নগরের কে.সি. দে রোডের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে প্রায় দুই বছর আগে ব্যবসায়ী পুলক দাশকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা লুটের ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে সাজু মিয়া (৩৭) নামে একজনকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার সাথে জড়িত অন্যান্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টাসহ মামলার সার্বিক বিষয় গতকাল সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়। পিবিআই পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম ক্লুলেস মামলাটির রহস্য উদঘাটনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
পুলিশ সুপার জানান, সাজু মিয়া গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার ভেলারায় এলাকার বাসিন্দা। গত ১৬ আগস্ট রাতে ঢাকার গোলাপবাগ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর একটি দল। পরদিন ১৭ আগস্ট তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ১০টার দিকে নগরের কোতোয়ালী থানার কে.সি. দে রোডের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের আন্ডারগ্রাউন্ডে পাকা রাস্তায় পুলক দাশকে পথরোধ করে একদল ব্যক্তি। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। চিৎকারের চেষ্টা করলে মুখ চেপে ধরে এবং চোখ গামছা দিয়ে বেঁধে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়।
পুলক দাশ নগরের হাজারী লেইনের হাজারী মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘নবরূপা শিল্পালয়’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তিনি বিভিন্ন স্বর্ণ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পাইকারি দরে স্বর্ণ কিনে নিউ মার্কেট এলাকার বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করতেন।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ঘটনার সময় তার কাছে স্বর্ণ বিক্রির নগদ ১৭ লাখ ৯০ হাজার ৫২০ টাকা ছিল। এছাড়া প্রায় ৭৭ ভরি ১৫ আনা ২ রতি স্বর্ণালংকার, একটি ওমেগা ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি ও একটি ওয়ান প্লাস টেন আর মোবাইল ফোন ছিল। সব মিলিয়ে লুট হওয়া মালামালের মূল্য প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৩০ হাজার ৬৪৫ টাকা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।
পিবিআই জানায়, অপহরণের পর মাইক্রোবাসের ভেতরে পুলক দাশের হাত–পা গামছা দিয়ে বেঁধে তাকে মারধর করা হয়। পরে তার কাছে থাকা স্বর্ণালংকার ও টাকা ভর্তি কালো রঙের ব্যাগ, হাতঘড়ি ও মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। গাড়িতে আরও একজন ওঠার পর তাকে সীতাকুণ্ড থানার বড় দারোগারহাট স্কেল এলাকায় নিয়ে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে যায় অপহরণকারীরা।
এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কোতোয়ালী থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন পুলক দাশ। মামলাটি প্রথমে কোতোয়ালী থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরে বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে মামলাটির তদন্তভার পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পিবিআই তদন্তভার গ্রহণের পর বিভিন্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করে। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। তদন্তের একপর্যায়ে মামলার অন্যতম আলামত পুলক দাশের ব্যবহৃত ওয়ান প্লাস টেন আর মোবাইল ফোনটি মীরসরাইয়ের গোভনীয়া এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে বিভিন্ন থানার মামলার নথি পর্যালোচনা ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সাজু মিয়ার সম্পৃক্ততা শনাক্ত করা হয়। তার অবস্থান শনাক্ত করে গাইবান্ধা, ঢাকা ও মাদারীপুরের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার অভিযান চালানো হলেও তিনি বারবার অবস্থান পরিবর্তন করায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট রাতে ঢাকার গোলাপবাগ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর একটি দল।
পিবিআই সূত্র জানায়, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সাজু মিয়া ঘটনার সঙ্গে আরও পাঁচ থেকে ছয়জনের সম্পৃক্ততার কথা জানিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম জানান, দীর্ঘদিন ধরে মামলাটির তদন্তে বিভিন্ন তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত সাজু মিয়ার দেওয়া তথ্য যাচাইসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।












