্সের কারণেই গাড়ির দাম বেড়ে যায়।
গাড়ির ভিতরে আমরা নানা বিষয়ে গল্প করছি। রুবেল রাস্তায় চোখ রেখেই গাড়ি চালাচ্ছে। ট্রাফিক সিগন্যালগুলোতে গাড়ি না থাকলেও সে অপেক্ষা করছে। সিগন্যাল সবুজ হলেই এগিয়ে যাচ্ছে। কোন কোন পয়েন্টে কোন কিছুই নেই, রাস্তার পাশে শুধু একটি চিহ্ন। সেখানেও রুবেল হালকা ব্রেক করে দাঁড়াচ্ছে, ১৫ সেকেন্ড পর এক্সেলেটরে চাপ দিচ্ছে। বিশ্বের উন্নত–অনুন্নত অনেক দেশেই ট্রাফিক সিস্টেমের জয়জয়কার দেখেছি। রাত ৩টার সময়ও ট্রাফিক সিগন্যালে লালবাতি জ্বললে চালক গাড়ি দাঁড় করিয়ে সিগন্যাল সবুজ হওয়ার অপেক্ষা করেন। রাস্তায় কোন পুলিশ নেই, কোন গাড়ি নেই, পথচারী নেই। অথচ সিগন্যাল অমান্য করার সাহস কেউ করেন না। শুধু আমাদের দেশেই ট্রাফিক সিগন্যালের তোয়াক্কা খুব বেশি করা হয়না। গুতোগুতি করে যতটুকু আগে যাওয়া যায়। পুলিশ থাকলেও অনেক সময় পাত্তা দেয়া হয়না। রাস্তার গাড়ি চালানোর হকিকত দেখলে মনে হয়, আইন লংঘন করার ক্ষমতা যার যত বেশি, তিনি ততই ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী।
রুবেল আবারো একটি সার্ভিস স্টেশনে থামলো। আমাদের গাড়িতে রেখে সে ভিতরে গেলো। ফিরে আসলো বেশ কিছু বিস্কিট, বাদাম ও কেকজাতীয় খাবার নিয়ে। সাথে তিন মগ কফি। এতো দীর্ঘপথে টানা গাড়ি চালানো কষ্টকর। আমি তাকে কষ্ট দেয়ার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম। কিন্তু রুবেল বিনয়ের সাথে বললো যে, এসব কোন ব্যাপার না, আমার অভ্যাস আছে! অবশ্য এমন রাস্তায় গাড়ি চালানোর আরামই অন্যরকম। স্টিয়ারিং ধরে বসে থাকলেই চলে। হাইওয়ের পথ অত্যন্ত মসৃণ ও পরিকল্পিত। গাড়িগুলো নির্দিষ্ট গতিতে ছুটে চলছে, কোথাও অস্থিরতা নেই। অস্ট্রেলিয়ার সড়ক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই, ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি চালালেও ক্লান্তি আসেনা। রাস্তার পাশে ইলেকট্রনিক সাইনবোর্ডে আবহাওয়া, গতিসীমা এবং সতর্কবার্তা ভেসে উঠছিল নিয়মিত। বিশেষ করে ক্যাঙ্গারুর সতর্কতা চিহ্নগুলো চোখে পড়ার মতো। সন্ধ্যার পর এসব এলাকায় নাকি বন্যপ্রাণী রাস্তার পাশে চলে আসে। তখন চালকদের বাড়তি সতর্কতায় পথ চলতে হয়। এক্সিডেন্ট করে বন্যপ্রাণী মারলেও শাস্তির বিধান রয়েছে বলে জানালো রুবেল।
ক্যানবেরার দিকে ছুটছে আমাদের গাড়ি। প্রতিনিয়ত যেনো দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছিলো। রাস্তার ব্যস্ততা অনেকটা কমে গেছে। দুপাশেই বিস্তীর্ণ সবুজ প্রান্তর, ঢেউ খেলানো পাহাড় আর খামারঘেরা জনপদ দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম আমরা। পথিমধ্যে একটি কেঙ্গারু মরে পড়ে আছে। হয়তো কিছুক্ষণ আগেই কোন গাড়ি চাপা দিয়েছে! রুবেল বেশ দুঃখ পেলো। বললো, জন্তগুলো বিভিন্ন সময় হুটহাট রাস্তায় চলে আসে। বিশেষ করে বিকেলে এবং রাতে। ওগুলো এমনভাবে এসে পড়ে যে তখন আর চালকের কিছু করারই থাকে না।
মাঝে মাঝে রাস্তার পাশেই ক্যাফে, দোকানপাট। পর্যটকদের বেশ ভিড়ও দেখা গেলো। কেউ কেউ কফির মগ হাতে ছবি তুলছে, পেছনে পাহাড়ের সারি এবং খোলা মাঠ নিয়ে তোলা ছবিগুলো নিশ্চয় সুন্দর হবে।
যাত্রাপথে গুলবার্ন অঞ্চলের কাছাকাছি পৌঁছালে আবহাওয়ার পরিবর্তনও টের পাওয়া যাচ্ছিলো। সিডনির তুলনায় বাতাসে একটু শুষ্কতা, একটু ঠান্ডা অনুভূতি। দূরের পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো। রাস্তার ধারে ছোট ছোট সার্ভিস স্টেশন, ক্যাফে আর মোটেল ভ্রমণকারীদের জন্য বাড়তি স্বস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছে। অনেকেই এখানে থেমে বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ান মিট পাই কিংবা গরম কফি উপভোগ করেন। সিডনি ক্যানবেরা মহাসড়কের যে বিষয়টি আমার নজর কেড়েছে তা হচ্ছে রাস্তাটির নীরবতা ও পরিচ্ছন্নতা। রাস্তায় গাড়ির কোন হর্ণ নেই, অবশ্য পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই রাস্তায় গাড়িতে হর্ণ বাজানো হয়না। তবে এখানে একটু বেশি নীরব মনে হচ্ছিলো। এতো ব্যস্ত একটি মহাসড়ক, তবে রাস্তার ধারে কোন অবৈধ পার্কিং নেই, বিশৃঙ্খল যানজট নেই। মাঝে মাঝে ট্রাক দেখা যাচ্ছিলো, বড় বড় ট্রাকগুলো পণ্য নিয়ে এক শহর থেকে অন্য শহরে যাচ্ছে। এক একটি ট্রাকের সাইজ আমাদের কয়েকটির সমান বলে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু ট্রাকচালকদের মাঝেও কোন ধরনের বিশৃংখলা নেই। এক ট্রাক অপর ট্রাককে ওভারটেক করার প্রতিযোগিতায় নেই। নিজের লেইন ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে অন্য গাড়ি। ছোট প্রাইভেট গাড়িগুলোকে প্লাস্টিক বলেও কেউ ওস্তাদকে সতর্ক করছেন না। অবশ্য এখানে ট্রাকগুলোতে চালকই সব, হেলপার বলে কিছু নেই।
গাড়ির কাচ নামিয়ে ঠান্ডা এবং শুষ্ক বাতাসের ছোঁয়া নিলাম। দূরের নীল আকাশ চারদিকে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছিল। দীর্ঘ এই ভ্রমনে যেনো প্রকৃতির সাথেই সময় অতিবাহিত করছিলাম। কী যে সুন্দর সময়! কী যে আনন্দময় ভ্রমন। অস্ট্রেলিয়ার গ্রামীণ জীবনের বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু চিত্র দেখারও অভিজ্ঞতা হলো। লায়ন বিজয় শেখর দা মুগ্ধ হয়ে একেকটি বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন। ক্যানবেরার দিকে যত এগুচ্ছি ততই তিনি চারপাশের যে দৃশ্যপট পাল্টে যাচ্ছে সেটি আমাকে দেখাচ্ছিলেন।
আমার মুগ্ধতা তখন সীমা ছাড়িয়েছে। যা দেখছি সবই ভালো লাগছে। আকাশ মুগ্ধ করছিলো, নির্মল বাতাস মুগ্ধ করছিলো, দূরের সবুজ পাহাড়ের হাতছানি মুগ্ধ করছিলো, মুগ্ধ করছিলো চারপাশের সবকিছু। রাস্তার সৌন্দর্য ক্রমেই বদলে যাচ্ছিলো। রাস্তার পাশে ঢেউখেলানো পাহাড়, ঝোপঝাড় ও ছোট বনভূমির সংখ্যাও ক্রমগাত বাড়ছিলো।
আমি খেয়াল করলাম যে, আমাদের রাজধানী অঞ্চলে মানুষ গিজগিজ করে, গাড়ি হুড়োহুড়ি করে। অথচ অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী অঞ্চলে ঢোকার আগে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা মনে হলো ক্রমে কমে যাচ্ছিলো। চারপাশের পরিবেশে কেমন একটা শান্ত ভাব, একেবারে রাজধানীর বিপরীতমুখী আবহ। প্রশস্ত মহাসড়ক ধরে এগুচ্ছি আমরা। ধীরে ধীরে সাজানো গোছানো নগর পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো। শহরে ঢোকার আগেই চোখে পড়ে বিশাল সব ইউক্যালিপটাস বন আর পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। দেশের নীতিনির্ধারক শহর হিসেবে ক্যানবেরার আলাদা একটা গাম্ভীর্য আছে বলেও মনে হচ্ছিলো। সিডনির প্রাণচাঞ্চল্যের পর ক্যানবেরার শান্ত, সুবিন্যস্ত পরিবেশ যেন একেবারে অন্যরকম।
শহরের প্রবেশমুখে পৌঁছে মনে হলো যেন শিল্পীর আঁকা কোন একটি ক্যানভাস ধরে এগুচ্ছি। চারদিকে নিখুঁত পরিকল্পনার ছাপ। প্রশস্ত রাস্তা, গোলচত্বর, গাছপালায় ঘেরা অ্যাভিনিউ, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক আর সবুজে ঘেরা পরিবেশ ক্যানবেরাকে অন্যরকম লাগছিলো। দূর থেকে অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্ট হাউসের আধুনিক অবয়ব দেখা যাচ্ছিলো, আর লেক বার্লি গ্রিফিনের নীল জল শহরের সৌন্দর্যে নান্দনিকতায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে বলেও মনে হচ্ছিলো।
আমার বন্ধু তারেক ভাই দফায় দফায় ফোন করে খবর নিচ্ছিলেন। শহরে পৌঁছে গেছি বলার পর তিনি একটি লোকেশন মোবাইলে পাঠিয়ে দিলেন। রুবেলকে লোকেশনটি দেয়ার পর জিপিএস ধরে আমরা বড়সড় একটি ভবনের সামনে পৌঁছালাম।
তারেক ভাইকে পৌঁছে গেছি বলার পর কোত্থেকে যেনো তিনি উড়ে এলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন অনেকক্ষণ। কতদিন পর দেখা, কতদিন পর!! তিনি হাতে করে একটি প্যাকেট নিয়ে এসেছেন। বেশ নামকরা একটি ব্র্যান্ডের শার্ট। আমার হাতে প্যাকেটটি তুলে দিয়ে বললেন, আগে জানলে তো দাদার জন্যও একটি গিফট নিতে পারতাম। বিজয় দা বেশ আন্তরিকভাবে তারেক ভাইকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কোন দরকার নেই দাদা, দেখা হয়েছে, ক্যানবেরা দেখাবেন এটিই বড় গিফট। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।













