সৌদি সংকটে বাংলাদেশের শ্রমবাজার

সাইফুল ইসলাম তালুকদার | শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

সৌদি আরবে সংঘাতের জেরে বিমান চলাচলে বিঘ্ন ও ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের নতুন অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কায়, কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে, আবার কেউ বিদেশ যাত্রায় নেওয়া ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। তাঁদের কাছে ফ্লাইট বাতিল শুধু যাত্রা বিলম্ব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ।

সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনা তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এসব ঘটনায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং আরও ২৪ জন আহত হন। ১৩ অক্টোবর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে জানানো হয়, ৬২টি সরাসরি ও ট্রানজিট ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় ৯ হাজার ৬৭৪ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর আগের দিনের হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত ফ্লাইট ছিল ৫১টি এবং যাত্রী ৫ হাজার ৪১৮ জন।

ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগে যোগদান কিংবা ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। নির্ধারিত সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে ভিসার মেয়াদ, নিয়োগচুক্তি ও চাকরি বহাল থাকা নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে।

তাই অনিবার্য বিলম্বের দায় যেন একতরফাভাবে তাঁদের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর আলোচনা প্রয়োজন।

রেমিট্যান্সে ঝুঁকি, অর্থনীতিতে প্রভাব : সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশটি থেকে ৫৮৪ কোটি ৯১ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এসেছে ১১৪ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

তবে সংঘাতের কারণে রেমিট্যান্স কমেছে–এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানো ঠিক হবে না। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া, প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হওয়া কিংবা নতুন কর্মী নিয়োগ সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে কর্মীদের আয় ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা চাপে পড়তে পারে।

বাংলাদেশ সরকারকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো, কাজে যোগদানের সময়সীমা শিথিল এবং নিয়োগচুক্তি বহাল রাখার উদ্যোগ জরুরি। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দায় কনস্যুলেটের মাধ্যমে আটকে পড়া কর্মীদের আবাসন, খাবার, চিকিৎসা ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নিহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসা সহায়তাও অগ্রাধিকার পেতে হবে।

একই সঙ্গে প্রবাসী কল্যাণ তহবিলের কার্যকারিতা বাড়িয়ে জরুরি আর্থিক সহায়তা, আইনি পরামর্শ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা রাখা দরকার। জরুরি হটলাইন ও নিয়মিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রবাসীদের নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে হবে, যাতে গুজব ও বিভ্রান্তি না ছড়ায়। দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারে দক্ষ কর্মীদের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাই শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।

তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর কূটনীতি এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল পদক্ষেপ। কারণ প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান রক্ষা মানে শুধু তাঁদের জীবন–জীবিকা রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।

লেখক : সভাপতি, প্রবাসী সাংবাদিক সমিতি, ইউএই।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহৃদয়ে চিরজাগরুক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু
পরবর্তী নিবন্ধজাহাজভাঙা ইয়ার্ডে খাণ্ডবদাহন আর কতকাল চলবে