ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের আটক না করার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কড়া বার্তার পরও ধরপাকড় অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। গতকাল রোববার আটক হয়েছে শতাধিক বিক্ষোভকারী। ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। সেই আন্দোলন ঠেকাতে শনিবার দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল পুলিশ। আটক করা হয়েছিল প্রায় সাত হাজার মানুষকে। এই পরিস্থিতিতে পুলিশি পদক্ষেপের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে আদালতে। আদালতে একাধিক আবেদন জমা পড়েছিল। তাতে অভিযোগ করা হয়, বিক্ষোভের আগে ও পরে বহু মানুষকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে সিইসির পদত্যাগ দাবিতে গত দুদিন ধরে ব্যাপক বিক্ষোভের মধ্যে জননিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগরিকদের সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দিল্লির বেশ কয়েকটি এলাকায় ১৩৩ ধারা জারি করেছে পুলিশ। এর অধীনে দিল্লিতে অনুমতিহীন সমাবেশ ও প্রতিবাদ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে আটক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ তিন শীর্ষ নেতাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিয়েছে দিল্লির একটি আদালত। এক বছর শান্তি বজায় রাখার শর্তে তারা মুক্তি পান। তবে দীপকে বলেছেন, কোনো মুচলেকায় সই করিনি, আবার আন্দোলনে নামব। এদিকে উত্তাল পরিস্থিতির মাঝে প্রথমে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানানোর পর এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আজ সাক্ষাৎ করতে চলেছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। তবে রাহুল–খাড়গেদের সাক্ষাৎ দেবেন না প্রধান বিচারপতি। তাদের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যাতায়াতে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ রাখা হয়েছিল। শুক্রবার মেট্রো পরিষেবা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি বলেও অভিযোগ ওঠে। এরপরই কড়া বার্তা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, শান্তিপূর্ণ এবং নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের আইন মানা ছাড়া অন্য কোনওভাবে আটক করা যাবে না। একইসঙ্গে দিল্লিতে মেট্রো ও রেল পরিষেবা স্বাভাবিক রাখা, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ না করা এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের উপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্ট ও অন্য আদালতের আশপাশে জারি করা নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তি সরিয়ে ফেলার নির্দেশও দেয় বিচারপতির বেঞ্চ। শীর্ষ আদালত জানায়, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে নাগরিকদের। তবে সেই অধিকার আইন মেনেই প্রয়োগ করতে হবে। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশ ও জমায়েতের স্বাধীনতা রয়েছে। কিন্তু জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে যুক্তিসঙ্গত বিধিনিষেধও জারি করা যায়। আদালতের বক্তব্য, বিধিনিষেধ জারি করা আর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা চাপানো এক বিষয় নয়। যারা শান্তিপূর্ণভাবে অস্ত্র ছাড়া জমায়েত করছেন, তাদের আটক করতে হলে আইন মেনে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
গতকালের শুনানিতে কেন্দ্রের হয়ে প্রশ্ন করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। তিনি জানান, শনিবার মেট্রো পরিষেবা চালু ছিল। তবে দিল্লি–এনসিআরের ৩০৩টি স্টেশনের মধ্যে ৪৫টিতে প্রবেশ ও বেরোনোর পথে বিধিনিষেধ ছিল। তার দাবি, শনিবার চার হাজারেরও বেশি মেট্রো ট্রেন চলেছে এবং রাত ১০টার পর সব স্টেশন খুলে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট পরিষেবাও স্বাভাবিক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে এই ব্যাখ্যা শুনেও আদালত সংশ্লিষ্ট স্টেশনগুলোর তালিকা এবং বিধিনিষেধের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
শর্তে মুক্তি পেলেন ককরোচ নেতা দীপকে : ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে আটক সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেসহ তিন শীর্ষ নেতাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিয়েছেন দিল্লির একটি আদালত। আগামী এক বছর কোনো ধরনের শান্তি ভঙ্গ করবেন না, এমন মুচলেকায় গতকাল সকালে আদালত তাদের মুক্তির আদেশ দেন।
শনিবার মুম্বাই থেকে আকাশপথে দিল্লি এসে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই সিজেপির তিন শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কারাকে আটক করে নিয়ে যায় দিল্লি পুলিশ। গতকাল সকালে তাদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্ট নির্বাহী হাকিম আদালতে হাজির করা হলে এই মুক্তির আদেশ আসে।
এর আগে শনিবার গভীর রাতে মোদী সরকারের কড়া সমালোচক জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। সিজেপির শনিবারের বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতে আসা রাঠীকেও আটক করেছিল পুলিশ। এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী ও রাজনীতিবিদসহ তিন হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছিল দিল্লি পুলিশ। আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি পাওয়ার পর আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সিজেপি নেতারা। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে গঠিত তরুণদের সংগঠন সিজেপি জানায়, দেশজুড়ে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়া এবং কারচুপির প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই চলবে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ রুখতে মোদী সরকার রাজধানীজুড়ে অঘোষিত জরুরি অবস্থা জারি করেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
এর আগে নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তুলে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে রাতারাতি আলোচনায় এসেছিল সিজেপি ও এর নেতা অভিজিৎ দীপকে।
সিজেপির এই বিক্ষোভের পেছনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উসকানি রয়েছে বলে দাবি করেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। বিজেপি প্রধান নিতিন নবীন অভিযোগ করে বলেছেন, বিদেশি শক্তির প্রেসক্রিপশনে দেশকে অস্থিতিশীল করতে বিরোধী জোট তরুণদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, গণতন্ত্রে প্রত্যেকের ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। কিন্তু বিশৃঙ্খলা ছড়ানো কারও অধিকার হতে পারে না। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, জেনারেশন জেড বা জেন–জি সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হতে পারে, তবে তাদের দেশ গড়ার মূল লক্ষ্য থেকে স্থায়ীভাবে দূরে সরানো যাবে না।
কোনো মুচলেকায় সই করিনি : ‘এক বছর শান্তি ভঙ্গ করবেন না’ শর্তে মুক্তি দেওয়ার যে কথা ছড়িয়েছে, তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিজেপির শীর্ষ নেতা অভিজিত দীপকে। মুক্তি পাওয়ার পর এঙ পোস্টে গতকাল দীপকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, রাজপথে প্রতিবাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এমন কোনো মুচলেকায় তিনি স্বাক্ষর করেননি। তিনি লেখেন, আমরা প্রতিবাদ জানাতে পারব না, এমন কোনো মুচলেকায় সই করিনি। আমরা আবারও রাজপথে নামব।
সিজেপির শীর্ষ নেতাদের ছেড়ে দেওয়া হলেও বিক্ষোভ রুখতে শহরজুড়ে গতকালও কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধ জারি ছিল। বিশেষ করে যন্তর মন্তর এলাকাটি পুরোপুরি ঘিরে রাখা হয়েছে। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে এবং ৩০টি সংযোগ পয়েন্টে যানবাহন ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন রাহুল–খাড়গের : বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রথমে রাষ্ট্রপতির কাছে অভিযোগ জানানোর পর এবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চলেছে বিরোধী জোট ইন্ডিয়া। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শাসক ও বিরোধী শিবিরের সংঘাত এখন আর রাজনৈতিক সভা, মিছিল কিংবা সংসদের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। অভিযোগের পরিসর বাড়িয়ে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কাছেও তা পৌঁছতে চাইছে বিরোধীরা।
এরই পদক্ষেপ হিসাবে আজ সোমবার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্যোগ নিয়েছেন কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে। এদিন বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে তাদের বৈঠক করার কথা রয়েছে। তবে বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে আর কোন কোন প্রতিনিধি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে দেখা করবেন, তা এখনও জানা যায়নি।
রাহুল–খাড়গেদের সাক্ষাৎ দেবেন না প্রধান বিচারপতি : নির্বাচনে জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগে আজ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইনডিয়া জোট সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা করে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তর কাছে স্মারকলিপি জমা দিতে চেয়েছিল। তবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ইন্ডিয়া জোটের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পরিবর্তে তিনি তাদের নিয়মতান্ত্রিক আইনি উপায়ে পিটিশন বা রিট দায়ের করার পরামর্শ দিয়েছেন।.












