একজন কবি গীতিকার বা সাহিত্যিকের সৃষ্টিশীলতা বা কর্ম নিয়ে আলোচনায় যাবার পূর্বে তাঁর সমাজ, মন, মনন, বিশ্বাস, কর্মপদ্ধতিকে সামনে এনে মূল্যায়ন করাটা সমীচীন বিধায় কবিয়াল রমেশ শীলের জীবন চিত্র ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। বাঙালি যে ক‘জন লোককবি উদারনীতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মরমী জীবনকে ধারণ করে তাঁর সময়ে খাদহীন দেশপ্রেম, বিরল অসামপ্রদায়িকতা, তুলনাহীন মানবতা এবং মানুষে মানুষে ভেদাভেদহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে, আমৃত্যু কাজ করে বিশেষ শ্রদ্ধার আসনে নিজের অবস্থানকে উচ্চতায় তুলে ধরতে পেরেছেন তাঁদের মধ্যে রমেশ শীলের স্থান সন্দেহাতীতভাবে উর্ধ্বে।
চট্টগ্রাম পটিয়ার চন্ডীচরণ শীল ও কাছাকাছি অঞ্চল বোয়ালখালীর রাজকুমারী দেবীর ঘরে ৯ মে ১৮৭৭ সালে জন্ম নেয়া শিশু স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে পড়াকালীন পিতার দেয়া কবিতার বইয়ের মধ্যে ‘তজার লড়াই‘ পুস্তকের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সাথী হিন্দু–মুসলিম বন্ধুদের সাথে সন্ধ্যায় ঘরের দাওয়ায় পিদিমের আলোয় ‘তজার লড়াই‘র যে চর্চা শুরু করেন তা‘ই তাঁর জীবনে কবি সত্তার প্রথম পাঠ। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর পরিবারের ভার এগার বছরের বালকের উপর পড়লে দিশাহারা বালক পালিয়ে বার্মায় ৭/৮ বছর অবস্থানের পর চট্টগ্রামে ভয়ংকর ঝড় জলোচ্ছ্বাসের খবরে দেশে ফিরে মা, দিদিমা, তিন বোনের ভার নিয়ে পৈত্রিক কবিরাজি শুরু করেন এবং পূর্বের সেই না ভোলা তর্জার আকর্ষণে পুনরায় বন্ধুদের সাথে প্রায়ই কবির লড়াইতে গিয়ে নিজেকে তাদের মতো মেলাতে চেষ্টা করেন। এ অবস্থায় ১৮৯৮ সালে চট্টগ্রামের সদরঘাটে জনপ্রিয় কবিয়াল চিন্তাহরণ সরকার ও মোহনবাঁশি সরকারের লড়াইয়ে চিন্তাহরণের গলা বসে গেলে আয়োজকের অনুরোধে, বন্ধুদের চাপে রমেশ মঞ্চে উঠতেই মোহনবাঁশির অশালীন আক্রমণে রমেশ বিচলিত না হয়ে, শালীন বুদ্ধিদীপ্ত দৃঢ় বাক্যবানে তাঁকে পরাস্ত করতে রাত শেষে পূর্বাহ্ন পর্যন্ত গড়ালে আপোষী জোটকে জয়লাভ এবং পরবর্তী বছরে চট্টগ্রামে তিন কবির বিরুদ্ধেও জয়লাভ তাঁকে তুঙ্গ জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
আর এ শিল্পে প্রতিষ্ঠার জন্য যে জ্ঞান দরকার তা বুঝতে পেরে প্রতিটি ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, রামায়ন, মহাভারত, বাংলা কোরআন, হাদিস, ত্রিপিটক, বাইবেল, কাসাসুল আম্বিয়া, মুনি ঋষি, নবী রীসুল অলি– আল্লাহর জীবনী পাঠ ইতিমধ্যে তাঁর জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু ১৯১৪–১৯১৮ খ্রি পর্যন্ত চলা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয় মানুষের আনন্দ উল্লাস। রমেশ, কবিকুল বায়নাহীন, অভাব যাতনায় সন্তান–সন্ততি নিয়ে দুঃসহ দুর্বিপাকে পড়েন।
তার এ অসহায়তায় মনে পড়ে ভাণ্ডারী ভক্ত সারদা চরণের সে সব কথা– ‘ভাণ্ডার নাকি বিপথতারিনী, মানবদরদী, মানব সাম্যের লীলাভূমি, সকল মানুষের আশ্রয়, কেউ নাকি খালি হাতে ফেরে না‘। তাই পরিবার পরিজন কবিকূলকে নিয়ে উপায়হীন বিপর্যস্ত রমেশ ১৯২৩/২৪ সালে ৪৬ বছর বয়সে পরিত্রাণের সমূহ বিশ্বাসে সারদা চরণের সাথে মাইজভাণ্ডার যান। তখন মাইজভান্ডারের প্রতিষ্ঠাতা ঐশী মহাপুরুষ গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী স্রষ্টা দীদারপাপ্ত, তাঁরই করুণাধারায় সিক্ত আপন ভ্রাতুষ্পুুত্র গাউসুল আযম বিল বিরাসত হযরত শাহ সুফি সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (ক.) প্রকাশ বাবাভাণ্ডারী চারিদিক আলো করে দয়াদানে ধন্য করছেন সবাইকে। বাবাভাণ্ডারীর দর্শন তাঁকে আবেগাপ্লুত করে দেখেন “গদীর উপর অতি উজ্জ্বল বরণ এক পুরুষ নির্বাক, সিদ্ধ বলে মেনে নিলাম‘, কে যেন কানে কানে বলিল, এই মাইজভাণ্ডারের ভক্তগণকে তোর গান শুনাইতে হইবে। প্রাণ কাঁপিয়া উঠিল, শরীর আড়ষ্ট হইল। ঐশী‘ দৃষ্টিবানে ধরা পড়েন রমেশ উদ্ধারের সোপানে। ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী রমেশ বাবাভাণ্ডারীর তাছারুপাতে আপন অস্তিত্বে নতুন এক অনুভূতি, নতুন বোধের অবস্থা, নতুন ভাববিভোরতায় নিজেকে হারিয়ে অপর এক অস্তিত্ব যেন তাঁর মধ্যে খুঁজে পেলেন। এটাই কি মাইজভাণ্ডারের করুণাধারা? এলমে লুদুনীর ভাব সাগর। এ অবস্থায় রমেশ লেখেন ‘রমেশের পাপ নয়নে ফুল দেখেছে ভাগ্যের গুণে‘, রমেশ বনে যান দোয়াত কলম কালিবিহীন সিনায় সিনায় লেখা পড়ার হেকমতি ডিগ্রীধারী– নিজে নয়, কে যেন তাকে চালায়, লেখায় নিজের মধ্যে প্রতীতি–জনে–
“ওকী চমৎকার। ভান্ডারে এক আজগুবী কারবার,
মানুষ ধরার কল বসাইল দেখবি গেলে মাইজভাণ্ডার” বা
“ইস্কুল খুইলাছেরে মাওলা ইস্কুল খুইলাছে,
গাউসুল আযম মাইজভাণ্ডারী ইস্কুল খুইলাইছে।“
তাই সে স্কুলের ছাত্র হতে রমেশ প্রক্রিয়া রপ্ত করতে চান– আর্তি অনুভব করেন–
“গাউসে ধনরে কি সাধনে পাব তোমারে,
আমি সাধন ভজনহীন দয়া কর আমারে“।
তাই পবিত্র কদমে রমেশের আত্মজারী ফরিয়াদ–
“মুর্শিদও নিদানের মুর্শিদও
এই দাসেরে কবুল করলানি“।
নিজের মধ্যে এ ভিন্ন আলোর দিশা তাঁকে পথ দেখিয়ে চলে সারণী হয়ে দৃষ্টির দ্বার খুলে দেয়। পূর্বেকার কুরুচিপূর্ণ কবির লড়াইর স্থলে শুরু হয় রুচিশীল পরিশীলিত করিগানের এবং সর্বদিকে তাঁর বোধোদয় ঘটে। ১৯৩০ এ চট্টগ্রাম রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সূর্য সন্তান সূর্য সেনের অস্ত্রাগার লুন্ঠন, বৃটিশ বিরোধী মনোভাব কবি সত্তায় জাগরুক হয়। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কবিয়াল সমিতি। কিন্তু পুনঃ মাথা তুলে উঠতে না উঠতে শুরু হয় ১৯৩৯–৪৫ ২য় বিশ্বযুদ্ধ, তারই জের ধরে ৪৩ এর মন্বন্তর। এ দুঃখের দিনে মানুষের উপর মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন এবং ১৯৫৪ সালে বর্ধমানের কৃষক সম্মেলনে কবি সদলবলে যান। একই বছর ফ্যাসিস্ট বিরোধী সম্মেলনে কোলকাতায় ডাক পেয়ে রবীন্দ্র স্নেহধন্য শেখ গোমানীর বিরুদ্ধে তারাশঙ্কর বন্দোপধ্যায়, সাভাষ মুখোপধ্যায়, মানিক বন্দোপধ্যায়ের সক্রিয় উপস্থিতিতে বিদগ্ধজনকে হতবাক করে রাত এগারোটার নির্ধারিত সময় রাত ২টায় আপোষী জোটকে শেষ হয়। দর্শক চট্টগ্রামের পল্লী পারাগার কবি রমেশকে বৃটিশ–ভারতের আলোকিত কেলকাতার কবির বিরুদ্ধে জয়ী ঘোষণা করলে পরদিন পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে তা ছাপানোর প্রেক্ষিতে বিদগ্ধজনের কাছে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসেন তিনি।
রমেশ প্রত্যক্ষ করেছেন, সম্পৃক্ত হয়েছেন, নিগৃহীত হয়েছেন, কারাভোগ করেছেন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে। তার প্রত্যক্ষ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ অভিজ্ঞতা, ৩০ এর যুব বিদ্রোহ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ৪৩ এর মন্বন্তর, ৪৬ এর সামপ্রদায়িক দাঙ্গা, ভারত বিভাগ ৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬ এর ৬ দফা আন্দোলন, স্বাধীনতার স্বপ্ন (পুত্রকে লেখা পত্রে), ভাণ্ডারী গানসহ তার সাহিত্যাকাশ ও অন্যান্য প্রকাশনায় সব কিছুর সক্রিয় গর্বিত উপস্থিতির ছাপ তাকে সবার থেকে আলাদা করেছে।
প্রায় দু–দশকে লেখা রমেশের ৩২৩টি মাইজভাণ্ডারী গান পাওয়া যায় ‘আশেক মালা‘ ‘শান্তির ভাস্তাব ‘মুক্তির দরবার‘ ‘নুরে দুনিয়া‘ ‘জীবন সাথী‘ ‘সত্য দর্পণ‘ ‘ভাণ্ডারে মাওলা‘ ও ‘মানব বন্ধু‘তে। এ ছাড়া দরবারী ঘরানার বিধায় এসকে সিরাজিয়া‘কেও হিসাবে আনলে ৪০০ এর মত গান, আর মরমী ধারার গানগুলোকে হিসাবে আনলে অর্ধ সহস্রাধিক হয়। তিনি তাঁর গানগুলোর সুর, তাল, লয় ও বিধৃত করেছেন প্রতিটি সৃষ্টিতে। রমেশ তাঁর কবিয়াল সত্তা, তুঙ্গ জনপ্রিয় কবিয়াল পরিচিতি, লেখার গুণগত মান, আশেকের মনকাড়া আবেগপূর্ণ শব্দ বিন্যাস–এতদিনের মাইজভাণ্ডারী ভক্তিগীতি, সাধন সংগীতকে লোকসংগীতের কাতারে এনে গ্রাম থেকে শহরে বোদ্ধাশ্রেণী তথা সুধী মহলে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করে তোলেন। তাছাড়াও সামাজিকভাবেও অসম্ভব সচেতন, সংবেদনশীল, প্রচণ্ড দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, অসামপ্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন বলে রমেশ কমিউনিস্ট আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন, বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, ৫২‘র ভাষ্য আন্দোলনে বিশ্বাসী ও সহযোদ্ধা ছিলেন বিধায় তাঁর লেখায় প্রত্যক্ষভাবে তার ছাপ অত্যন্ত সফলতার সাথে রেখে গেছেন, তাঁর অন্যান্য লেখায় ও পুস্তকে।
কবির শেষজীবন নিদারুণ অর্থকষ্টে কাটে। খাওয়া পরা দূরে থাক, অনেক সময় টাকার অভাবে চিকিৎসাও সময়মতো হতো না। বিভিন্ন আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন সরকার তার ভাতাও বন্ধ করে দিলে তিনি নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েন। এ অবস্থায় তিনি সংশ্লিষ্ট একজন সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদু ও বিদগ্ধজনের সাহায্য গ্রহণ করতে বাধ্য হন। যদিওবা মৃত্যুর পর তাঁর প্রিয় দেশ ২০০২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে‘ ভূষিত করে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা জানায়।
বিপদ থেকে উদ্ধারের সমূহ বিশ্বাসে মাইজভান্ডার গমনের পর থেকে তার সকল চিন্তা–চেতনায় কর্মস্পৃহায় দরবারের একটা প্রচ্ছন্ন আভায় কি তিনি প্রভাবিত? এমন কি তাঁর মৃত্যু দিনের সঠিক তারিখ মুর্শিদের ওফাতের পরের দিন নির্ধারণেও কি তার মধ্যে তাঁর ঐশী আলোর প্রভাব কার্যকর? ৬ এপ্রিল ১৯৬৭ সালের দিকে কবির অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়ে। কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু বাগেরহাটের ভাণ্ডারী ভক্ত ফকির আরশাদ আলী তালুকদার স্বপ্নে কবির শেষ সময়ের সংবাদ পেলে তাঁকে দেখার জন্য রমেশের বাড়ি চলে আসেন এবং স্বপ্নের কথা কবিকে বললে কবি বলেন, “বন্ধু, আজ ২২ চৈত্র, বাবা ভান্ডারী গেছেন, আমার দেহ ত্যাগের সময় আজ নয়, তুমি দরবারে উরসে চলে যাও।” দু‘বন্ধু একে অপরকে গভীর মমতায় চোখের জলে মুখে তুলে বিস্কিট খাওয়ান। পরদিন ২৩ চৈত্র দরবার থেকে আতর গোলাপজল নিয়ে পুনরায় ফকির আরশাদ আলী ফিরে এসে দেখেন বন্ধু দেহ ত্যাগ করেছেন, শবাসনে উপবিষ্ট। উপরোক্ত দুটো ঘটনা এবং তাঁর জীবনের চলমানতার প্রতিটি ধাপ উত্তরণ কি মাইজভাণ্ডার দরবারের করুণা ধন্য। ২০১৬ সালে প্রথম প্রকাশের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে চতুর্থ সংস্করণও ফুরিয়ে গেলে পাঠকের ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত হওয়ার নতুন ধারায় মাইজভাণ্ডারী একাডেমির আলোকধারা প্রকাশনী থেকে সম্পাদনার মাধ্যমে ‘রমেশ শীল মাইজভাণ্ডারী গান সমগ্র’–প্রকাশ করা হয়।
লেখক : প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ












