ঝালকাঠিতে যাত্রীবাহী বাস উল্টে পুকুরে পড়ে ১৭ জনের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন অন্তত ১৮ জন। গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সদর উপজেলার ছত্রকান্দা এলাকায় খুলনা–ঝালকাঠি সড়কে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে আটজন নারী, ছয়জন পুরুষ ও তিনজন শিশু। এদের মধ্যে ১৫ যাত্রীর পরিচয় মিলেছে। স্বজনরা শনাক্তের পর মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাকি দুটি মরদেহ ঝালকাঠি সদর হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। নিহতদের ৮ জন চিকিৎসার জন্য বেরিয়েছিলেন। এর মধ্যে নিহত শাহীন মোল্লার স্ত্রী থাকেন চট্টগ্রামে।
দুর্ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। বাসটি যে পুকুরে পড়েছিল সেটির গভীরতা বেশি হওয়ায় হতাহতের পরিমাণ বেড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। চালকের উদাসীনতা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাই দুর্ঘটনার কারণ বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ। বেঁচে ফেরা যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিকভাবে এই তিনটি কারণ উঠে এসেছে। এরই মধ্যে চালক ও তার সহকারীর পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
পুলিশ জানিয়েছে, বাশার স্মৃতি পরিবহনের বাসটি ভাণ্ডারিয়া থেকে ঝালকাঠির উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ছত্রকান্দায় পৌঁছে বাসের চাকা ফেটে গেলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারান এবং বাসটি উল্টে রাস্তার পাশে পুকুরে পড়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরুর পর ঘটনাস্থল থেকে ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয় বলে জানান জেলার সিভিল সার্জন ডা. জহিরুল ইসলাম। তিনি জানান, ২১ জনকে আহত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের পাঁচজনকে বরিশাল শের–ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। বাকিদের ঝালকাঠি ও রাজাপুর স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের পরিচয় জানা যায়নি। দুর্ঘটনার পর খুলনা–ঝালকাঠি সড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে এবং রাস্তার দুদিকে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।
যাত্রীরা অভিযোগ করেন, বাশার স্মৃতি পরিবহনের বাসটিতে ভেতরে প্রচুর যাত্রী দাঁড়িয়েও ছিলেন। যাত্রাপথে বিভিন্ন জায়গা থেকে বাসভর্তি করে যাত্রী তোলা হয়। একপর্যায়ে ভেতরে জায়গা না পেয়ে যাত্রীদের ছাদের উপরে তোলা হয়।
তদন্ত কমিটি : ১৭ জনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মামুন শিবলীকে প্রধান করে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এনডিসি মিলন চাকমা।
পুকুরের গভীরতার কারণেই মৃতের সংখ্যা বেড়েছে : দুর্ঘটনার শিকার যাত্রীবাহী বাসটি যে পুকুরে পড়েছিল সেটির গভীরতা বেশি হওয়ায় হতাহতের পরিমাণ বেড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস।
ঝালকাঠি ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. ফিরোজ কুতুবী বলেন, পুকুরটির গভীরতা অন্তত ২০ ফুট। জেলা প্রশাসকের নির্দেশে পুকুরের সম্পূর্ণ পানি সেচে দেখা হয়েছে কোনো যাত্রী নিচের কাদায় আটকে আছেন কিনা। পরে নতুন কোনো মৃতদেহ না পাওয়ায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
চিকিৎসার জন্য বেরিয়ে সড়কেই আটজনের মৃত্যু : নিহত বাস যাত্রীদের ১৭ জনের মধ্যে আটজনই পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া উপজেলার। তাদের মরদেহ এরই মধ্যে পরিবারের কাছে বুঝিয়ে পদওয়া হয়েছে। বিকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ সবার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে জানান ভাণ্ডারিয়া থানার ওসি আশিকুজ্জামান। তিনি বলেন, এর মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছেন। এসব পরিবারের শোক বিরাজ করছে। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা চিকিৎসার জন্য বরিশালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পথেই তাদের দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে।
সালাম মোল্লার প্রতিবেশী ফেরদৌস মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন সালাম মোল্লা। ট্রাকচালক ছেলে শাহীন মোল্লা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রাসেল মোল্লা বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে রওনা দেন। সালাম মোল্লা ও তার বড় ছেলে শাহীন মোল্লা ঘটনাস্থলে নিহত হয়েছেন। শাহীনের স্ত্রী নাজমা বেগম অন্তঃসত্ত্বা। তিনি চট্টগ্রামে থাকেন। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে ভাণ্ডারিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন নাজমা।












