সড়কে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে গার্মেন্টস শ্রমিকদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, শ্রমিকদের মজুরি বোর্ড গঠনের দাবি পূরণ হয়েছে। এরপরও আন্দোলনের নামে সড়ক–মহাসড়কে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। এছাড়া কিছু মুখোশধারী উসকানিদাতা আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করেছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে গার্মেন্টস শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মালিক ও শ্রমিক উভয় পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিল্প গড়ে ওঠে। শুধু পুঁজি বিনিয়োগ করলেই শিল্প প্রতিষ্ঠিত হয় না। শ্রমিকের শ্রম ও মালিকের পুঁজি একসঙ্গে যুক্ত হলেই উৎপাদন বাড়ে এবং দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। তাই উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে শিল্পকারখানা সচল রাখতে হবে।
শ্রমিকদের অবিলম্বে কাজে ফিরে স্ব স্ব কর্মস্থলে শান্তি–শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহবান জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ সংক্রান্ত বোর্ডের প্রথম সভা শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে। খবর বাংলানিউজ ও বাসসের। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি নির্ধারণের জন্য প্রতি তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠনের বিধান রয়েছে। শ্রমিকদের দাবি ছিল দ্রুত মজুরি বোর্ড গঠন করা। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিলেও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধির নাম চূড়ান্ত করতে কিছুটা সময় লেগেছে। গত পরশু রাতে শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দেওয়ার পর গতকাল সকালেই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া কখনো বন্ধ ছিল না।
তিনি বলেন, মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের বক্তব্যও বিবেচনায় রাখতে হবে, যাতে শিল্পকারখানা সচল থাকে এবং রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। প্রধানমন্ত্রী শ্রমবান্ধব ও শিল্পবান্ধব নীতি গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন।
শ্রমিকদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কোনো দাবি থাকলে প্রথমে স্মারকলিপির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। মজুরি বোর্ডের মতো নির্ধারিত ফোরামে শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা তাদের দাবি তুলে ধরতে পারবেন।
তিনি বলেন, গত কয়েক দিনের আন্দোলনের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সেখানে কিছু উসকানিদাতা অনুপ্রবেশ করেছে। তারা এমন কিছু কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে, যাতে শ্রমিকদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিভিন্ন ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকদের আইনগত সহায়তার বিষয়টি সরকার দেখবে। যারা আহত হয়েছেন, তাদের বিষয়েও যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিক নেতারা ধর্মঘটের ডাক দেননি, আন্দোলনও করেননি। তাদের দাবি ছিল মজুরি বোর্ড গঠন। সেটি গঠন করা হয়েছে। ফলে এখন শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলন চলছে না। যারা আন্দোলনের নামে সহিংসতা করছেন, তাদের পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, কয়েকজন মুখোশধারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করছেন এবং রাজনৈতিক স্লোগান দিচ্ছেন। নিজেদের তথাকথিত পেশিবাদী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবেও পরিচয় দিচ্ছেন তারা। এসব বিষয় শনাক্ত করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রমিক নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শ্রমিকদের কাজে ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধি রয়েছেন। সেখানে তারা নিজেদের দাবি ও বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন। তিনি বলেন, সবাইকে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। শিল্পের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং বেকারত্ব দূর করতে হবে। মিল–কারখানা চালু রেখে দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখা ও রপ্তানি বাড়াতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্ট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এবং নবগঠিত ন্যূনতম মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আক্তার সকল পোশাক শ্রমিককে অবিলম্বে কারখানায় ফিরে গিয়ে উৎপাদন সচল রাখার আহ্বান জানান।
বৈঠকে শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, শ্রমিক নেতা ও সংসদ সদস্য শিমুল বিশ্বাস উপস্থিত ছিলেন। শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ তৃণমূল গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি মির্জা আল শামীম, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মোস্তফা, বিপ্লবী গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি অরবিন্দু বেপারী বিন্দু, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আকাশ আহম্মেদ বাবুল, স্বাধীন গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাকিল হোসেন মোবারক, জাতীয় তৃণমূল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক আমীর হামজা খান, বাংলাদেশ পোশাক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান, শ্রমিক দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, রেডিমেড গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি লাভলী ইয়াসমীন, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি মো. জাকির হোসেন প্রমুখ।












