আটজন শিক্ষককে নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর আপত্তি, বিক্ষোভ এবং নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের বর্জনের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট বৈঠক হয়েছে। গতকাল শনিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাকক্ষে সিনেটের ৩৬তম অধিবেশন শুরু হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্–ফোরকান। অধিবেশন শুরুর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন জাতীয় ছাত্রশক্তি, ভয়েস অব স্টুডেন্টস ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সিনেটের নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের মধ্যে কয়েকজন আওয়ামী লীগপন্থি এবং আটজনের জুলাই আন্দোলনবিরোধী ভূমিকা থাকার অভিযোগ তুলে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন।
অংশ না নেওয়া শিক্ষক প্রতিনিধিরা বলছেন, সিনেট সভায় যোগ দিতে তারা ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় তারা বৈঠকে যোগ দেননি। সভায় ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের ৪৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকার সংশোধিত এবং ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের ৫০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকার মূল বাজেট উপস্থাপন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ হাছান মিয়া। আলোচনা শেষে বাজেট দুটি অনুমোদন করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকীকরণের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স–আইকিউএসি কাজ করছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আইকিউএসির উদ্যোগে ৩০টির বেশি প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন করা হয়েছে। ২০২৫–২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে আউটকাম–বেইজড এডুকেশন–ওবিই এবং অভিন্ন সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
তিনি জানান, গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সেলের মাধ্যমে শিক্ষকদের জন্য ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা গবেষণা অনুদান, এমফিলসহ অন্যান্য খাতে ৬৭ লাখ টাকা এবং পিএইচডি ও মাস্টার্স থিসিসে অনুদান চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য ইউজিসির কাছে ২৯ কোটি টাকা গবেষণা অনুদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচার–স্টুডেন্টস কমপ্লেঙ–টিএসসি নির্মাণে ৪৯ কোটি ৩৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং একাডেমিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ৬৭৮ কোটি ১৪ লাখ ৫৪ হাজার টাকা ব্যয়ের দুটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব প্রকল্পে টিএসসি, ছাত্রী হল, একাডেমিক ও গবেষণা ভবন, সিনেট ভবন, প্রশাসনিক ভবন, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় ছাত্রছাত্রীদের জন্য ১০টি ১০ তলা আবাসিক হল, বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য হল, একাধিক একাডেমিক ভবন, ব্লু–ইকোনমি রিসার্চ সেন্টার, কেন্দ্রীয় জাদুঘর, গ্রন্থাগারের দ্বিতীয় ভবন, স্টেডিয়াম, সুইমিং পুল, আধুনিক গবেষণাগার, ৫০ শয্যার হাসপাতাল, ডে–কেয়ার সেন্টার, টিচার্স ডরমেটরি, ওয়াকওয়ে, ফুড কোর্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ইউজিসির বাস্তবায়নাধীন হাইয়ার এডুকেশন এঙিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফর্মেশন–এইচইএটি প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ কোটি ৭৪ লাখ ৮১ হাজার টাকার আটটি সাব–প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। দ্বিতীয় রাউন্ডে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরো ৫২টি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে, যা যাচাই–বাছাই পর্যায়ে রয়েছে। শিক্ষা ও সেবার আধুনিকায়নে উচ্চক্ষমতার ওয়াই–ফাই, ইন্টারনেট অব থিংস–আইওটি সেন্সর, নিরাপত্তা ক্যামেরা এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর রিয়েল–টাইম তথ্যসেবা চালুর কার্যক্রম চলছে। পরীক্ষা–সংক্রান্ত কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে এবং স্বাস্থ্যসেবার আধুনিকায়নের পাশাপাশি ৫০ শয্যার মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ–উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল–আমীন ও উপ–উপাচার্য (প্রশাসন) প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম। উপাচার্যের ভাষণ ও বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন চবি সিনেট সদস্য সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, এরশাদ উল্লাহ, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও সাঈদ আল নোমান। উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
সিনেট সদস্যদের মধ্যে আলোচনা করেন ড. মোহাম্মদ মনজুর–উল–আমিন চৌধুরী, বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. জাহিদা শুলশান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. নিলুফা আকতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. প্রীথিলা নাজনীন নীলিমা, রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট এস.এম ফজলুল হক, শ. ম. নজরুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর ড. এম. আবদুল গফুর, প্রফেসর জমির উদ্দিন আহমদ, অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর মনসুর উদ্দিন আহমদ ও মোহাম্মদ রেজাউল কবির।
সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যান চাকসুর : সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যান করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)। বেলা ১১টায় চাকসুতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি। তিনি অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সিনেটে পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও সিনেট নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রত্যক্ষ প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক ও জুলাই–আগস্ট আন্দোলন নিয়ে বিতর্কিত অবস্থান নেওয়া শিক্ষকদের অংশগ্রহণের অভিযোগ তুলে অধিবেশন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয় চাকসু।
চাকসুর পক্ষ থেকে ১৯ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে পরবর্তী চাকসু, হল সংসদ ও সিনেট নির্বাচন আয়োজনের জন্য বাজেট নিশ্চিত করা, আবাসিক হল সংস্কার ও আবাসন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আবাসন সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের আবাসন ভাতা, শাটল ট্রেন ও বাস সেবা বৃদ্ধি, টিএসসি ও মুক্তমঞ্চ নির্মাণ, কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়াম ও আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ ও লাইব্রেরি আধুনিকায়ন, মেডিকেল সেন্টারকে হাসপাতালে উন্নীত করা, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, অটোমেশন ও সেশনজট নিরসন, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার, স্বল্পমূল্যে খাবারের ব্যবস্থা, খেলোয়াড়দের চিকিৎসা সহায়তা এবং পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর দাবি রয়েছে।
তবে চাকসুর নির্বাচিত ছাত্রদল প্যানেলের এজিএস আইয়ুবর রহমান তৌফিক ও সহক্রীড়া সম্পাদক তামান্না মাহবুব প্রীতি সিনেট অধিবেশনে অংশ নেন।
বিক্ষোভ : সিনেট অধিবেশনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন কর্মসূচি পালন করেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির সিনেট সভায় ‘আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনের অপচেষ্টার’ অভিযোগ তুলে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ মিছিল করে। ছাত্রদল, জাতীয় ছাত্রশক্তি ও ভয়েস অব স্টুডেন্টের পক্ষ থেকে সিনেট অধিবেশনকে ঘিরে আন্দোলন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা সিনেটের প্রতিনিধিত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিতর্কিত শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নিয়ে আপত্তি জানান।
ছাত্রসংগঠনগুলোর আন্দোলনের মধ্যে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত আটজন শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে অংশ নিতে পারেননি বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।












