চট্টগ্রামের প্রাচীন হাট-বাজার

গাজী মোহাম্মদ নুরউদ্দিন | বৃহস্পতিবার , ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ

সপ্তম শতাব্দীতে কর্ণফুলি নদীর তীরে চট্টগ্রামের আদিরূপ হরিকেল রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। ইরাইথ্রিয়িন সি (ঊৎুঃৎবধহ ঝবধ) তে চট্টগ্রাম সম্পর্কে দারুণ একটা বর্ণনা আছে। ব্যাবিলিয়ন সাম্রাজ্যের ইয়েমিনি এবং আরব বণিকরা গ্রীস মেসেডোনিয়াসহ পূর্বের জাভা, সুমাত্রা, চীন এবং এই উপমহাদেশের সুরাট, কোচিন, তাম্রলিপি ও চট্টগ্রাম বন্দরর সাথে বাণিজ্য করতো। বিখ্যাত মিশরীয় ইতিহাস ও জ্যোতির্বিদ টলেমি চট্টগ্রামকে নিকট প্রাচ্যপ্রতীচ্যের সর্বাপেক্ষা সুন্দরতম শহর হিসেবে বর্ণনা করেন। মালয়ী ইতিহাস থেকে জানা যায় যে খৃষ্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দী থেকে মালয়ের সাথে চট্টগ্রামের ব্যবসা বাণিজ্য ছিল। ফাহিয়েন, হিউয়েন সান, ইবনে বতুতা প্রভৃতি বিখ্যাত পরিব্রাজকদের মতে চট্টগ্রাম পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার লীলাভূমি।

আরবীয় মুসলিম বণিকেরা চট্টগ্রামকে তাদের মুখ্য বন্দর বিবেচনা করত, নবম শতাব্দীর দিকে এটার নাম দেন সামুন্দা। ১৫২৮ সালে পুর্তগীজ নাবিকরা সঠিকভাবেই এটাকে পোর্তে গ্রানডে (ঢ়ড়ৎঃব এৎধহফব) রূপে চিহ্নিত করে। কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাশে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরের একদিকে পাহাড় ও অন্যদিকে সমুদ্র। দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দরটি চট্টগ্রাম শহরেই। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে নাবিকরা এখানে নোঙর ফেলে বঙ্গোপসাগরকে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কেননা, পশ্চিম থেকে পূর্বে আসার পথে চট্টগ্রামকে স্পর্শ করতে হয়। বিদেশি শক্তির বিজয়াভিযান ও ঔপনিবেশিক দিনগুলোতেও চট্টগ্রাম বন্দর সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। নবম শতাব্দীতে শুরু হওয়া আরব বণিকদের আধিপত্য ১৫০০ শতাব্দীতে পর্তুগিজদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা বন্দরটির নাম দেয় ‘পোর্তো গ্র্যান্ডে দে বেঙ্গালা’।

বন্দরের কল্যাণে প্রাচীনকাল থেকেই চট্টগ্রামে ব্যবসাবাণিজ্য জমে ওঠে। পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গড়ে উঠে বৈচিত্র্যময় হাটবাজার। কথিত আছে, ইংরেজ আমলের প্রথম দিকে জনৈক বকশি হামিদের নামের স্মারকরূপে বকশিরহাটের নামকরণ করা হয়েছে। বকশি হামিদ বাঁশখালী থানার ইলিশিয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন। ইলিশিয়ায় বকশি হামিদের দিঘি, বকশির চাঁওড়ী (উঁচু ও সমতল খিলা জমি) ও বকশি হামিদের মসজিদ আজও বিদ্যমান।

যুগ যুগ ধরে প্রতি বছর ১লা বৈশাখ তারিখে বকশি হামিদ প্রবর্তিত ‘বলীখেলা’ (কুস্তি প্রতিযোগিতা) বাঁশখালীর ইলিশ্যার বকশির চাঁওড়ীতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাঁশখালীর ‘বকশি চাঁওড়ী’ বলীখেলার (কুস্তি) জন্য প্রসিদ্ধ। এটা ‘বকশি হামিদ মেলা’র স্মৃতি বহন করছে। উনি বাজালিয়ার (সাতকানিয়া থানা) টোনা ঠাকুরের কন্যার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। সেই ঘরে শাহবিবি নাম্নি তাঁর এক কন্যা হয়। ছিলিম খাঁর পুত্র শরীফ ‘শাহবিবিকে’ বিয়ে করেন। চট্টগ্রাম নগরের ‘বকশির হাট’ এই হামিদই স্থাপন করেন।

চট্টগ্রামে পর্তুগিজ বণিকদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে। তখন চট্টগ্রাম শাসন করতেন গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ। পর্তুগিজরা এ দেশে ফিরিঙ্গি নামে খ্যাত ছিল। শেরশাহএর আক্রমণে ভীত হয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ সামরিক সাহায্যের বিনিময়ে ১৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজদের চট্টগ্রামে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ ও চট্টগ্রাম বন্দরের শুল্ক আদায়ের অধিকার প্রদান করেন। তখন তারা দিয়াঙ বাণিজ্য কুঠি ও গির্জা নির্মাণ করে এবং চট্টগ্রাম বন্দরে শুল্ক সংগ্রহকেন্দ্র ও পণ্যসামগ্রীর আড়ত স্থাপন করে। পরবর্তীকালে সেই এলাকাটি ফিরিঙ্গিদের নামানুসারে ফিরিঙ্গি বাজার নামে পরিচিত হয়। সমপ্রতি ফিরিঙ্গি বাজারের কাঁচাবাজারটির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এখানে পাইকারি কলার আড়ত রয়েছে।

ঐতিহাসিক হামিদুল্লাহ খাঁন এর মায়ের নামানুসারে নামকরণ করা হয় বিবিরহাট। এখানে সপ্তাহে দুই দিন বাজার ও গবাদি পশুর হাট বসে। ইতিহাসবিদদের মতে, চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের (বটতলি স্টেশনের) উত্তর পাশে নগরের বাইশ মহল্লার কবরস্থানের পাহাড়টির নাম কুমদান পাহাড়। এই পাহাড়ের পূর্ব দিক ও স্টেশন রোডের উত্তর দিকের সম্পূর্ণ এলাকাটি ছিল জমিদার দেওয়ান বৈদ্যনাথের জমিদারির অন্তর্গত। সেখানে তাঁর বাগানবাড়ি ও সেগুনবাগিচা ছিল। এই এলাকাই বর্তমানে রিয়াজউদ্দিন বাজার। জমিদার বৈদ্যনাথের উত্তরপুরুষের কাছ থেকে জায়গায়টি কিনে শেখ মোহাম্মদ ওয়াশীল সিদ্দিকি। আর শেখ মোহাম্মদ ওয়াশীল সিদ্দিকি তাঁর সুযোগ্য সন্তান চট্টগ্রামের প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েট শেখ রেয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির নামে ‘রিয়াজউদ্দিন বাজারের’ নামকরণ করেন। বাজারটি প্রায় শত বছর ধরে জমজমাট। বিশাল এলাকাজুড়ে এই বাজার অবস্থিত। এই বাজারে পাইকারি কাঁচাবাজার, মনিহারি দ্রব্যসামগ্রীর দোকান ও হকারদের বিভিন্ন সামগ্রী বিপণি রয়েছে। আঠারো শতকের শেষার্ধে চান্দগাঁও এলাকার রওশন বহদ্দারের নামে স্মারকরূপে ‘বহদ্দার হাট’ নামকরণ করা হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে সব ধরনের উৎপাদিত সবজিপণ্য ও মাছমাংস এই বাজারে পাইকারী বিপণন হয়। এখান থেকেই মহানগরীর বাজারগুলোতে কাঁচাবাজার, মাছ, মাংস সরবরাহ করা হয়।

আগ্রাবাদ এলাকার পূর্ব প্রান্তে পাকিস্তান শাসনামলে পাকা দালান নির্মাণ করে কর্ণফুলী বাজার স্থাপিত হয়। কর্ণফুলী নদীর নামানুসারে এই বাজারের নামকরণ করা হয়। আগ্রাবাদ, ব্যাপারীপাড়া ও সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা এখানে বাজার করেন। বাংলাবাজার জমে ওঠে পাকিস্তান শাসনামলে। তখন বাজারের নাম ছিল পাকিস্তান বাজার। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাবাজার। এখানে পাইকারি বাজারের সমস্ত সুবিধা আছে। শহরের দক্ষিণ অঞ্চলের খুচরা বিক্রেতাদের অনেকেই বাজার থেকে পাইকারি দরে মালামাল কেনেন।

১৭৯৪ সালে বর্মী সেনাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে কলকাতায় থেকে চট্টগ্রামে আসা ব্রিটিশ সেনাপ্রধান লে. কর্নেল জন এরস্কিনের নামানুসারে ‘কর্নেল হাটে’র নামকরণ হয়। এখানে টাটকা সামুদ্রিক মাছ, ক্ষেত থেকে সদ্য তোলা শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া যায়।

বাগদাদ নিবাসী বনি ফাতেমী বংশীয় আরব বণিক সৈয়দ আলফা হোসাইনীর বংশধর ছিলেন কাজী মীর আবদুল গণি। তাঁর নামের স্মারকরূপে বাজারস্থানের নাম কাজীর দেউড়ি রাখা হয়েছে। আশির দশকে এখানে একটি আধুনিক কাঁচাবাজার স্থাপিত হয়েছে। শহরের অভিজাত এলাকার গৃহী ও গৃহিণীরা প্রধানত এখানে বাজার করতে আসেন।

লাল খাঁন কে ছিলেন তা ইতিহাসে অজানা রয়ে গেছে। সম্ভবত চট্টগ্রামের মধ্যে ব্রিটিশ শাসনামলে লাল খাঁ নামক পুলিশ বিভাগের কোনো পাঠান কর্মচারী ছিলেন। তাঁর নামের স্মারকরূপে লালখান বাজার নামকরণ হয়েছে। এখানে খুবই ছোট একটি কাঁচাবাজার রয়েছে, যেখানে থেকে মূলত গরিব, বস্তিবাসী ও নিম্নবিত্তেরা কাঁচাবাজার করে থাকেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে প্রসিদ্ধ পালবাহী জাহাজ নির্মাণের জন্য স্বনামধন্য ছিলেন ঈশান মিস্ত্রি। হালিশহরের কর্ণফুলী নদীর তীরে তাঁর নামে স্মৃতিস্বরূপ গড়ে ওঠে ঈশান মিস্ত্রির হাট।

স্বাধীনতাউত্তরকাল থেকে মাছ রপ্তানিকারক সংস্থাগুলো চট্টগ্রাম শহরের পাথরঘাটা এলাকাস্থিত ইকবাল রোড অঞ্চলের কাছাকাছি জায়গায় পাইকারি মাছ বেচাকেনার বাজার বসায়। সামুদ্রিক মৎস্যের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এখন চট্টগ্রামের খ্যাতি আছে। সামুদ্রিক মৎস্য ও মিঠাপানির মাছের পাইকারি বাজার হিসেবে মৎস্য ব্যবসায়ীদের জন্য এটি একটি আদর্শ বিপণিকেন্দ্র। পাইকারি মাছ ছাড়াও এখানে সস্তায় খুচরা দরে বিভিন্ন রকমের সামুদ্রিক মাছ বিক্রয় হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার প্রথম দিকে এই বাজার স্থাপিত হয় দক্ষিণ বাকলিয়া এলাকায়। প্রথমে বাজারের নাম রাখা হয় মালেক বাজার। কিন্তু বিক্রেতাদের অধিকাংশ মহিলা হওয়ায় স্থানীয় জনগণের কাছে এটি বউ বাজার হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এলাকার গরিব, বস্তিবাসী ও শ্রমজীবী মানুষ এ বাজার ব্যবহার করে থাকে। ভিক্ষার চাল থেকে খয়রাতি গোশত পর্যন্ত এখানে বিক্রি হয়।

তথ্যসূত্র :

.আহমদ শরীফ: চট্টগ্রামের ইতিহাস, . আবদুল হক চৌধুরী: বন্দর শহর চট্টগ্রাম, . চৌধূরী শ্রীপূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি: চট্টগ্রামের ইতিহাস, . হাজার বছরের চট্টগ্রাম, দৈনিক আজাদী, ৩৫ বর্ষপূর্তি বিশেষ সংখ্যা, .চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য :আহসানুল হক

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ; ডেপুটি রেজিস্ট্রার,

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামের আভিজাত্য-মেজ্জান
পরবর্তী নিবন্ধডিজিটাল চট্টগ্রাম : তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ও রূপান্তর