বেশ কয়েক বছর ধরে কোরবানির ঈদে চামড়ার ন্যায্য মূল্য না পেয়ে তা নদীতে ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। সরকারি হিসেব অনুযায়ী প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ চামড়া এভাবেই নষ্ট হচ্ছে যা সম্ভাবনাময় রপ্তানীমুখী এ শিল্পের বেহালদশা ফুটিয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প বর্তমানে তীব্র সংকট ও এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, বিশ্ববাজারে ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চামড়াশিল্প এখন বড় সংকটের মুখে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কড়া শর্ত, পরিবেশগত মানদন্ডের অভাব এবং সঠিক পরিকল্পনা না থাকায় এ শিল্প তার আগের উজ্জ্বল সম্ভাবনা হারিয়ে ফেলছে। ১৯৪০ সালে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রণদা প্রসাদ সাহা এদেশে প্রথম চামড়া শিল্প প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৫ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৩০টি চামড়া কারখানা ছিল। এরপর ঢাকার হাজারীবাগে গড়ে উঠে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ চামড়া শিল্প। পরবর্তীতে হেমায়েতপুরে তৈরী করা হয় বিশেষায়িত চামড়া শিল্প নগরী। বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বাধা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা এলডব্লিউজি সনদের অভাব। বিশ্বের বড় ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে এলডব্লিউজি সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। এলডব্লিউজি এমন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, যারা কোনো কারখানায় পরিবেশ রক্ষা ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করে সনদ দেয়। আন্তর্জাতিক সনদ বা ‘এলডব্লিউজি’ (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) নেই বলে বড় ব্র্যান্ডগুলো চামড়া কিনতে আগ্রহী হচ্ছে না। অধিকাংশ বড় ব্র্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আমেরিকা ও জাপানের মতো বাজারগুলোতে পণ্য রপ্তানির জন্য এ সনদ বাধ্যতামূলক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চামড়া খাতের ১ হাজার ২০৬টি প্রতিষ্ঠান এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে। এই সনদ পাওয়া বেশি কোম্পানি রয়েছে ইতালিতে ২৫৪টি, ভারতে ২৫১টি এবং চীনে ২০৬টি সনদ পাওয়া কারখানা আছে। অপরদিকে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়া কারখানা রয়েছে মাত্র ৭টি। বর্তমানে ইউরোপীয় কাস্টমার না থাকা এবং সিইটিপি প্রকল্পের জটিলতাই মূল সমস্যা। সিইটিপি প্রকল্প সঠিকভাবে চালু না হওয়ায় বায়াররা সরে গেছে। হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীর পরিবেশ দূষণের কারণে এগোতে পারছে না বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। চামড়া শিল্প নগর পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় তার খেসারত দিতে হচ্ছে সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পকে।
অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সনদের অভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল রপ্তানি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) সঠিকভাবে কাজ না করায়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক স্বীকৃতি ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না ফলে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। সাভারের হেমায়েতপুরের ২০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত চামড়া শিল্প নগরী বাস্তবায়নে ইতিমধ্যে ২০ বছর পার করেছে সরকার। সরকার ১৫৪ থেকে ১৫৬টি ট্যানারি প্লট দিয়েছে। সরকারি জায়গা বরাদ্দ পেয়েও অনেক উদ্যোক্তা চামড়া রপ্তানি করতে পারছেন না। চামড়া শিল্প নগরের বর্তমান সিইটিপি দিয়ে এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া সম্ভব নয়। তাই সিইটিপি ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে নতুন করে। বাস্তবতার বিষয় হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানকে প্লট দেওয়া হয়েছে হয়তো তার কাছে মূলধন নেই অথবা তার আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া রপ্তানী করার মতো সক্ষমতা নেই। সরকার একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে, কয়টা ট্যানারি সরাসরি রপ্তানী করছে এবং চামড়া সেক্টরে ক্রাইসিস কেন হচ্ছে।
আমরা প্রতিনিয়ত চামড়া পাচারের অভিযোগ শুনতে পাই, আমরা চাই না দেশ থেকে একটি চামড়াও পাচার হোক। কিন্তু যেখানে ক্রেতার অভাবে লক্ষ লক্ষ চামড়া প্রতিবছর নষ্ট হচ্ছে সেখানে চামড়া পাচারের অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত। সরকার প্রতিবছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় যাতে লবণযুক্ত মাঝারি আকারের একটি চামড়ার গড় দাম হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা। কিন্তু চামড়ার ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও ট্যানারির মালিকেরা এই দামে চামড়া কিনতে চান না। তবে ট্যানারির মালিকদের দাবি, একটি বড় গরুর চামড়া সংরক্ষণে ৭ থেকে ১০ কেজি লবণ লাগে।তাদের অভিযোগ, লবণ ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট বাজারে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং সরকারের দামে চামড়া কিনতে গেলে তাদের লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে।
বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চামড়া পণ্যের বাজার ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার এই খাতের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ১২ বিলিয়ন (১,২০০ কোটি) মার্কিন ডলার পর্যন্ত রপ্তানি আয় করা সম্ভব। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বাজার প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে তবে দেশের মধ্যে প্রচুর কাঁচা চামড়ার সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। বৈশ্বিক বাজার বড় হলেও বাংলাদেশের চামড়া রপ্তানি তেমন বাড়েনি, চামড়া প্রক্রিয়াকরণ ও পণ্য উৎপাদনের পরিবেশ সম্মত কমপ্লায়েন্স মানসম্মত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা আশানুরূপ বাড়েনি। কারখানাগুলোতে উৎপাদন কম এবং পরিবেশের মান ঠিক না থাকায় রপ্তানি কমে গেছে। অপরদিকে চামড়া আমদানির জন্য প্রতি বছর ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। বাটা বা এপেক্সের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সরাসরি চামড়া কেনা কমিয়ে বাইরের দেশ থেকে পণ্য কিনে নিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটে চামড়ার দাম, গুণগত মান এবং কস্টিং সিস্টেম ও কস্ট কাটের যে প্রসিডিউর, সে প্রসিডিউর অনুযায়ী ট্যানারি সেক্টর এখন পর্যন্ত রেডি না। রপ্তানি বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। বারবার লোকসানে নিঃস্ব হয়ে গেছে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি চামড়া ব্যবসায়ীরা। সঠিক ব্যবস্থাপনা ক্রটির কারণে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প ধ্বংস হওয়ার মুখে। সরকার চামড়া ক্রয় এবং সংরক্ষণের বিপরীতে বারবার পাচার রোধের কথা বলছে কিন্তু যেখানে ক্রেতার অভাবে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ চামড়া নষ্ট হচ্ছে সেখানে পাচার রোধের চেয়ে এই লক্ষ লক্ষ চামড়া সংরক্ষণ এবং রপ্তানীর প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। এই শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য সংশ্লিষ্ট একটি গোষ্ঠী তৎপর কারণ কোরবানীর ঈদে সরকার চামড়া ক্রয়ের দাম নির্ধারণ করে দিলেও লোকসানের অভিযোগে তারা চামড়া সংগ্রহ করে না। ফলে লক্ষ লক্ষ চামড়া অবিক্রিত থেকে যায়।
তাই এই মুহূর্তে সরকারের প্রয়োজন যেভাবে সরকার ধান–চাল সংগ্রহ করে সেভাবে কোরবানী ঈদে নিজস্ব উদ্যোগে চামড়া সংগ্রহের ব্যবস্থা করা এবং এলডব্লিউজি সনদ সংগ্রহের জন্য ইটিপি প্ল্যান্ট সমূহের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং যে প্রতিষ্ঠানগুলো এই সনদ অর্জন করতে পারবে না সেগুলোর প্লট বাতিল করা। সরকার বিভিন্ন খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে সেই হিসেবে প্রান্তিক অঞ্চলে চামড়া সংগ্রহে এবং সংরক্ষণের জন্য যদি কয়েকবছর ভর্তুকির ব্যবস্থা করে তাহলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই রপ্তানিমুখী সম্ভাবনাময় আমাদের চামড়া শিল্প আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের অবস্থান তৈরী করতে পারবে বলে আমি আশাবাদী। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এ দুটি খাত ছাড়া যে কটি খাত থেকে বেশি রপ্তানি আয় আসে তার মধ্যে চামড়া শিল্প অন্যতম। চামড়াশিল্পের এ সংকটময় অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত এবং টেকসই মহাপরিকল্পনা। জাতীয় আয়ে প্রবৃদ্ধি, রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান ও মূল্য সংযোজনের নিরিখে এটি একটি অপার সম্ভাবনাময় শিল্প। চামড়াশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে চামড়া রপ্তানির জন্য আমাদের নতুন নতুন রপ্তানি বাজার তৈরি করতে হবে।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার,
বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।











