সারা দেশের সাথে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে এইচএসসি পরীক্ষা। গতবারের চেয়ে এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ৩ হাজার ৩০৭ জন কমে গেছে। কলেজের সংখ্যা ৬টি বাড়লেও কেন্দ্রের সংখ্যা গতবারের চেয়ে একটি কমেছে।
চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৯৯ হাজার ৬৬৮ জন পরীক্ষার্থী। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৯৭৫। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পরীক্ষার্থী কমেছে ৩ হাজার ৩০৭ জন। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী কলেজের সংখ্যা ২৭৭ থেকে বেড়ে ২৮৩ হলেও পরীক্ষা কেন্দ্র ১১৫ থেকে কমে ১১৪টিতে নেমে এসেছে। বোর্ডের প্রকাশিত পরীক্ষার্থী সংক্রান্ত পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বোর্ড সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষার মাধ্যমে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। চলবে ৮ আগস্ট পর্যন্ত। এরপর শুরু হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চট্টগ্রাম, কঙবাজার ও তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পরীক্ষার্থীরা অংশ নেবেন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগের ১১ হাজার ২৫৫ জন ছাত্র ও ১২ হাজার ৬৪৮ জন ছাত্রীসহ মোট ২৩ হাজার ৯০৩ জন, মানবিক বিভাগে ১৬ হাজার ৩৪২ জন ছাত্র এবং ২৭ হাজার ৮৯৬ জন ছাত্রী মিলে মোট ৪৪ হাজার ২৩৮ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ১৫ হাজার ৫৮৫ জন ছাত্র এবং ১৫ হাজার ৯৫৪ জন ছাত্রীসহ ৩১ হাজার ৫৩৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
২০২৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষার্থী ছিলেন ২২ হাজার ৬৮৬ জন, মানবিকে ৪৬ হাজার ৬৭৮ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ৩৩ হাজার ৭১০ জন এবং গার্হস্থ্য বিজ্ঞানে ১ জন। অর্থাৎ চলতি বছরে বিজ্ঞান বিভাগে পরীক্ষার্থী ১ হাজার ২১৭ জন বেড়েছে। তবে মানবিকে ২ হাজার ৪৪০ জন এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ২ হাজার ১৯১ জন কমেছে। সামগ্রিকভাবে পরীক্ষার্থী কমার প্রধান কারণ মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থী হ্রাস।
বোর্ড সূত্র জানায়, ২০২৬ সালে ছাত্র পরীক্ষার্থী ৪৩ হাজার ১৮২ জন এবং ছাত্রী ৫৬ হাজার ৪৮৬ জন। গত বছর ছাত্র ছিলেন ৪৫ হাজার ৯৯০ এবং ছাত্রী ৫৬ হাজার ৭৮৫ জন। অর্থাৎ ছাত্র কমেছে ২ হাজার ৮০৮ জন এবং ছাত্রী কমেছে ২৯৯ জন। এবারও ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রদের তুলনায় প্রায় ১৩ হাজার ৩০৪ জন বেশি।
২০২৫ সালে ২৭৭টি কলেজ থেকে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিলেও এবার এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮৩টিতে। অর্থাৎ নতুন ৬টি কলেজ যুক্ত হয়েছে। তবে কলেজ বাড়লেও কেন্দ্র কমেছে একটি। এবার ১১৪টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে গত বছর ছিল ১১৫টি কেন্দ্র।
বোর্ডের তথ্য অনুযাযী, অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল চট্টগ্রাম জেলার পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৭০ হাজার ৯৭৪ জন। কঙবাজারে ১২ হাজার ২৫৫, রাঙামাটি জেলায় ৫ হাজার ৪৩৯, খাগড়াছড়িতে ৭ হাজার ৩৫৩ জন ও বান্দরবান জেলায় ৩ হাজার ৬৬৭ জন পরীক্ষার্থী রয়েছেন।
২০২৫ সালের সঙ্গে তুলনা করলে চট্টগ্রাম জেলায় পরীক্ষার্থী ৫২৩ জন কমেছে। কঙবাজারে ৫৮৯ জন, রাঙামাটিতে ১৪৩ জন, খাগড়াছড়িতে ৬৮ জন এবং বান্দরবানে ১৩১ জন কমেছে। অর্থাৎ বোর্ডের আওতাধীন পাঁচটি জেলাতেই পরীক্ষার্থী হ্রাস পেয়েছে।
কেন্দ্র বণ্টনেও সামান্য পরিবর্তন এসেছে। এবার চট্টগ্রাম জেলা (মহানগরসহ) ৬৮টি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে, যা গত বছর ছিল ৬৯টি। কঙবাজারে ১৮টি, রাঙামাটিতে ১০টি, খাগড়াছড়িতে ১০টি এবং বান্দরবানে ৮টি কেন্দ্র অপরিবর্তিত রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরে এবার ২৬টি কেন্দ্র থাকছে, যা গত বছরের ২৭টি থেকে একটি কম।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, পরীক্ষা আয়োজনে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। পরীক্ষা সুষ্ঠু, কেন্দ্র নকলমুক্ত রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রশ্নফাঁসের গুজব প্রতিরোধ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং গুজব থেকে পরীক্ষার্থীদের সুরক্ষা দিতে সব কোচিং সেন্টার পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, পরীক্ষা চলাকালীন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) প্রধান নির্বাহী বরাবরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষায় অনিয়ম প্রতিরোধে বোর্ড ১৫টি সাধারণ ভিজিল্যান্স টিম এবং ৮টি বিশেষ ভিজিল্যান্স টিম গঠন করেছে। গত বছর সাধারণ ভিজিল্যান্স টিম ছিল ৩০টি এবং বিশেষ টিম ছিল ১০টি। অর্থাৎ এবার নজরদারি দলের সংখ্যাও কমানো হয়েছে। তবে ভিজিল্যান্স টিমগুলোকে নিবিড়ভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে বোর্ডের শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিশেষ নির্দেশাবলি : নির্দেশনায় বলা হয়, পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে অবশ্যই পরীক্ষার্থীদের আসন গ্রহণ করতে হবে। প্রথমে বহুনির্বাচনি ও পরে সৃজনশীল/রচনামূলক (তত্ত্বীয়) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ৩০ নম্বরের বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় ৩০ মিনিট এবং ৭০ নম্বরের সৃজনশীল (সিকিউ) পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। ব্যবহারিক বিষয় সম্বলিত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ২৫ নম্বরের বহুনির্বাচনি (এমসিকিউ) পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় ২৫ মিনিট এবং ৫০ নম্বরের সৃজনশীল (সিকিউ) পরীক্ষার ক্ষেত্রে সময় ২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। পরীক্ষা বিরতিহীনভাবে প্রশ্নপত্রে উল্লিখিত সময় পর্যন্ত চলবে। এমসিকিউ এবং সিকিউ উভয় অংশের পরীক্ষার মধ্যে কোনো বিরতি থাকবে না।
সকাল ১০টা থেকে অনুষ্ঠেয় পরীক্ষার ক্ষেত্রে সকাল সাড়ে ৯টায় অলিখিত উত্তরপত্র ও বহুনির্বাচনি ওএমআর শিট বিতরণ, সকাল ১০টায় বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্র বিতরণ, সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বহুনির্বাচনি উত্তরপত্র (ওএমআর শিট) সংগ্রহ ও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র বিতরণ। (২৫ নম্বরের বহুনির্বাচনি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ সময় ১০টা ২৫ মিনিট।)
দুপুর ২টা থেকে অনুষ্ঠেয় পরীক্ষার ক্ষেত্রে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে অলিখিত উত্তরপত্র ও বহুনির্বাচনি ওএমআর শিট বিতরণ, দুপুর ২টায় বহুনির্বাচনি প্রশ্নপত্র বিতরণ, দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বহুনির্বাচনি উত্তরপত্র (ওএমআর শিট) সংগ্রহ ও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র বিতরণ (২৫ নম্বরের বহুনির্বাচনি পরীক্ষার ক্ষেত্রে এ সময় ২টা ২৫ মিনিট।)
প্রশ্নপত্রে উল্লিখিত সময় অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেক পরীক্ষার্থী সরবরাহকৃত উত্তরপত্রে তার পরীক্ষার রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, বিষয় কোড ইত্যাদি ওএমআর ফরমে যথাযথভাবে লিখে বৃত্ত ভরাট করবে। কোনো অবস্থাতেই মার্জিনের মধ্যে লেখা কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে উত্তরপত্র ভাঁজ করা যাবে না। পরীক্ষার্থীকে তত্ত্বীয়, বহুনির্বাচনি ও ব্যবহারিক অংশে (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পৃথকভাবে পাস করতে হবে।
প্রত্যেক পরীক্ষার্থী কেবল রেজিস্ট্রেশন কার্ড ও প্রবেশপত্রে উল্লিখিত বিষয়/বিষয়সমূহের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। কোনো অবস্থাতেই অন্য বিষয়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে না। পরীক্ষার্থীরা কাঁটাযুক্ত (নন–প্রোগ্রামেবল) হাতঘড়ি ব্যবহার করতে পারবে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত সাধারণ সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর (নন–প্রোগ্রামেবল) ব্যবহার করতে পারবে। প্রোগ্রামিং ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা যাবে না। পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়া অন্য কেউ মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারবেন না এবং কোনো পরীক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে মোবাইল ফোন আনতে পারবেন না।
কেন্দ্রের আশপাশে ১৪৪ ধারা : নগরের সব পরীক্ষা কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। পরীক্ষা চলাকালীন এ আদেশ কার্যকর থাকবে। নকল প্রতিরোধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮–এর ২৯, ৩০ ও ৩৩ ধারার ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং পরীক্ষার শুরুর এক ঘণ্টা আগে থেকে শেষ হওয়ার পরবর্তী এক ঘণ্টা পর্যন্ত পরীক্ষাকেন্দ্রের নির্ধারিত এলাকায় এই আদেশ কার্যকর থাকবে। এই আদেশের আওতায় আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য, লাঠিসোঁটা বহন, যেকোনো ধরনের সভা, সমাবেশ ও মিছিল, উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার বা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রের ব্যবহার, অননুমোদিত ও বহিরাগত ব্যক্তিদের কেন্দ্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সিএমপি জানিয়েছে, এই নির্দেশ প্রতিটি পরীক্ষার দিন কার্যকর থাকবে এবং কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের আইন মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে পরীক্ষার্থীরা একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরীক্ষা দিতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনৈতিক কার্যক্রম প্রতিরোধে পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রসংলগ্ন সব ফটোকপির দোকান ও ফটোকপি মেশিন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সিএমপি।
বিদ্যুৎ নিয়ে উদ্বেগ : পরীক্ষা চলাকালীন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিপিডিবির প্রধান নির্বাহী বরাবরে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডের সচিব প্রফেসর জহিরুল হক স্বপন স্বাক্ষরিত চিঠিতে আগামী ২ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত পরীক্ষা চলাকালীন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে। তবে এই অনুরোধের পর বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক কতটুকু ঠিক থাকবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকেরা। তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তীব্র গরমের মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পরীক্ষার্থীরা অসুবিধায় পড়বেন বলে মন্তব্য করেছেন কয়েকজন অভিভাবক।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে, সুষ্ঠু, নকলমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, কেন্দ্রভিত্তিক তদারকি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় এবং ভিজিল্যান্স টিমের কার্যক্রমের মাধ্যমে পরীক্ষা পরিচালনা করা হবে।












