ক্যাপ্টেন হাসান খানের মনেই থাকে না তার জাহাজটি গত তিন মাস ধরে একটি যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝখানে অবরুদ্ধ হয়ে আছে, পারস্য উপসাগরের পানি কখনো কখনো এতটাই শান্ত থাকে। ‘বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের মানুষগুলোর মনে শান্তি নেই, এটি আসলেই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি,’ বলছিলেন এই পাকিস্তানি নাবিক।
ছদ্মনাম ব্যবহার করা এই নাবিকের মতো আরও ২০ হাজার নাবিক ফেব্রুয়ারির শেষভাগ থেকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালির আশেপাশের জলসীমায় অবরুদ্ধ হয়ে আছে। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান এই জলপথটি এখন উপরে ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন আর পানির নিচে মাইনের আতঙ্কে পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় প্রায় ১৬০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এই জলপথের ভেতর দিকে আটকা পড়েছে। কোনো গন্তব্যে যাওয়ার পথ না থাকায় জাহাজগুলো যেন একটি বদ্ধ পুকুরে বন্দি হয়ে আছে। খবর বিডিনিউজের।
এই অবরুদ্ধ জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের পতাকাবাহী ও রাষ্ট্রায়ত্ত জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। প্রায় ৩৭ হাজার টন সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া এই জাহাজটি গত কয়েক মাসে দুইবার এই জলপথ পেরিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। জাহাজের ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম জানান, গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) একটি জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে জানতে পেরে তিনি আরও চারটি জাহাজসহ প্রণালির দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরই তাদের আর সামনে না বাড়ার জন্য সতর্ক করা হয়। এর ৯ দিন পর ইরান যখন যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে সমস্ত বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য প্রণালি ‘সম্পূর্ণ উন্মুক্ত‘ করার ঘোষণা দেয়, তখন ক্যাপ্টেন শফিকুল আবার চেষ্টা করেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ বহাল রাখায় তেহরান দ্রুত তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। ততক্ষণে ‘বাংলার জয়যাত্রা’ প্রণালির মাত্র ৩০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে চলে এসেছিল। রেডিওতে হামলার সতর্কতা শুনতে পেয়ে বাধ্য হয়ে জাহাজটি ঘুরিয়ে নিতে হয়।
দীর্ঘদিন সাগরে আটকে থাকায় জাহাজগুলোতে খাবার ও পানির সংকট তীব্র হয়ে উঠছে। দুবাই, আবুধাবি বা কুয়েতের সরবরাহকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে জাহাজে রসদ পৌঁছানো সম্ভব হলেও এর খরচ এখন আকাশচুম্বী। ‘বাংলার জয়যাত্রা’র প্রধান প্রকৌশলী রাশেদুল হাসান বলেন, দুই দিন আগে আমরা জাহাজের জন্য ১৮০ টন পানি কিনেছি। আগে যার দাম ছিল ১৫০০ থেকে ২০০০ ডলার, এখন তা কিনতে আমাদের খরচ হয়েছে ১১০০০ ডলার। অন্যান্য নাবিকদের মতে, এই সংকটময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সরবরাহকারীরা অতিরিক্ত মুনাফা লোটার চেষ্টা করছে।
মে মাসেই এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার হয়ে গেছে, যা জুন–জুলাইতে ৪৫ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ফলে অবরুদ্ধ এই জাহাজগুলোতে পানির চাহিদা আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে। নিজেদের ‘ভাগ্য ভালো’ উল্লেখ করে ক্যাপ্টেন শফিকুল জানান, সংঘাতের দ্বিতীয় দিনে দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দরে যখন ইরান হামলা চালায়, তখন তার জাহাজটি সেখান থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে ছিল। এরপর থেকে ক্যাপ্টেন ও তার ৩০ জন ক্রু সদস্য এত বেশি হামলা প্রত্যক্ষ করেছেন যে তার হিসাব রাখা অসম্ভব। প্রধান প্রকৌশলী হাসান বলেন, সারারাত ধরে যখন হামলা চলে, আমরা কেউ ঘুমাতে পারি না। চোখ মেলে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ দেখি।
আইএমও–র তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত যাচাইকৃত ৩৯টি হামলায় অন্তত ১১ জন নাবিক নিহত হয়েছে এবং একজন নিখোঁজ রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর উত্তেজনা কিছুটা কমলেও প্রতিনিয়ত ড্রোন, ফাইটার জেট, যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনের উপস্থিতি নাবিকদের চরম আতঙ্কের মধ্যে রাখছে।
মাসের পর মাস এই অচলাবস্থার কারণে শিপিং কোম্পানিগুলো বিশাল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক নাবিকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ক্রু পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। সামুদ্রিক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ জানিয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৫০টি জাহাজ আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে; যার বেশিরভাগই চীন, ভারত ও পাকিস্তানের। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা সিএনএ–এর ড. জোনাথন শ্রোডেন জানান, এই জাহাজগুলো মূলত ইরানের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং জাহাজ প্রতি কয়েক মিলিয়ন ডলার ফি বা শুল্ক পরিশোধের মাধ্যমে পার হতে পেরেছে।
‘বাংলার জয়যাত্রা’কে মুক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার এবং এর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিএসসি–র ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডোর মাহমুদুল মালেক জানান, শুরুতে বাংলাদেশ ইরানের দাবি করা শুল্ক দিতে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কোনো দেশ ইরানকে এই অর্থ দিলে তার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির পর সেই পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমরা এখন এক উভয় সংকটে পড়েছি।









