যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের পর পশ্চিমাদের উদ্দেশে প্রতিরোধের বার্তা দিতে গতকাল শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রায় সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যানুষ্ঠনের সূচনায় তেহরানে লাখো মানুষের ঢল নেমেছে। কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামে প্রতিশোধ ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত রক্তিম পতাকা হাতে শোকাহত মানুষ রাজধানী তেহরানের ধর্মীয় কমপ্লেক্স গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সমবেত হন।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত শুরুর প্রথমদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় নিহত হন সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। স্থানীয় সময় গতকাল শনিবার সকালে তেহরানের ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় (মসজিদ কমপ্লেঙ) খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। সেখানে ইরানের পতাকা মুড়িয়ে আনা খামেনির কফিনের উপরে রাখা হয়েছে তার কালো পাগড়ি। এদিনসহ ছয় দিন ধরে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আনুষ্ঠানিকতা চলবে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, মুসাল্লার দরজা খোলার কয়েক ঘণ্টা আগেই ইরানের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিপুল সংখ্যক মানুষ সেখানে এসে হাজির হন। মানুষের ভিড় এতই বেশি ছিল যে, ফজরের আজানের সময়ই দরজা খুলে দেওয়া হয়, যাতে মানুষ মসজিদ কমপ্লেক্সের মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতে পারে। শ্রদ্ধা জানাতে আসা ইরানিদের পরনে কালো পোশাক আর হাতে দেখা গেছে দেশটির লাল, সাদা ও সবুজ পতাকা, ‘বদ্ধ মুষ্টির’ প্রতীক, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং বর্তমান মুজতবা খামেনির ছবি। তারা একদিকে প্রয়াত নেতাকে বিদায় জানাচ্ছেন, অন্যদিকে বর্তমান নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করছেন। ইরান কর্তৃক্ষের বিশ্বাস, শুধু রাজধানীতেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানে খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ও প্রয়াত নেতাকে শ্রদ্ধা জানাতে এক কোটিরও বেশি মানুষ উপস্থিত হবে। ১৯৮৯ সাল থেকে আলি খামেনি ৩৭ বছর ধরে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন–ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
ইমাম খোমেনি মুসাল্লার মঞ্চে খামেনির কফিনের সঙ্গে আরও চারটি কফিন রাখা হয়েছে। খামেনির কফিনের পাশাপাশি ২৮ ফেব্রুয়ারিতে একই হামলায় নিহত তার মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ–উল–হুদা বাকেরি, পুত্রবধূ (বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার স্ত্রী) জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং নাতনি জাহরা মোহাম্মাদি গোলপায়েগানির (১৪ মাস) মরদেহ রাখা হয়েছে।
আলি খামেনি নিহত হওয়ার এক সপ্তাহ পর তার ছেলে মোজতাবা খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। কিন্তু এ অনুষ্ঠানের কোথাও আয়াতুল্লাহ মোজতাবা খামেনিকে দেওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। মূলত সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণার পর থেকে মোজতাবা খামেনিকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া দেশটির অন্যান্য শীর্ষ নেতারা অনুষ্ঠানস্থলে দেখা গেছে। এমনকী ইরানের যেসব শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা যুদ্ধ চলাবস্থায় দৃশ্যান্তরে ছিলেন এদিন তাদেরও দেখা গেছে। ইমাম খোমেনি মুসাল্লায় উপস্থিত হাজার হাজার ইরানি ‘আমেরিকার পতন হোক’, ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ শ্লোগান তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে অশ্রুসজল দেখা যায়। একই সময়ে হামলায় নিহত পূর্বসূরির স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস–আইআরজিসির প্রধান হওয়া আহমদ বাহিদি নতুন দায়িত্বে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে উপস্থিত হন। কালিবাফ বলেন, প্রতিশোধের জন্য জাতির আহ্বান সমগ্র বিশ্বের কানে পৌঁছাতে হবে। তিনি ইরানিদের ব্যাপক সংখ্যায় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। এখানে উপস্থিত মোহাম্মদ মিরসালেহি (৩৮) বলেন, তিনি আমাদের সবার পিতার মতো ছিলেন। আমরা সবাই এতিম হয়ে গেলাম। উনার মতো কেউ নেই।
জানাজা ও শেষ বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে তেহরানজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মুসাল্লামুখি রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আর আকাশসীমাও বন্ধ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আয়াতুল্লাহ রুহল্লাহ খোমেনির ১৯৮৯ সালে হওয়া শেষ বিদায়ের অনুষ্ঠানের পর ইরানে এটিই সবচেয়ে বড় এ ধরনের অনুষ্ঠান হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পাঁচ সপ্তাহের যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর থাকায় বর্তমানে সংঘাত স্থগিত রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই প্রয়োজন হলে আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা খামেনির মৃত্যু ইরানে নতুন এক যুগের সূচনা করেছে, যা অনিশ্চয়তায় আচ্ছন্ন। দেশটির কর্তৃপক্ষের মতে, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সরকারের প্রতি জনসমর্থনেরও একটি পরীক্ষা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার অভিযোগে সরকার আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে।
খোমেনির কফিন রাষ্ট্রায় মর্যাদায় আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত এখানে রাখা হবে।












