ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যে উত্তেজনাপূর্ণ কথাবার্তা হয়েছে তাতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে কীভাবে অগ্রসর হওয়া দরকার সে বিষয়ে দুই নেতার ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিই প্রতিফলিত হয়েছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন। সামপ্রতিক সময়ে দুই নেতার মধ্যে এটাই প্রথম কথোপকথন নয়। এর আগে রোববারও তারা ফোনে কথা বলেছিলেন। সেসময় ট্রাম্প দিনকয়েকের মধ্যেই ইরানে নতুন হামলার দিকে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রসর হচ্ছে বলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, বলেছেন ওই কর্মকর্তা।
ট্রাম্প যে ইরানে নতুন হামলার কথা বিবেচনা করছেন তা আগেই জানিয়েছিল সিএনএন। তবে এবার ওয়াশিংটন ইরানে কোনো অভিযানে গেলে তা নতুন নাম পেতে পারে। এ নাম হতে পারে ‘অপারেশন স্লেজহ্যামার’, বলেছিল মার্কিন এ সংবাদমাধ্যমটি। কিন্তু রোববারের ওই ফোনালাপের ২৪ ঘণ্টা পরই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, তিনি কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্রদের অনুরোধে ইরানে মঙ্গলবারের পরিকল্পিত হামলা স্থগিত করেছেন। খবর বিডিনিউজের।
কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ফল বের করতে উপসাগরের দেশগুলো সামপ্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউস ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা ও পরিস্থিতি সম্বন্ধে অবগত এক ব্যক্তি সিএনএনকে জানিয়েছেন।
ইরানে আমরা চূড়ান্ত পর্বে রয়েছি। দেখা যাক কী ঘটে। হয় আমরা একটি চুক্তি পাবো নয়তো আমরা এমন কিছু করবো যা খানিকটা নোংরা ধরনের। আশা করছি তেমন কিছু করতে হবে না, গত বুধবার সকালে সাংবাদিকদের এমনটাই বলেন ট্রাম্প। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আবার ওয়াশিংটন–তেহরান এ চলমান আলোচনায় ‘হতাশ’, তিনি চান ইরানের বিরুদ্ধে ‘আরও আগ্রাসী’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে অগ্রসর হতে। এক্ষেত্রে যত দেরি করা হবে, ততই ইরানের লাভ হবে, নেতানিয়াহু এ যুক্তি দিচ্ছেন বলে ভাষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও ইসরায়েলি সূত্রগুলোর।
সিএনএনকে ওই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, নেতানিয়াহু তার ‘হতাশা’ মঙ্গলবার ব্যক্ত করেছেন; ট্রাম্পকে বলেছেন, হামলা পিছিয়ে দেওয়া ভুল হবে বলেই তিনি মনে করেন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের উচিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়া। ঘণ্টাব্যাপী ফোনালাপে নেতানিয়াহু নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ শুরুর জন্য জোর তদবির চালান বলে বিষয়টি সম্বন্ধে অবগত এক ইসরায়েলি সূত্রও জানিয়েছে।
এই ফোনালাপে দুজনের মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ট্রাম্প চাইছেন, চুক্তিতে পৌঁছানো যায় কিনা তা দেখতে, নেতানিয়াহু প্রত্যাশা করছেন অন্য কিছু, বলেছেন ওই ইসরায়েলি কর্মকর্তা। এ প্রসঙ্গে মন্তব্যের জন্য সিএনএন হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দিক থেকে সাড়া পায়নি। ট্রাম্প–নেতানিয়াহু মঙ্গলবারের এই ‘উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপ’ নিয়ে প্রথম খবর প্রকাশ করে অ্যাঙিওস। ওই ফোনালাপের পর ইসরায়েলের উদ্বেগ নেতানিয়াহুর আশপাশের কর্মকর্তাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে বলে আরেক ইসরায়েলি সূত্র সিএনএনকে বলেছে।
ইরানের ‘অনুমতি নিয়েই’ ২৪ ঘণ্টায় ২৬ নৌযানের হরমুজ পাড়ি : হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল শুরুর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা থমকে থাকলেও ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বুধবার বিকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬টি নৌযান সঙ্কীর্ণ ওই জলপথ পাড়ি দিয়েছে। অনুমতি নিয়ে ও আইআরজিসি’র নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল হচ্ছে, বুধবার তাদের এ বিবৃতিটি প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্র–সংশ্লিষ্ট বার্তা সংস্থা ইসনা। পরে সেদিনই ইরানের পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ (পিজিএসএ) এঙে হরমুজের ‘নিয়ন্ত্রিত সামরিক অঞ্চল’ চিহ্নিত করে একটি নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে; ওই নিয়ন্ত্রিত এলাকায় কোনো নৌযানই তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচল করতে পারবে না, বলেছে আল জাজিরা।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রণালির পূর্বাঞ্চলীয় প্রবেশপথে এ নিয়ন্ত্রিত এলাকা ইরানের কুহ–এ মুবারক থেকে শুরু করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা’র দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত; পশ্চিম প্রবেশপথে এটি শুরু হয়েছে ইরানের কেশম দ্বীপের প্রান্ত থেকে, শেষ আরব আমিরাতের উম্ম আল–কোয়াইনে।
গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার আগ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়েই বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ জ্বালানি গন্তব্যে যেত। মার্কিন–ইসরায়েলি হামলার পাল্টায় যুদ্ধের শুরুর দিকেই তেহরান ব্যস্ত এ জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং তাদের অনুমতি ছাড়া নৌচলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ দিয়ে ইরানের আয়ের প্রধান উৎস তার তেল রপ্তানিকে চেপে ধরার উদ্যোগ নেয়। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তোলার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে মানবিক বিপর্যয় যে আসন্ন সেই উদ্বেগও বাড়াচ্ছে।











