চরিত্র কখনো একক সত্তা না। চরিত্র আমাদের অভ্যাসের মিশেল। আর একজন সামাজিক মানুষের চরিত্র কখনোই রাজনৈতিক সত্তার ঊর্ধ্বে নয়। ফলে মানুষের যা কিছু ব্যক্তিগত, যা কিছু চারিত্রিক তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। প্রেক্ষাপট–উদ্দেশ্য–সীমানার ভিন্নতায় চরিত্রগুলোকে কাল্পনিক মনে হতে পারে কিন্তু যৌক্তিকতা বিবর্জিত নয়। বরঞ্চ মানুষ যেটা চেষ্টা করে তা হলো, সকল প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য কিংবা সীমানাতেই নিজের সকল চরিত্রের একটি বৈধতা তৈরি করা, অবশ্যই নৈতিকতা এবং কাঠামোগত দূরদৃষ্টি বৈধতার সাথে ন্যায্যতার ভিত্তিকে মজবুত করে।
যেমন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিনিধির কেলেঙ্কারিকে কোন লেন্স থেকে দেখা উচিত তার চেয়ে বেশি জরুরি এ প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং সীমানাগুলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করা। এক্ষেত্রে যিনি বা যারা আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন তারা কতটা ভালো পর্যবেক্ষক তা বোঝাও জরুরি। একজন পর্যবেক্ষক তার বৈধতা হারান গঠনমূলক সমালোচনা না করে, যার জন্য বলা হচ্ছে তার উন্নতি না ঘটিয়ে বরং বিদ্বেষ প্রকাশ পেলে। জামায়েত নেতা ও সাতক্ষীরা–৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে উক্ত সদস্যকে বলতে দেখা যায়, এই নারী আমার দ্বিতীয় স্ত্রী/ এই ভিডিও এ আই দিয়ে তৈরী/ আমি মাত্র একবারই আসছি। সে যাই হোক, এ ঘটনায় বন্ধু মহলে আলোচনা হলে বেশ কিছু দিক উঠে আসে। কেউ বলছে কারো একান্ত ব্যক্তিগত ভিডিও প্রকাশ করা অন্যায়, কেউ বলছে সংসদীয় সদস্যদের সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নৈতিক স্খলন হলে তার প্রতিক্রিয়া আসা স্বাভাবিক আবার কেউ বলছে কাজটা অন্যায় হলেও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তারা অন্যের ক্ষেত্রে একই ঘটনাকে চু্লচেরা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত করেন এবং মানহানি করতে ভোলেন না। ফলে এখানে সবকিছু জায়েজ। কিন্তু একজন সংসদ সদস্যের দুর্নীতি, রাষ্ট্রের সাথে বেঈমানি কিংবা নিয়োগ বাণিজ্যের চাইতেও তার একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তই কেন নৈতিক স্খলনের মূল মানদন্ড? নিয়োগ বাণিজ্যে স্বচ্ছতার চাইতে তার একান্ত কামরার বৈধতা পেতে জনগণের আগ্রহের নেপথ্যে কি আছে? যদি একজন নিয়োগ বাণিজ্য করেন তবে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় না কিন্তু ক্লিপ ভাইরালেই নৈতিক স্খলন হয়।
সমাজে একজন ব্যক্তির চরিত্র গড়ে ওঠে নৈতিকতার ওপরে, কিন্তু এই নৈতিকতার প্রেক্ষাপট নির্ধারণ করেন মোড়ল। খুব সহজে বললে, ক্ষমতাসীন দলেরা। ফলে ক্ষমতা কাঠামোতে নৈতিকতার মানদণ্ড সমাজের কম ক্ষমতাসীন মানুষের বৈপরীত্বেই অবস্থান করে। ধরেন, একজন নারীর একান্ত ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হলে সমাজে নৈতিক স্খলন ঘটে কিন্তু একজন পুরুষের ক্ষেত্রে একে দ্বিতীয় স্ত্রীর মর্যাদায় ফেললে বিষয়টা সহজে সামাল দিয়ে ওঠা যায় এবং নৈতিকতা বজায় থাকে। যেহেতু একজন পুরুষ তার জন্য বহু স্ত্রী রাখার ক্ষমতা নৈতিকতার বিধিতেই আইনগতভাবেই পেয়েছেন সেহেতু তার পক্ষে এই কেলেঙ্কারি সামাল দিতে দুইটি প্রধান ন্যায্যতাদানকারীর প্রয়োজন পড়ে। এক. তার প্রথম স্ত্রীর, দুই. তার সমাজ। এক্ষেত্রে প্রথম জনের সমঝোতা পুরো ঘটনাকেই সামাল দিতে প্রধান উৎসেচক হিসেবে কাজ দেয়।
তবে নারীর ক্ষেত্রে পুরুষ সঙ্গীরা এমন দায়ভার নেন না কেন?
মনে আছে, অভিনেত্রী প্রভার সাথে অভিনেতা অপূর্বের বিয়ে ঠিক হলে প্রভার প্রাক্তনের সাথে একান্ত ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল হয়? তখন অপূর্ব নিজের ক্যারিয়ারের সম্মানার্থে প্রভার সাথে বিচ্ছেদ করেন। এখন এই ঘটনাকে তো সমালোচনা করার অধিকারও আমাদের নেই। কেননা একজন তার ব্যক্তিগত মতামত থেকে উদ্যোগ নিতেই পারেন যদিও এখানে অপূর্বের চাইতে প্রভার নৈতিক স্খলন সমাজের চোখে এত বড় ছিল যে তা কখনোই মুছে যায়নি। তবে কি এসব ঘটনা সমাজে বিরল? তা তো নয়। মামুনুল হক, ডা. মুরাদ হাসান কিংবা এরশাদের এমন ঘটনা বেশ ভাইরাল। তাই এর অতীত খনন মূল উদ্দেশ্য নয়। লিঙ্গভেদে নৈতিক স্খলন, সামাজিক দায়ভার ও সঙ্গীর কর্তব্যের চিত্র বোঝাতেই সমস্ত প্রসঙ্গ টানা।
আল–কোরআনের সূরা আন–নিসার আয়াত চৌত্রিশে আছে, “আর নেককার স্ত্রীগণ হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাজত করতে বলেছেন, তা স্বামীর অনুপস্থিতিতেও রক্ষা করে।” আবার গীতা নয় দশমিক বত্রিশ শ্লোকে–এ বলা হয়েছে, “স্বামীর কল্যাণের জন্য স্ত্রী যেন তার কাম্যকরণে অংশগ্রহণ করে”। এরূপ আরো কিছু কুরআন–হাদিস ঘাঁটলে কিংবা ইতিহাসের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, স্ত্রীকে স্বামীর হেফাজতকারী বা কাম্যকরণ সঙ্গী হিসেবে দেখা হয়েছে। অর্থাৎ নারী তার স্বামীর জন্য তার মান–সম্মান, চাহিদা, গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, ওয়াদা কিংবা তুচ্ছ বস্তুরও হেফাজত করতে নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন এবং কোনো ধরনের অপকর্মতে অংশগ্রহণ করেন না। যদি দেখি, আমরা এমন এক অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র যাদের প্রধান ধর্ম ইসলাম। ফলে ধরে নিই, বেশিরভাগ নারী মুসলিম, বেশিরভাগই কারো না কারো স্ত্রী, প্রত্যেকেই নৈতিক স্খলনের বিরুদ্ধে। তবে ঠাট্টা করে বলতেই হয়, স্বামী তার কেলেঙ্কারিতে প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে স্ত্রীকেই বেছে নেন। স্ত্রী মাইকে এসে চিৎকার করে বলে ওঠেন, ঐ মহিলাই আমার স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী। এমন ভাইরালে তার মানসম্মানের স্খলন হচ্ছে।
কিন্তু এই রক্ষা কি তাদের দায় নাকি ক্ষমতার রাজনীতি। আমাদের সমাজের নারীদের এধরনের দায়ভার থাকে মূলত সামাজিক, পারিবারিক চাপে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বেশি সামাজিক দায়কে এখানে বড় করে দেখা যায় কেননা স্ত্রীকে তালাকের অধিকার স্বামীর আছে। ফলে ধর্মীয় নীতিতে প্রশ্নই আসেনা দায়ভার না নেওয়ার। স্বামী ছাড়া সমাজ যেভাবে একজন নারীর জীবন ত্যানা করে ছাড়ে তারচেয়ে সতীনকে বোনের মতো দেখা সমাজের নৈতিকতার মান বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু একজন নারী চাইলেই তো এই মিথ্যার প্রতিবাদ করতে পারতো, স্বামীর রক্ষা কবজের দায়ভার ছেড়ে দিতো কিন্তু নারীরা কেন তা করেন না?
প্রথমেই বলেছি, এই নৈতিকতার মানদণ্ডের দায়ভার নেন মোড়লেরা। ফলে তারাই ক্ষমতাসীন আসনে থাকেন সর্বদা এবং নারীর মতো কম ক্ষমতাসীন দলের জন্য নির্দিষ্ট দায় ঠিক করেন। তদ্রুপ বলাই যায়, কেলেঙ্কারির রক্ষাকবচ নারীই, দায়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাই বড়। এখন ভাবুন, কতটা ক্ষমতাশালী হলে এ–দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়!












