(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আমরা দু’জন সিডনির হোটেল থেকে বের হলাম। বিশেষ কোন কাজ নেই, কোন লক্ষ্যও নেই। শুধু রাতের সিডনি দেখা এবং হাওয়া খেয়ে বেড়ানোর জন্য এই যাত্রা। আমাদের কোন গাড়ি নেই, কোন বন্ধুবান্ধবও নেই। পায়ের উপর ভরসা করেই পথে নামলাম। কিন্তু হোটেল ছেড়ে কিছুটা সামনে এগুতেই আমাদের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। এত্তো নারী পুরুষ! সবাই তরুণ–তরুণী। কেউ দল বেঁধে ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে, কেউবা উল্টো পথে যাচ্ছে। বিশাল চওড়া রাস্তাটির দু’পাশের ফুটপাতেই দলে দলে তরুণ তরুণী। কেউ কেউ ফুটপাতে বসেও উচ্ছ্বাস করছে! রাস্তা দিয়ে ছুটছে অসংখ্য গাড়ি। কোন কোন গাড়ির কাচ নামানো, ভিতরে হুল্লোড়!
হঠাৎই আমরা খেয়াল করলাম যে, আরে আজতো উইকঅ্যান্ড। ওরা তো ছুটিতে মজেছে! পুরো সপ্তাহের আয় তো এরা আজ এবং কাল উড়িয়ে দেবে! বুঝতে পারলাম যে, রাস্তায় রাস্তায় ডলারের ওড়াউড়ি চলছে! বারে বারে ঝড় চলছে গ্লাসে। এমন বেপরোয়া সময়ে হুল্লুড় তো হবেই।
লায়ন বিজয় শেখর দাশকে সাথে নিয়ে হাঁটছি। বিজয় দা’ চারদিকের অবস্থা দেখে কিছুটা দিশেহারা বলে মনে হলো। আমি নিজেও। আমরা হাঁটছি বরযাত্রী টাইপে, আমাদের পাশ দিয়ে উচ্ছ্বাসে ভাসতে ভাসতে চলে যাচ্ছে অগুনতি নারী পুরুষ। কারো গায়ে কাপড় আছে, কারোবা বেহাল। বুঝতে পারছিলাম যে, সিডনির বারগুলোতে গ্লাসে গ্লাসে ঝড় শুরু হয়েছে!
ফুটপাতের বেঞ্চে বসে আছে কেউ কেউ। তাদের কেউ কেউ গলা ছেড়ে গান করছে, কেউবা সঙ্গির হাতটি হাতে নিয়ে অপার মুগ্ধতায় গল্প শুনাচ্ছে। ফুটপাতের গাছে হেলান দিয়েও বসে আছে তরুন–তরুনী। তাদের কারো কারো উচ্ছ্বাস এতো বাঁধভাঙ্গা যে তাকানো যাচ্ছে না। অথচ তাদের দিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই, তাদেরও। নিজেদের মতো করে সময়কে উপভোগ করছে তারা।
আমরা হাঁটছি। নিরাপদ শহর। ছুরি নিয়ে কেউ ঝোপের ভিতর থেকে বের হবে না, কেউ কেড়ে নেবে না মানিব্যাগ–মোবাইল। আমরা গুগল ম্যাপ ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। বিজয় দাকে বললাম, চলেন, ডার্লিং হারবারের দিকে যাই। সেখানে মনে হয় আরো বেশি লোকজনের দেখা পাবো। বিজয় দা সায় দিলেন। বললেন, যেখানে খুশী যান, শুধু ঠিকঠাকভাবে ফেরার পথটি মনে রাখিয়েন। হাসলাম, গুগল ম্যাপ থাকলে ফেরার আর সমস্যা কি! বেশি সমস্যা হলে উবার কল করলে হবে। হোটেলের বিজনেস কার্ডতো পকেটেই রয়েছে। সুতরাং রাতের সৌন্দর্য নষ্ট করিয়েন না।
হাঁটতে হাঁটতে যখন ডার্লিং হারবারের দিকে যাই, তখন মনে হয় পুরো সিডনি বুঝি উৎসবে মেতেছে। রাস্তার পাশে শিল্পীরা গান গাইছে, কেউ বেহালা বাজাচ্ছে, আবার কেউ আগুন নিয়ে খেলা দেখাচ্ছে। কী আজব কারবার! কত দেশের কত জাতের মানুষ! কারো ভাষা হয়তো কেউ বুঝে না। কী গান গাচ্ছে তাও বুঝতে পারছি না। বেহালার সুরও অচেনা। কিন্তু উচ্ছ্বাস যেনো চির পরিচিত, সার্বজনীন! মনে হচ্ছিলো সিডনির রাস্তা বুঝি এক বৈশ্বিক মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। তাবত দুনিয়ার মানুষ যেনো এই মিলনমেলায় যোগ দিয়েছে। হাসি, গল্প আর আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠেছে চারদিক, যেখানে ভাষা কোন সমস্যা নয়, সংস্কৃতি কোন বাঁধা নয়। সবাই প্রাণের উচ্ছ্বাসে মেতে সময়টাকে নিজেদের মতো করে পার করছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে লোকজন বাড়তে থাকে। পুরো এলাকা মনে হচ্ছে লোকে লোকারণ্য। তবে সবাই দলে দলে বিভক্ত। কেউ গোল হয়ে বসে খোশগল্প করছে, কেউবা বিয়ারের ক্যান খুলছে। পুরানো ইটের রাস্তা, দুইপাশে অসংখ্য বার ও পাব। পাবের ভিতরেও প্রচুর মানুষ। কাচের ভিতর দিয়ে সুখী সুখী মুখগুলো দেখা যাচ্ছিলো। বারগুলো থেকে আলোর ঝলকানি এবং সুরের ছন্দ রাস্তায় এসে আছড়ে আছড়ে পড়ছে। অদূরে সাগর, কেউ কেউ যেনো সাগরের দিকে তাকিয়ে উদাসী সময় পার করছে!
আলোকোজ্জ্বল সিডনি হারবার ব্রিজ দেখা যাচ্ছিলো। কী দুর্দান্ত এক স্থাপনা, কী অনন্য রূপ! দিনের চেয়ে রাতের আলো ঝলমল হারবার ব্রিজ বেশি মুগ্ধ করছিলো। হারবার ব্রিজ, অপেরা হাউস, বিস্তৃত জলরাশি–সবই যেনো একই সুরে কোন এক ছন্দ তৈরি করছে।
অপেরা হাউজের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। দিনের বেলা এখানে ঘুরে গেছি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রাতের অপেরা হাউজই যেনো আসল। ডেনমার্কের স্থপতি ইয়র্ন উটজন মনে হয় রাতের দৃশ্যকে কল্পনায় রেখে এই স্থাপত্যের ডিজাইন করেছিলেন। সূর্য ডোবার পরই সাদা পাথরের স্থাপনাটি তার আসল রূপ মেলে ধরে। কী মোহময়! দিনের অপেরা হাউজ দেখে চলে গেলে অনন্য এই স্থাপত্যের আসল রূপই মিস হয়ে যেতো।
নরওয়ের অসলো অপেরা হাউজ দেখার সুযোগ হয়েছিল বছর কয়েক আগে। দুইবার নরওয়ে সফরকালে আমি দুইবারই ওই স্থাপত্যটি দেখতে গিয়েছিলাম। আজ সিডনি অপেরার সামনে দাঁড়িয়ে খুব মনে পড়ছিলো অসলো অপেরা হাউজকে। দুইটি যদিও ভিন্ন ডিজাইনের। সিডনি অপেরা হাউজের ছাদ পাল আকৃতির, আর অসলো অপেরা হাউজের ছাদ বরফখন্ডের মতো ঢালু। দুইটিই পানিকে ক্যানভাসে রেখে তৈরি করা হয়েছে। দুইটি অপেরা হাউজের মধ্যে ডিজাইনে কোন মিল না থাকলেও দুইটিই আইকনিক স্থাপত্য এবং দুইটিই দেশ দুটির সিম্বলে পরিণত হয়েছে। সিডনি অপেরার সামনে দাঁড়িয়ে অসলো অপেরার ছবিও যেনো আমি একই ক্যানভাসে দেখতে পাচ্ছিলাম।
লায়ন বিজয় দা আমার সাথে একমত হলেন যে, ভাগ্যিস আমরা রাতে বের হয়েছিলাম। নাহয় এমন অপরূপ মুগ্ধতা থেকে বঞ্চিত হতাম। লায়ন ফজলে করিম ভাই এবং ডালিয়া ভাবীকে খুব মিস করতে লাগলাম আমরা। আহারে, সবাইকে সাথে নিয়ে যদি এই অপরূপ রূপ দেখতে পেতাম!
আমরা দাঁড়িয়ে আছি সিডনি হারবারের তীরে। চারপাশে মানুষের ভিড়, হুল্লোড়। কিন্তু অস্বস্তি লাগছিল না। চারদিকে যেনো বিরাজ করছিল অদ্ভুত এক শান্তি। দূরে সাগরের ঢেউয়ের মৃদু শব্দ, আর সামনে অপেরা হাউস। অপেরা হাউজের সাদা পালগুলো ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে। কখনো নীল, কখনো সোনালি, আবার কখনো রঙিন আলোর নকশায় সেজে উঠছে পুরো ভবন। মনে হচ্ছিল, কোনো শিল্পী নীল আকাশকে ক্যানভাস বানিয়ে সেখানে একের পর এক ছবি আঁকছেন!
উইকঅ্যান্ডের রাত বলেই হয়তো জায়গাটা এতো বেশি প্রাণবন্ত, এতো মানুষ চারদিকে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ বসে গল্প করছে, কেউ আবার চুপচাপ তাকিয়ে আছে পৃথিবীর অন্যতম সেরা এই স্থাপত্যের দিকে। সবার চোখেই মুগ্ধতা, সবার চোখেই বিস্ময়। অপেরা হাউজের সামনে এবং আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রতিটি মানুষেরই মনে যেনো একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে, কিভাবে, কি করে সম্ভব এই অনন্য আয়োজন!
কফি খেতে ইচ্ছে করছিলো। বিজয় দাকে নিয়ে একটি ক্যাফেতে গিয়ে লাইন ধরে কফি নিলাম। এতো রাতেও ক্যাফে এতো ভীড় যে, কফির জন্যও বেশ দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। কফির মগটি হাতে নিয়ে আমরা হাঁটতে হাঁটতে এদিক–ওদিক ঘুরতে লাগলাম। রাতের সিডনির অপেরা এবং হারবার ব্রিজের সৌন্দর্যে কফির স্বাদও যেনো বেড়ে গেলো। আমরা চুমুকে চুমুকে সেই স্বাদ উপভোগ করতে করতে পথ চলছিলাম।
রাত বাড়ছিলো, কিন্তু আমাদের ফিরতে ইচ্ছে করছিল না। চারদিকের এতো জম্পেস আয়োজন ফেলে রেখে রুমে বন্দি হতে কারই বা ইচ্ছে করে! কিন্তু ইচ্ছের বাইরেও অনেক কিছু করতে হয়, আমাদেরকেও ফিরতে হবে। পথঘাট চিনি না, চেনাজানা একজন মানুষও নেই। রাতের বেলায় সিডনি শহরে হারিয়ে গেলে ঘুমের বারোটা বাজবে। দিনেও প্রচুর হেঁটেছি, এসেছিও হেঁটে। এখন আর হাঁটতে ইচ্ছে করছিলো না। বিজয় দা পরামর্শ দিলেন, উবার কল করলে ভালো হবে। আমি সায় দিলাম। মোবাইল অ্যাপসে গিয়ে উবার কল করলাম। দশ মিনিট পরে গাড়ি পাবো দেখাচ্ছে। উইকঅ্যান্ডের রাত, তাই রাস্তায় যাত্রী বেশি, গাড়ির সংখ্যা কম। তাই কিছুটা অপেক্ষা করেই গাড়ি পেলাম।
গাড়িতে বসে খেয়াল করলাম যে, ওমা, এতো নারী ড্রাইভার, সাদা চামড়ার তরুণী। এতো রাতে একা একা উবার চালাচ্ছে! কিছুটা চমকে গেলাম। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো যে, এটা সিডনি, নিরাপত্তার ব্যাপারে এখানে রাত আর দিনের পার্থক্য খুব বেশি রাখা হয়নি। নারীকে মানুষ হিসেবেই বিবেচনা করার শিক্ষা এই জাতি ছোটবেলায় পেয়ে থাকে। তাই এখানে কে নারী আর কে পুরুষ তাতে খুব বেশি কিছু হেরফের হয়না। ক্রাইম সিডনিতেও আছে, পুরো অস্ট্রেলিয়ায় আছে, তবে তার মাত্রা এতো কম যে, মাঝরাতে একা একা অপরিচিত প্যাসেঞ্জারদের ঘরে পৌঁছাতে একজন তরুণীকে দুইবার ভাবতে হয়না। (চলবে)
লেখকঃ চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।













