(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
আগে যেখানে আমাদের ইলিশ ভারত সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হতো যেখানে দুই মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে এসেছে সাড়ে তিন কোটি কেজির বেশি ইলিশ। এটা আমদানি হয়েছে বৈধ পথে। অবৈধভাবে কত এসেছে তা জানা নেই। ইলিশ ভারত থেকে আমদানি করেছে ১৯টি প্রতিষ্ঠান। আমদানিকৃত ইলিশের মূল্য ৭ কোটি টাকা। যদিও এই গুজরাটি ইলিশ আমদানি হয়েছে কেজি প্রতি ২৫০/-। কিন্তু বাংলাদেশে এসে তার দাম হয়ে যায় ২০০০ টাকার কাছাকাছি। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য চার বছর মেয়াদি প্রকল্প নেওয়ার পরে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে জানা যায়। কিন্তু পরিকল্পনা মতো কাজ হয়েছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তরের ডি জি মহোদয়।
তাঁর ধারণা সাগর থেকে নদীতে আসার পথ অর্থাৎ ইলিশের মাইগ্রেটরি রুট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। (সূত্র– আজাদী ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
জাহাজ ভাঙা শিল্পও অস্তিত্ব কি ইলিশের রুট ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখার অন্যতম কারণ হতে পারে?
বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০%-৮০% বাংলাদেশে হয়। এটা মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দাবি। ইলিশ বিষেশজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান বলেন ইলিশের এমন পরিস্থিতি হওয়ার কারণগুলো চিহ্নিত করে, সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অবশ্য মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য গবেষণা বিভাগের প্রধান ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন–সাগরে ইলিশ কমার অন্যতম কারণ বড়ো–ছোটো জাহাজগুলো অত্যধিক মাছ ধরছে। এটার প্রধান কারণ আগে যেখানে সাতশ ট্রলার মাছ ধরত এখন সেখানে প্রায় তিন গুণ ট্রলার মাছ ধরে। উপকূলেও চায়না ফাঁস জাল দিয়ে জাটকা ধরার ফলে মাছ বড়ো হচ্ছে না। এই ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে ইলিশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। (সূত্র– আজাদী ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬)। চট্টগ্রাম ছাড়াও বৃহত্তর বরিশালে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ২৮.২ বিগত ৩ বছরে।
২০২৫ সালের জুনে বাংলাদেশ জার্নাল অব ফিজিকস–এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয় কয়লাভিত্তিক পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই এলাকার ইলিশসহ অন্যান্য মাছের প্রজনন বেড়ে ওঠা ও টিকে থাকার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে।
গবেষণায় নেতৃত্ব দেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার ফলে ঐ এলাকার পানির তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৩.৫ ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়েছে। তাতে ইলিশের প্রজননে প্রভাব ফেলেছে।
এসব তথ্য থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে ইলিশ সহ অন্যান্য মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণ সামুদ্রিক নদী সমুদ্রের তাপ বাড়া, জাহাভাঙা শিল্প যা চট্টগ্রামের যে সব বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে সেগুলো প্রজননকে হুমকীর সম্মুখীন হচ্ছে। অথচ এসব স্থানে ট্যুরিস্ট জোন হলে সমুদ্র, পাহাড়, সুন্দরবন একমাত্র সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ক্ষেত্র হুমকী থেকে রক্ষা পাবে। আর বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎস দ্রুত সারা দেশব্যাপী বিসৃত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা ও সাগরে গ্যাস অনুসদ্ধান দ্রুত করা।
আবার ফেরদৌস স্টিলে দুর্ঘটনায় ফিরে যাই। এই দুর্ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে জাহাজ ভাঙা ফোরামের নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিকরা বিস্ফোরক অধিদপ্তরে আগ্রাবাদ অফিসে স্মারকলিপি দিতে যায়। বিস্ফোরক চট্টগ্রাম অফিসের পরিচালক মহোদয়কে আমরা সাধারণ শ্রমিকদের সামনে তাকে আমাদের স্মারকলিপি গ্রহণ করে– তাঁর মতামত দিতে অনুরোধ জানালে তিনি শ্রমিকদের সামনে এসে কথা বলেন, স্মারকলিপি গ্রহণ করেন, তাঁর বক্তব্য হলো : তিনি মাত্র নতুন এখানে যোগ দিয়েছেন। পূর্বের পরিচালককে অকস্মাৎ বদলি করা হয়েছে। ফলে তিনি এই ব্যাপারে বিশেষ কিছু অবগত নন।
কে দায়ী মারাত্মক এই দুর্ঘটনার জন্য কারা দায় নেবে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য। মারাত্মক দুর্ঘটনাগুলোর জন্য। আরেকটি মারাত্মক অভিযোগ ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনায় সেফটি অফিসারও নিহত হন এবং এস এন কর্পোরেশনের দুর্ঘটনায় কাটিং ম্যানেজার নিহত। তাহলে এসব অযোগ্য অফিসার নিয়োগ দিয়ে ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ বিশাল বিশাল জাহাজ কাটছেন। তারা জানতো না–এখানে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুদূত ঘাপটি মেরে আছে।
সবশেষ বিগত সেপ্টেম্বরে ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসানের প্রথম আলো’য় প্রকাশিত লেখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেল। তিনি বলছেন, যদিও এই হত্যাকাণ্ডের জন্য মূল দায়ী বিএসআরবি, কারণ হিসাবে যা বললেন সেটাও গুরুত্বের দাবি রাখে। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলছেন, বিএসআরবি জাহাজ বাংলাদেশের জলসীমায় পাঠানোর আগে টিটিপি রিপোর্ট দেওয়ার জন্য যে কমিটি আছে এবং জলসীমায় প্রবেশের পর ইয়ার্ডের এসআরপি অর্থাৎ জাহাজ কাটার প্ল্যান বোর্ডে জমা দেওয়ার জন্য দুটি কমিটি আছে। এখানে কোনো প্রতিযোগিতামূলক কমিটি রাখা হয়নি। টেন্ডারও হয় না। এগুলো বিএসআরবি প্রধান (যুগ্ম সচিব) তার নিজস্ব লোক দিয়ে প্রত্যেক ক্ষেত্রে একটি একক কমিটি গঠন করে তাদের কাজের অনাপত্তি পত্র দেন। তিনি ইতোমধ্যে অবসরে চলে গেছেন। হয়তো অবসরের পর এই দুই সংগঠনে কর্তৃত্বে বসবেন। তাই অবসরের আগে আটঘাট বেঁধে কোনো প্রতিযোগিতামূলক কমিটি না রেখে শুধু একটি করে টিটিপি ও এসআরপি প্রতিষ্ঠান তৈরি করে রেখেছেন হয়তো।
জাইকা কর্তৃপক্ষ প্রতিনিধি শিল্পমন্ত্রালয়ে অফিসে জাহাজ ভাঙার বিষয়ে মতামত দেন। তিনি জাইকার উপদেষ্টা প্রতিযোগিতামূলক প্ল্যান করার জন্য আরও কয়েকটি এসআরপি, টিটিপি প্রতিষ্ঠানকে এই কাজের জন্য সংযুক্ত করার সুপারিশ করেন। তাঁর বক্তব্য হলো তাদের প্রকাশ্য টেন্ডারে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক। তাহলে সঠিক মান যাচাই বা জাহাজ প্রাণঘাতি কিনা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সরঞ্জাম ইত্যাদি আছে কিনা সতর্কভাবে যাচাই করা যাবে। তাতে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিআরএসবি এবং সরকার উচ্চ পর্যায়ে নজর দেওয়া খুবই জরুরি। অন্যথায় মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে ইয়ার্ডে। শ্রমজীবী মানুষের জীবন প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ, সমুদ্র দূষণ, নদী দূষণ, শ্রম আইন বিধিমালা কার্যকর না করা, আইএমও, আএলও কনভেনশন তোয়াক্কা না করে এভাবে চলতে থাকবে। শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারাবে। আর মুনাফাখোররা তাদের জীবনের বিনিময়ে মুনাফা করবে। ইতোমধ্যে জাতীয় আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দার ঝড় উঠছে বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্পের বিপক্ষে। সরকার উচ্চ পর্যায়ে এসব বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় নিয়ে কর্তব্য নির্ধারণ করা জরুরি।
লেখক : সভাপতি টিইউসি, চট্টগ্রাম ও আহ্বায়ক, জাহাজ ভাঙা শিল্প, ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম












