চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে বটতলী স্টেশনের বর্জ্য

হুমকিতে বন, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ

মোহাম্মদ মারুফ, লোহাগাড়া | বুধবার , ২১ অক্টোবর, ২০২৬ at ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

লোহাগাড়া বটতলী স্টেশনের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের জায়গায়। বটতলী শহর পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে অভয়ারণ্য এলাকায় এসব বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে যেমন আশপাশের মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে বনভূমি, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বনাঞ্চলের পাশে এভাবে বর্জ্য ফেলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, লোহাগাড়া উপজেলা সদর বটতলী স্টেশন এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে সংগৃহীত ময়লা–আবর্জনা গভীর রাতে চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় ফেলা হচ্ছে। প্রায় ১৫ দিন ধরে এভাবে বর্জ্য ফেলা হলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাতের আঁধারে এভাবে ফেলা বর্জ্য জমতে থাকলে এলাকাটির পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়ক সংলগ্ন চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বনপুকুর ও জাঙ্গালিয়া এলাকায় বর্জ্য ফেলা হয়েছে। ফলে বন ও বন্যপ্রাণীর সম্ভাব্য ক্ষতির পাশাপাশি বর্জ্য ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টিও সামনে এসেছে। খোলা জায়গায় বর্জ্য জমে থাকায় পচনশীল পদার্থ থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে আশপাশের বাসিন্দা, পথচারী ও ওই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বর্জ্যের মধ্যে খাবারের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য পচনশীল পদার্থ থাকলে সেগুলো পচে পরিবেশকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক, পলিথিন ও অন্যান্য বর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। বৃষ্টির পানিতে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

স্থানীয়রা জানান, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চলের পরিবেশ রক্ষা শুধু বন বিভাগের দায়িত্ব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য, বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল ও মানুষের সুস্থ জীবনযাপনের স্বার্থে বনাঞ্চলের পাশে অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা দ্রুত বন্ধ করা জরুরি।

স্থানীয় পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিদের মতে, বটতলী শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও বনাঞ্চলের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনবসতি ও বাজার এলাকার বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপসারণ না করে বনাঞ্চলের পাশে ফেলা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত সংকট তৈরি করতে পারে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ জরুরি। অভয়ারণ্যের জায়গায় বর্জ্য ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সাথে ইতোমধ্যে ফেলা বর্জ্য পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ, বর্জ্য ফেলার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা নিতে হবে।

লোহাগাড়া বটতলী শহর পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক কাজী নুরুল আলম চৌধুরী জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মৌখিত অনুমতি নিয়ে ওইসব স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এছাড়া বর্জ্য ফেলতে নিষেধ করায় বনকর্মীকে হুমকি দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ জানান, অভয়ারণ্যের জায়গায় বর্জ্য ফেলার বিষয়টি অবগত হয়েছেন। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়া অভয়ারণ্যের জায়গায় বর্জ্য ফেলতে নিষেধ করায় এক বনকর্মীকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন লোহাগাড়া বটতলী শহর পরিচালনা কমিটির আহবায়ক কাজী নুরুল আলম চৌধুরী।

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ জানান, অভয়ারণ্যের জায়গায় বর্জ্য ফেলার জন্য বটতলী শহর পরিচালনা কমিটিকে মৌখিকভাবে অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বর্জ্য ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

পূর্ববর্তী নিবন্ধডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালে মা ও শিশু হাসপাতালের পক্ষে ওষুধ হস্তান্তর
পরবর্তী নিবন্ধ‘ত্বরিকত ও তাসাউফের উৎস হচ্ছে কুরআন সুন্নাহ’