জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যেই এশিয়ায় শিশুদের অকাল জন্মের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর ফলে সৃষ্ট ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে সতর্ক করেছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা। নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে জিরো কার্বন অ্যানালিটিকস (জেডসিএ) বলছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্ম হয়েছে। এর মধ্যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাবে প্রায় দেড় হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে নির্ধারিত সময়ের আগে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত গবেষণার তথ্য তুলে ধরে জেডসিএর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সঙ্গে বাংলাদেশে আনুমানিক ৫ হাজার ৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর প্রায় ৪৭ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। গবেষণায় ১৯৯১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত এপ্রিল মাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রার সঙ্গে ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপমাত্রার তুলনা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ওই বছর তাপপ্রবাহে বাংলাদেশে অপরিণত শিশুর জন্মের হার ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি এক হাজার জন্মে অতিরিক্ত প্রায় ১৯টি শিশুর জন্ম হয়েছে নির্ধারিত সময়ের আগে। খবর বিডিনিউজের।
বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপিন্সকে নিয়ে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশেই অপরিণত শিশুর জন্মের হার বৃদ্ধির হিসাব সর্বোচ্চ। গবেষকদের পৃথক আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত তাপমাত্রা তৈরি না হলে ওই বছরের এপ্রিলে বাংলাদেশে অন্তত ১ হাজার ৪৭৯টি অপরিণত শিশুর জন্ম হত না।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের তথ্য অনুযায়ী, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মত তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা প্রায় ৪৫ গুণ বেড়েছিল। জেডসিএর গবেষণায় তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ৫ হাজার ৫১৫টি এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ১ হাজার ৪৭৯টি অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের হিসাব দুটি পৃথক বিশ্লেষণ থেকে এসেছে। প্রথমটিতে আগের তিন দশকের এপ্রিলের তাপমাত্রার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দ্বিতীয়টিতে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে পরিস্থিতি কেমন হত, তার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। ফলে সংখ্যা দুটি যোগ করার সুযোগ নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, গর্ভধারণের ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে জীবিত শিশুর জন্ম হলে তাকে অপরিণত জন্ম বা প্রি–টার্ম বার্থ বলা হয়। বিশ্বজুড়ে নবজাতকের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি অপরিণত জন্ম। নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বেশি থাকে। পাশাপাশি তাদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা, স্নায়ুর বিকাশে জটিলতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখে পড়ার আশঙ্কাও বেশি।
জেডসিএর গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এমনিতেই অপরিণত শিশুজন্মের উচ্চ হারের দেশগুলোর একটি। ২০২০ সালে বাংলাদেশে অপরিণত শিশুর জন্মের হার ছিল আনুমানিক ১৬ দশমিক ২ শতাংশ, যা বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় এ হার ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের প্রভাব দেশের সব বিভাগে সমান ছিল না। সবচেয়ে জনবহুল দুই বিভাগ ঢাকা ও চট্টগ্রামে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। সারা দেশে তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত ৫ হাজার ৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের ৪৭ শতাংশ ঘটেছে এই দুই বিভাগে।
তবে জন্মের সংখ্যার তুলনায় ঝুঁকি বৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ছিল ময়মনসিংহে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ময়মনসিংহ বিভাগের তাপমাত্রা ওই মাসের স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৩ দশমিক ৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। দেশের আট বিভাগের মধ্যে এটিই ছিল সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধি। যার প্রভাবে ময়মনসিংহে প্রতি এক হাজার জন্মে অতিরিক্ত ২৪টি অপরিণত শিশুর জন্ম হয়েছে। এই হার দেশের বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। অথচ মোট অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সংখ্যায় ময়মনসিংহের অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। অন্যদিকে, সিলেটে প্রতি এক হাজার জন্মে অতিরিক্ত ১৬টি অপরিণত শিশুর জন্ম হয়েছে, যা বিভাগগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।
গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে তাপমাত্রার কারণে অপরিণত শিশুর জন্মের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। জেডসিএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪১ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে একটি স্বাভাবিক এপ্রিল মাসেও বাংলাদেশে প্রায় দেড় হাজার অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্ম হতে পারে। ১৯৮৫ থেকে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসের গড় জলবায়ুর সঙ্গে তুলনা করে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
গবেষকদের হিসাবে, ২০৪১ থেকে ২০৬০ সালের মধ্যে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সংখ্যা ৬৩০ থেকে ২ হাজার ৯০০ এর মধ্যে থাকতে পারে। এই পূর্বাভাসে এপ্রিলের তাপমাত্রা প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। মাঝারি ও উচ্চমাত্রার বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্ভাব্য পরিস্থিতি ধরে গবেষকেরা এই হিসাব করেছেন।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গর্ভাবস্থায় শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ কারণে গর্ভবতী নারীরা অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাবে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। তীব্র গরমে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। গর্ভফুলে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে। শরীরে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগে প্রসব শুরু হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত শারীরিক প্রক্রিয়াও হতে পারে সক্রিয়।
দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতার কারণে রক্তস্বল্পতা, শারীরিক পরিশ্রমের কাজ এবং গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার সীমিত সুযোগ এসব ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। একইভাবে ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা না থাকা এবং তাপ আটকে রাখে এমন নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি বাড়িতে বসবাসের কারণেও গর্ভবতীরা বেশি গরমের সংস্পর্শে আসতে পারেন।
গবেষকেরা বলছেন, গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত গরমের ঝুঁকি সম্পর্কে তথ্য ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্য সেবা বাড়ানো, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও শীতল পরিবেশের ব্যবস্থা করা এবং তাপপ্রবাহের আগাম সতর্কবার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। যেসব বিভাগে অতিরিক্ত অপরিণত শিশুর জন্মের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকার স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে যেসব বিভাগে মোট সংখ্যা কম হলেও ঝুঁকি বৃদ্ধির হার বেশি, সেসব এলাকাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক এবং জেডসিএর জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক ড. জোয়ান বেন্টলি–ম্যাককুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতা বাড়ছে। এতে অপরিণত জন্মের ঝুঁকি এবং এর সঙ্গে সম্পর্কিত সম্ভাব্য আজীবন স্বাস্থ্যগত প্রভাব বেড়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে খুবই কম। অথচ উচ্চ আয়ের ও বেশি নিঃসরণকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চরম আবহাওয়ার অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি প্রভাবের শিকার। এসব দেশের অভিযোজনের জন্য সম্পদও বেশি।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড পাবলিক হেলথের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবির বলেন, এই গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। চরম তাপমাত্রা গর্ভবতী ও নবজাতকের জন্য জরুরি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত আনুমানিক ৫৫১৫টি অতিরিক্ত অপরিণত জন্মের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, মাতৃস্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে তাপ থেকে সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করা কতটা জরুরি।
জেডসিএ জলবায়ু পরিবর্তন, প্রকৃতি ও জ্বালানি খাতের পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে থাকে। সংস্থাটি বলছে, নতুন এই গবেষণার তথ্য তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কোন এলাকায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, তা নির্ধারণে সহায়তা করতে পারে।












