দুই ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা সেকান্দার

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি | শনিবার , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ at ৫:৪৫ পূর্বাহ্ণ

দুপুরে দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ভাত খেয়েছিলেন বৃদ্ধ সেকান্দার আলী। কে জানত, সেটিই হবে তাদের একসঙ্গে শেষ খাওয়া। পরদিন সাগর উপকূলের শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে প্রাণ গেল তার দুই ছেলে মো. মনসুর ও মো. নাসিরের। একসঙ্গে দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় সেকান্দার। বাবাকে হারিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে তার তিন নাতনি।

গতকাল শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সাগর উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস রিসাইক্লিং শিপইয়ার্ডে এলএনজি নামের একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংক থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ৯ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন ১০ জনের বেশি। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সেকান্দার আলীর দুই ছেলে মনসুর ও নাসিরও রয়েছেন। দুই ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে দিশেহারা হয়ে পড়েন সেকান্দার আলী। অনর্গল কাঁদছিলেন তিনি। তার বারবার মনে হচ্ছিল, এখন কীভাবে চলবে সামনের দিনগুলো। কে দাঁড়াবে পরিবারের পাশে? কী হবে তার নাতনিদের? দুই ছেলের মরদেহ রাখা হয়েছে মর্গে। শোকে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেকান্দার। তার পাশে কাঁদছিলেন নাতনিরাও। নিহত নাসিরের এক মেয়ে এবং মনসুরের দুই মেয়ে আপন মনে কাঁদছিলেন। বাবাকে হারিয়ে তাদের চোখেমুখে এখন অনিশ্চয়তা।

কাঁদতে কাঁদতে সেকান্দার আলী বলেন, ১৭ বছর ধরে আমার দুই ছেলে ওই শিপইয়ার্ডে কাজ করে আসছে। কিন্তু কোনো সময় কোনো বিপদের মুখে পড়েনি। এখন আমাকে একসঙ্গে দুই ছেলেকে হারাতে হলো। আর কোনো দিন আমার সন্তানরা বাবা বলে ডাকবে না। বাবা, ভাত খেতে আসো তাড়াতাড়িএ কথাও কেউ বলবে না।

তিনি বলেন, এখন আমার নাতনিদের কে দেখবে, তাদের কী হবে, সেই ভাবনাই অস্থির করছে। ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে আমাকে ছেলেদের জীবনের জন্য হারাতে হয়েছে। এ ঘটনার পর আহত ছেলেরা যদি সময়মতো চিকিৎসাসেবা পেত, তাহলে হয়তো তাদের প্রাণ দিতে হতো না।

নিহত মনসুরের বড় মেয়ে রুপা আক্তার বলেন, শুক্রবার বন্ধের দিন। কিন্তু বাবাকে তারা জোর করেই ইয়ার্ডে নিয়ে যায়। সকালে দুর্ঘটনার পর প্রায় দুই ঘণ্টা আহতদের ইয়ার্ডের ভেতরে গেট বন্ধ করে রাখা হয়। সে সময়ে দ্রুত চিকিৎসা পেলে বাবা হয়তো বেঁচে যেতেন। আমার তাই মনে হচ্ছে। রুপা বলেন, এখন আমাদের কে দেখবেন? কী হবে আমাদের? কী করে চলব বাকি জীবন? এমন শত শত প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের কোনো ভাই নেই। আমরা তিন বোন। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন বাবা।

এদিকে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। এলাকাবাসী বলেন, নাসির ও মনসুর দুই ভাইই এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবাই তাদের ভালোবাসতেন। তারা হাসিখুশি থাকতেন। দুই ভাইয়ের মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।

শিপইয়ার্ডের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ও আহতদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। নিহতদের পরিবারকে সরকারি বিধি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধলোহাগাড়ায় কৃষকের মাঝে বিতরণের বীজ ধান মাদরাসার তালাবদ্ধ কক্ষে
পরবর্তী নিবন্ধতদন্ত প্রতিবেদন দেখে পরবর্তী আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা