সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিক নিহতের ঘটনার চার দিন পরও দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি পুরোপুরি গ্যাসমুক্ত হয়নি। পূর্ণ জোয়ারের সময় জাহাজের আশপাশে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া না গেলেও ভাটার সময় এখনো গ্যাসের অস্তিত্ব মিলছে। ফলে জাহাজের ভেতরে কিংবা একেবারে কাছাকাছি গিয়ে তদন্ত করার মতো নিরাপদ পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কমিটির প্রধান ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এ এম বেনজামিন রিয়াজী।গতকাল সোমবার দুপুরে ভাটিয়ারী সাগর উপকূলে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও তদন্তকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ঘটে যাওয়া এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিল্প মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। যারা নিহত হয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে কী কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, কোথায় কোনো ত্রুটি বা বিচ্যুতি ছিল এবং কারও অবহেলা ছিল কিনা সবকিছু বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বেনজামিন রিয়াজী বলেন, জাহাজটিতে যে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, তার মধ্যে হাইড্রোজেন সালফাইড অত্যন্ত বিষাক্ত। এ কারণে জাহাজের ভেতরে বা কাছাকাছি যাওয়ার মতো নিরাপদ অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি। জাহাজটি কিছুটা নতুন এবং এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। ফলে এটিও তদন্তকারী ও সংশ্লিষ্টদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে কিছুটা বেশি সময় লাগছে। গত রোববার ও সোমবার সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে তদন্তের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন সংস্থা এবং মেরিন ও জাহাজ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে আজ (মঙ্গলবার) সকাল থেকেই মূল তদন্তের কাজ শুরু করার কথা রয়েছে।
তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, শুধু তদন্তের স্বার্থেই নয়, জননিরাপত্তা, পরিবেশ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর বিষয়েও সরকার অত্যন্ত সচেতন। তদন্তে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। জাহাজটি কাটার আগে কি ধরনের পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, কোথায় ত্রুটি–বিচ্যুতি ছিল এবং কোনো অবহেলা হয়েছে কিনা তাও দেখা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ঘটনার দিন সেখানে উপস্থিত ব্যক্তি ও শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত করতে দেশীয় বেসরকারি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সোমবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অনিক মেরিন ও প্রান্তিক মেরিন নামের দুটি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠান গ্যাস অপসারণের বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাব দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার নিজস্ব যন্ত্রপাতি নিয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে গ্যাসের উপস্থিতি ও তীব্রতা পরিমাপ করে পূর্ণাঙ্গ ‘ঝুঁকি প্রশমন পরিকল্পনা’ দেওয়ার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক এ এস এম শফিউল আলম তালুকদার বলেন, দেশীয় হলেও ওই দুটি উদ্ধারকারী প্রতিষ্ঠানের দেশে–বিদেশে এ ধরনের উদ্ধারকাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। তারা এর আগেও সফলভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। তাদের কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব পর্যালোচনা করে কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করানো হবে তা বিশেষজ্ঞ কমিটি ঠিক করবে।
তিনি বলেন, ঝুঁকি প্রশমন পরিকল্পনায় জাহাজটি বিষাক্ত গ্যাসমুক্ত করা, বাকি দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি অপসারণ এবং স্লাজযুক্ত পানি অপসারণ–এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যালাস্ট ট্যাংকের ভেতরে এত বেশি মাত্রায় হাইড্রোজেন সালফাইড কীভাবে তৈরি হলো, তাও তদন্ত করা হবে। ট্যাংকের ভেতরে কোনো জৈব পদার্থ, পয়ঃবর্জ্য, স্লাজ বা অন্য কোনো দূষিত পদার্থ ঢুকেছিল কিনা, তা পরীক্ষা করে দেখা হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটিতে মোট চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিল। এর মধ্যে একটি আগে কাটা হলেও কোনো সমস্যা হয়নি। দ্বিতীয়টি কাটার সময়ই বিষাক্ত গ্যাস বের হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। বাকি দুটি ট্যাংকে এখনো পানি রয়েছে। সেখানে কোনো গ্যাস জমে আছে কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে জাহাজের আশপাশে গ্যাসের মাত্রা বর্তমানে কিছুটা কম থাকলেও একেবারে কাছাকাছি যাওয়া এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা সোমবার বিকেলে জাহাজটি পরিদর্শন করেন। এর আগে জোয়ারের কারণে এবং বিষাক্ত গ্যাসের ঝুঁকিতে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি যেতে পারেননি। জোয়ারের সময় জাহাজের আশপাশ পানিতে ডুবে থাকায় গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া না গেলেও ভাটার সময় আবার বিষাক্ত গ্যাসের অস্তিত্ব মিলছে। আজ মঙ্গলবার বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যদের সেখানে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও গ্যাসের প্রকৃতি নিরূপণের কথা রয়েছে।
ফেরদৌস স্টিলের ঘটনাটি তদন্তে ইতোমধ্যে সরকারি তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি শিপব্রেকিং ইয়ার্ড মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সর্বশেষ জাহাজে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি নিরূপণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। জাহাজে অন্য কোনো ক্ষতিকর গ্যাস বা পদার্থ রয়েছে কিনা, তা নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের গ্যাস নিঃসরণের ঝুঁকি থেকে শ্রমিক, এলাকাবাসী ও পরিবেশকে সুরক্ষার বিষয়েও কমিটি সুপারিশ করবে।
ঘটনাস্থলে তদন্তকালে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইয়াসির আরাফাত খান, বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক ক্যাপ্টেন মো. শোয়েব আহমেদ, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দ মাহবুবুল হক, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদি ইসলাম, চট্টগ্রাম চেম্বারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসাইন চৌধুরী, সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন, ফায়ার সার্ভিসের উপ–পরিচালক মো. এমরান, ক্যাপ্টেন মো. এনাম, কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডায়নামিক শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের পরিচালক আরিফুল হাসান নয়নসহ তদন্ত কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য রাখা পুরনো একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণ হয়। এতে ঘটনাস্থল ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মোট নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। অসুস্থ হয়ে পড়েন আরও কয়েকজন। ঘটনার পর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে রাখা হয়েছে। পুরানো এলএনজি ক্যারিয়ারটি আনা হয়েছিল এক বছরেরও বেশি সময় আগে। জাহাজটির উপরের অংশ কাটার পর এখন জাহাজের ভারসাম্য রক্ষা করতে পানি রাখা হয় যে ট্যাংকে সেই ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটতে গিয়েই বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনা ঘটে।












