চট্টগ্রাম–নোয়াখালী–শুভপুর, চট্টগ্রাম–পটিয়া–কক্সবাজার, চট্টগ্রাম–কাপ্তাই, চট্টগ্রাম–রাঙামাটি–হাটহাজারী সব সড়কের উভয়দিকে চলাচলকারী যানবাহনে প্রচণ্ড ভিড়। শিশু–কিশোর, তরুণ–তরুণী, যুবক–যুবতী সবাই আসছেন খালি হাতে আর ফিরছেন দু হাতে নানান পদের জিনিস নিয়ে। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় অনেকের নজর কাড়ে ঘরমুখো শিশু–কিশোরদের নৃত্য–চঞ্চল হাসিমুখ এবং নানারকম বাঁশি কিংবা টমটম গাড়ির শব্দ। কারো হাতে তালপাতার সেপাই আবার কারো হাতে বিচিত্র রঙে রাঙানো হাতি–ঘোড়া কিংবা পাখির পুতুল। বড়োদের হাতেও ছোটবড়ো পোটলা–মজাদার খাবার কিংবা গৃহস্থালী পণ্যে ভরা। পরিচিত জনের সঙ্গে দেখা হলেই গালভরা হাসি দিয়ে প্রশ্ন: মেলায় গেলে? কেমন দেখলে? কি কি কিনলে?
এমন দৃশ্য প্রতিবছর দেখা যেতো বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্মারক চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জব্বারের বলী খেলা ও মেলাকে ঘিরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও এমন দৃশ্য কম–বেশি চোখে পড়ে, যদিও তা সময় ও রুচির পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে। জব্বারের বলীখেলা এবং মেলাকে উপলক্ষ করে বৃহত্তর চট্টগ্রামের হাজারো মানুষের মনে এক ধরনের উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। পাশাপাশি এ মেলা কয়েকশ পরিবারের খণ্ডকালীন জীবিকা অর্জনের বড়ো উৎস।
আবারও এলো ১১৭ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সেই জব্বারের বলী খেলা ও মেলা। এটি ১২ বৈশাখ (২৫ এপ্রিল) বলী খেলা উদ্বোধনের দিন কোনো না কোনো মন্ত্রী, মেয়রসহ বিশিষ্ট জনেরা অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড়ো পরিসরে, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ বলী খেলা ও মেলার খ্যাতি দেশ জুড়ে। ২৪, ২৫ ও ২৬ এপ্রিল এ তিনদিনের জন্য মেলা আয়োজনের কথা থাকলেও আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু থেকে ভাঙন পর্যন্ত অন্তত পাঁচ দিন ধরে চলতে থাকে মেলার আমেজ। এর মধ্যে উৎসব ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয় ২৫ এপ্রিল (১২ বৈশাখ)। অবশ্য যানজট, চট্টগ্রাম আদালত ও পুলিশ সদর দপ্তর এবং চাক্তাই–খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখার লক্ষ্যে গত কয়েক বছর থেকে মেলার স্থিতি তিন দিনের বেশি না রাখার ব্যাপারে প্রশাসন বেশ সচেষ্ট।
পরিধি: মূল পর্ব অর্থাৎ বলী খেলার প্রতিযোগিতা হয় লালদিঘির মাঠে। মেলার অন্যতম আকর্ষণ–বেচাকেনার আসর বসে আন্দরকিল্লা মোড় থেকে বক্সিরহাট পুলিশ বিট হয়ে লালদীঘির চারদিক, হযরত আমানত শাহ (রা.) মাজার পেরিয়ে জেল রোডের বিস্তৃত অংশ, দক্ষিণে বাংলাদেশ ব্যাংক (পুরোনো ভবন) চত্বর পেরিয়ে কোতোয়ালি থানার মোড়, পশ্চিমে কেসিদে রোড হয়ে সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে।
সূচনা: জব্বারের বলী খেলার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন চট্টগ্রাম নগরের বক্সিরহাট ওয়ার্ডের বদরপাতি এলাকার ব্যবসায়ী, প্রয়াত আবদুল জব্বার। বাঙালি যুব সম্প্রদায়কে ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাবে উদ্বুদ্ধ করে তাঁদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন এবং মনোবল চাঙা রাখার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ এ খেলার সূচনা করেন।
ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমল এমনকি স্বাধীনতার পরও প্রতিবেশী মিয়ানমারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নামী–দামি বলীরা এতে অংশ নিতেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃহত্তর চট্টগ্রামের কিছু সৌখিন বলীই এই খেলার ঐতিহ্য ধরে রাখছেন বলা যায়। কারণ এক সময় রাজা–বাদশা, গ্রামীণ সর্দার–মাতব্বরসহ বিভিন্ন মহলের কাছে বলী তথা কুস্তিগীরদের কদর ছিল বীরের মতো। সেই অর্থে আধুনিক যুগে কুস্তিগীরির কদর তেমন নেই বললেই চলে। তাই খেলার চাইতে মেলাই হয়ে উঠেছে বলী খেলার মূল উপজীব্য।
মেলায় যা পাওয়া যায়: মানুষের দৈনন্দিন ও গৃহস্থালি কাজে লাগে অথচ জব্বারের বলী খেলার মেলায় মেলে না এমন পণ্য দেশে বোধ হয় তেমন নেই। মেলায় পাবেন ছোটদের খেলনাপাতি, যেমন–নানান আকৃতি–প্রকৃতির মাটি, কাঠ ও প্লাস্টিকের পুতুল, ঘরবাড়ি, বন্দুক, বাস–কার, ঘড়ি, রেডিও, নানা ধরনের বল, দেশি–বিদেশি পোষা পাখিসহ মাটি ও পালকের তৈরি পাখি, টমটম গাড়ি, বাঁশি, উড়োজাহাজ, মুখোশ, নৌকা, তালপাতার সেপাই। আরও পাবেন ঘর সাজানোর নানান কারুপণ্য, তৈজসপত্র, ফ্লোর ম্যাট, কার্পেট, ফুল ও ফুলদানি, শীতল পাটি, ছাটাই, মাদুর, ঝাড়ু, তামা, পিতল কাঁসার সামগ্রী, ক্রোকারিজ সামগ্রী, কসমেটিকস, চুড়ি গয়নাসহ বিভিন্ন মনোহারি দ্রব্য। মিলবে ঘরগেরস্থির হাড়ি–পাতিল, কলসি, কুলা, চালুনি, রুটি বেলার পিঁড়ি, পাটা–উতা (শিল), দা–খন্তি, কুড়াল, কোদাল, বটি, ছুরি, পিঠা তৈরির বিভিন্ন নকশার ডায়াস, হস্তশিল্পজাত দ্রব্য যেমন পাটের শিকে, দোলনা, থলে, টেবিল ম্যাট, শাড়ি, লুঙ্গি, শার্টসহ ছেলে মেয়েদের রকমারি পোশাক। এ ছাড়াও পাবেন কাঠ, স্টিল, প্লাস্টিক ও বেতের আসবাব, গ্রাম–গ্রামান্তরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাদ্যদ্রব্য যেমন, গজা, খই, মুড়ি–খইয়ের মোয়া, তিলের মোয়া, চিনি মাখা ছোলাবুট, মুড়ি, বাতাসা, নাড়ু, জব ও ভুট্টা, জিলাপি, মিষ্টি, দৈ, পাপড়ি, চনাচুর, বাঙ্গী, তরমুজ, ডাব–নারকেলসহ মৌসুমি ফল, ফলের বীজ, গাছের চারা (পুরো নার্সারি সাজিয়ে বসে মেলায়)সহ নানাজাতের শুঁটকি। এসবের পাশাপাশি মেলায় থাকে পুতুলনাচ, কৌতুক–ম্যাজিক শো ইত্যাদি। একসময় ভ্যারাইটি–শো, সার্কাস, নাগরদোলা ইত্যাদির চাহিদা ও আয়োজন থাকলেও প্রায় দুই দশক ধরে এসবের দেখা মেলে না। বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে উদ্যোক্তা–বিক্রেতারা আসেন নানা রকম পণ্য নিয়ে। এসব পণ্যের আকর্ষণে গ্রাম–গ্রামান্তর থেকেও আসে অগণিত মানুষ।
হারিয়ে যাচ্ছে বিশেষ আকর্ষণ
এক সময় মেলার সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ ছিল মৃৎপাত্রগুলো। মিষ্টি ও রান্নাবান্নার হাড়ি–পাতিল, তেলইন, বরুনা (ঢাকনা), ভাত খাওয়ার পাত্র–হানক, ছোট আকারের মাটির গামলা–হদ্দা, মাছের আঁইশ ছাড়ার পাত্র–চাঁড়ি, মেজবানি বা বিয়ের অনুষ্ঠানের মাংস পরিবেশনের বড় পাত্র–তঅ, বদনা, পিঠা তৈরির পাতিল–ফঁঅইন’, দুধের পাত্র–আউত্তা’ ধান, চাল, ডাল, সুপারি রাখার বড় পাত্র–মোটকা, চেরাগ, শীতে আগুন পোহাবার পাত্র–আইল্ল্যা, কলসি, ফিরনির বাটি ইত্যাদি ঘরে ঘরে ব্যবহার হতো। বছরের চাহিদা অনুযায়ী মানুষ মেলা থেকে নিয়ে যেতো এসব সামগ্রী। রাউজানের কদলপুর, হাটহাজারীর মির্জাপুর, জোবরা, পটিয়ার কেলিশহর, চন্দনাইশের কাঞ্চননগর কুলালপড়া, হাশিমপুর, বাঁশখালীর কালিপুর ও ঢেঁইছড়া এলাকার মৃৎশিল্পের (মাটির তৈরি পাত্র) সুনাম ছিল সবার মুখে মুখে। আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে এসব পণ্যের ব্যবহার আজকাল নেই বললেই চলে। তাই যুগের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃৎপাত্রগুলোর গঠন, অলংকরণ, নকশায় বৈচিত্র আনার প্রয়াস পেয়েছেন উৎপাদকেরা। মেলায় পুরোনো দিনের আকার–আকৃতির জিনিসপত্র সামান্য এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশি দেখা যায় আধুনিক নকশার তৈজসপত্রগুলো। আর এসব তৈজসপত্র শোভা পায় মধ্যবিত্ত পরিবারের বৈঠকখানা কিংবা বাগানে। অন্যদিকে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা মৃৎশিল্পীরা হয়ে পড়েছেন বেকার।
খেলা ও মেলা সুষ্ঠু ও বর্ণাঢ্য করে তোলার জন্য রয়েছে আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা ও বৈশাখী মেলা কমিটিসহ একাধিক উপ–কমিটি। প্রতিবছরের মতো এবারও জাঁকজমকপূর্ণভাবে খেলা ও মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শুরু করেছে কমিটি।
লেখক : সাংবাদিক, ইতিহাস গবেষক, ফেলো, বাংলা একাডেমি।













