
ক. বৌদ্ধ নিদর্শন
রামকোট: কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে রামু উপজেলার অন্তর্গত রাজারকূল ইউনিয়নে অবস্থিত রামকোট বৌদ্ধবিহার ও বনাশ্রম। রামকোট বা রামুর কেল্লা এক দীর্ঘ ইতিহাস বহন করছে। আরাকানি শাসনামলে এই রামকোটে বসেই রামুর গর্ভনর পোমাজা রামু রাজ্য শাসন করতেন। পরবর্তী পর্যায়ে তা বৌদ্ধদের এবং পাশাপাশি হিন্দুদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। রামকোটে অবস্থিত ভবনটির শিল্পগুণ, টেরাকোটা, ইট–সুরকি, মূর্তির ভগ্নাবশেষ এবং পোড়ামাটির ফলক ইত্যাদি দেখে এটিকে বহু প্রাচীন বলে মনে করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননে আবিস্কৃত ময়নামতি ও পাহাড়পুরস্থ বৌদ্ধ প্রত্নস্থলের সঙ্গে এর যথেষ্ট সাদৃশ্য দেখা যায়। রামকোটের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস মতে, মহাভারতের বীর নায়ক শ্রী রামচন্দ্র ১২ বছর বনবাসে অবস্থানকালে ‘রামকাটরা’ বা রামকোট প্রতিষ্ঠা করেন। অনুরূপভাবে বৌদ্ধরা মনে করেন, মহামতি গৌতম বুদ্ধ রামুতে আগমন করেছিলেন। আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ধন্যবতীর রাজা চান্দ সুরিয়ার সময় সেবক আনন্দকে সাথে নিয়ে গৌতমবুদ্ধ ধন্যবতী আসেন। এখানে এক ধর্ম সম্মেলনে সেবক আনন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে আনন্দ! ভবিষ্যতে পশ্চিম সমুদ্রের পূর্ব পার্শ্বে পাহাড়ের উপর আমার বক্ষাস্থি স্থাপিত হবে। তখন এর নাম হবে ‘রাংউ’। রামকোটে স্থাপিত ধর্মচক্র প্রবর্তন মুদ্রায় বুদ্ধ মূর্তিটি বুদ্ধদেবের বক্ষাস্থি সম্বলিত বলে ধারণা করা হয়। বিহারের বর্তমান অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রজ্ঞাবংশ মহাথেরোর মতে, রামকোটের সধাতুক বড় বৌদ্ধ বিহার সম্রাট অশোকের দ্বারা স্থাপিত হয়েছে। সম্রাট অশোকের স্থাপিত ৮৪ হাজার ধাতুচৈত্যের একটি হলো এই রামুচৈত। এখানে খননকার্য চালানো হলে অনেক নতুন তথ্য উদঘাটিত হবে বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা।
রামুর সীমা বিহার বা দুয়াং চৌধুরীর কেয়াং: কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলাধীন ১৪নং ফতেখারকূল ইউনিয়নের লামা পাড়া গ্রামে ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এ বিহারটি অবস্থিত। এ অঞ্চল যখন আরাকান রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল তখন আরাকান রাজ আলী খাঁর (১৫৮০–১৬৬৫ খ্রি.) রাজত্বের প্রথম দিকে তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় টিন, কাঠ দিয়ে এ বিহারটি নির্মিত হয়। পরবর্তীকালে অষ্টাদশ শতকের প্রারম্ভে দুয়াং চৌধুরী নামক জনৈক রাখাইন জমিদার এ বিহারটি প্রথম সংস্কার করেন। আনুমানিক দুই শতক ভিটার ওপর (৫৪ ঢ ৩৬) ফুট আয়তাকৃতির ৬৭ ফুট উঁচু বর্তমান কাঠের কাঠোমোযুক্ত দ্বিতল বিহারটি নির্মাণ করা হয়। প্রাচীন বর্মী লিপিযুক্ত দুটি বৃহদাকার ঘন্টা এখানে সংরক্ষিত আছে। এ ঘন্টাকে কেন্দ্র করে এখানকার জীবনযাত্রা পরিচালিত হয়। এখানেই সম্ভবত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বুদ্ধমূর্তিটি রয়েছে। পিতলের তৈরি ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় প্রতিষ্ঠিত মূর্তিটির ডানবাহু থেকে বামবাহুর মাঝখানের বুকের দৈর্ঘ সাড়ে ৫ ফুট। নানা ধরনের আলপনা খচিত পাথরের ওপর উপবিষ্ট মূর্তিটি সত্যিই এক বিস্ময়। ৬ ফুট প্রশস্ত বেদির ওপর ১৩ ফুট উচ্চতার এই বিশাল মূর্তিটি সংস্থাপিত। এর উভয় পার্শ্বে সোনালী রং–এর কারুকার্য খচিত আসনে ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় আসীন ছোট শ্বেত পাথরের অনেকগুলো বুদ্ধমূর্তি আছে। এগুলোর কোনোটি ড্রাগনের ওপর উপবিষ্ট। আসনের চতুর্দিকে বিভিন্ন সুসমৃদ্ধ কারুকার্য দৃষ্ট হয়। এসব নিখুঁত ভাবগম্ভীর শিল্পকর্মগুলো কোনো নিপুণ আরাকানি শিল্পীর অপূর্ব সৃষ্টি বলে ধারণা করা হয়।
জাদী বা যাদি (প্যাগোড়া): কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ব্যতিরেকে অবশিষ্ট উপজেলাগুলোর মধ্যে এই ‘জাদী’ দেখা যায়। এগুলো ইট–সুরকি দিয়ে তৈরি কারুকাজ সম্বলিত কতগুলো স্তম্ভবিশেষ। এসব স্তম্ভকে কক্সবাজারের বার্মিজভাষী মগ (যারা নিজেদেরকে রাখাইন বলে পরিচয় দেয়) সম্প্রদায় ‘জাদী’ বা ‘যাদি’ অর্থাৎ ‘প্যাগোড়া’ বলে। এসব ‘জাদী’ কে, কখন নির্মাণ করেছিল তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জাদীগুলো অত্যন্ত সুনিপুণ ও শিল্পসম্মতভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো দেশী–বিদেশী পর্যটকদের অতি সহজে আকর্ষণ করে। ১৭৯০ সালের পর আরাকান হতে রাখাইনরা (মগ) এ অঞ্চলে পালিয়ে আসার পর এসব জাদী নির্মাণ করেছে বলে স্থানীয়রা অনুমান করেন। সংস্কৃত শব্দ চৈত্য থেকে জেদ/জাদী শব্দের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। সম্রাট অশোক বিভিন্ন স্থানে এরূপ চৈত্য বা স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন। কক্সবাজার জেলায় এরূপ কতটি জাদী আছে তার সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
অগ্গমেধা কেয়াং: চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার জেলা শহরে যাত্রার প্রবেশ পথে বঙ্গোপসাগরের তীর হতে প্রায় ৯০০ মিটার পূর্বদিকে বড় বড় গাছের ছায়াঘেরা একটি ছোট পাহাড়ের ওপর এ কেয়াংটি অবস্থিত। এ কেয়াং–এর বর্তমান অধ্যক্ষের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, সিউজানু নামের আরাকান দেশীয় এক ব্যবসায়ী আনুমানিক পাঁচশত বছর পূর্বে স্বধর্মীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করার নিমিত্ত এ কেয়াং প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি আরো জানান কেয়াংটি প্রথমাবস্থায় আরো ছোট ছিল। পরবর্তী সময়ে ক্যাপ্টেন কক্স সাহেবের বদান্যতায় এটিকে সম্প্রসারিত করা হয়। ৫০ী৪০ ফুট আয়তাকৃতির গৃহটি কারুকার্যখচিত গোলাকার কাঠের কলামের ওপর ছাদ সম্বলিত। প্রবেশ পথের ওপর বার্মিজ ভাষায় কাঠের খোদাইকৃত লিপিশৈলী রয়েছে। তবে তা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এ কেয়াং অভ্যন্তরে শ্বেত পাথর ও ব্রোঞ্জের তৈরি যার বেশিরভাগই বর্মী উৎসের। এখানে বুদ্ধমূর্তি এবং বর্মী হরফে ত্রিপিটকসহ কিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি আছে। মূর্তিগুলোর অধিকাংশ ভূমি স্পর্শমুদ্রায়। এগুলো বিভিন্ন আকৃতির হলেও কোনোটির উচ্চতা ৫ ফুটের বেশি নয়। ৩টি মূর্তি সিংহশয্যায় ও ১টি পরিনির্বাণ শয্যায়। ব্রোঞ্জের ও শ্বেত পাথরের তৈরি ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় দু’টি মূর্তি ড্রাগনের ওপর আসীন। কয়েকবার সংস্কারকৃত কেয়াংটির সর্বশেষ সংস্কার করা হয় ১৯৬৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর। তৎকালীন অধ্যক্ষ অগ্গ মহাপণ্ডিত প্রজ্ঞালোক মহাথের (১৮৭৯–১৯৭১) –এর স্মৃতি রক্ষার্থে এর নামকরণ করা হয় অগ্গমেধা কেয়াং।
মাথিনের কূপ: টেকনাফ উপজেলার থানার সম্মুখে অবস্থিত এই কূপটি কখন, কে খনন করেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। হতে পারে থানায় কর্মরত লোকজনের পানি পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য ব্রিটিশ সরকার এ কূপ খনন করান। তবে একটি অসাধারণ প্রেম কাহিনী অবলম্বনে এর নাম হয়ে যায় ‘মাথিনের কূপ’। বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক কলকাতার ধীরাজ ভট্টাচার্য নামে জনৈক ব্রাহ্মণ বংশীয় পুলিশ অফিসার টেকনাফ থানায় বদলী হয়ে আসেন। এ সময় টেকনাফের মগ জমিদার কন্যা মাথিন থানার সম্মুখস্থ কূয়া বা রিং ওয়েল হতে নিয়মিত পানি আনতে যেতেন। ঘটানাক্রমে উভয়ের মাঝে চোখা–চোখি হয় এবং কালক্রমে ধীরে ধীরে তা গভীর প্রেমে পরিণত হয়। জমিদার কন্যা মাথিন ও পুলিশ অফিসার ধীরাজ ভট্টাচার্যের নিখাদ প্রেমের ঐতিহাসিক নিদর্শন এই ‘মাথিনের কূপ’। গোত্র আভিজাত্যের প্রতিবন্ধকতায় ধীরাজ ভট্টাচার্য জমিদার কন্যা মাথিনকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু সুমধুর প্রেমের করুণ বিচ্ছেদে দানাপানি ছেড়ে দিয়ে প্রেমসম্রাজ্ঞী মাথিন তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করেন। শাশ্বত প্রেমের বিয়োগান্ত কাহিনীর স্মৃতি বিজড়িত এই মাথিনের কূপ আজও টেকনাফে আগত পর্যটকদের বিশেষ করে তরুণ–তরুণীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। সাধারণ একটি পাতকূয়া আজ মূল্যবান প্রত্ননিদর্শন হিসেবে পর্যবসিত।
খ. হিন্দু নিদর্শন
আদিনাথ মন্দির: কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার গোরকঘাটায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দির একটি মনোমুগ্ধকর প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। কয়েকশত বছরের প্রাচীন এ হিন্দু মন্দিরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ২৮৮ ফুট উপরে মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত। ৬৯টি সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠতে হয়। এটি একটি শিব মন্দির। প্রতিবছর শিবরাত্রির পর আদিনাথ মন্দিরকে কেন্দ্র করে এক সপ্তাহ ধরে বিরাট মেলা বসে। দেশী–বিদেশী হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর সমাবেশ ঘটে। বর্তমানের মূল ভবনটি শতাব্দীকাল প্রাচীন। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মহেশ চন্দ্র নামে মহেশখালীর একজন জমিদার বর্তমানের মন্দির ভবনটি নির্মাণ করেন। কারো কারো মতে, এজন্য দ্বীপটির নাম ‘মহেশখালী’ হয়েছে। আবার অনেকের মতে, শিব–এর অপর নাম ‘মহেশ’ এর নামানুসারে দ্বীপটির ‘মহেশখালী’ নামকরণ হয়েছে। ইস্ট–ইন্ডিয়া কোম্পানির রেকর্ডপত্রে দ্বীপটির নাম লেখা হয়েছে মুইশখাল (Moiscal)। আবার অনেকেই মনে করেন যে, স্থানীয়ভাবে মহিষকে ‘মুইশ’ বলা হয়। একসময় দ্বীপের বনাঞ্চলে প্রচুর ‘বন্য মুইশ’ ছিল। সে কারণে এর নামকরণ ‘মুইশখালী’ যা বিবর্তিত হয়ে মহেষখালী বা মহেশখালী হয়েছে।
কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সুনীতিভূষণ কানুনগো তাঁর A History of Chittagong গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলেন, মহেশখালী পূর্বে কক্সবাজার জেলার মূল ভূ–খণ্ডের সাথে সংযুক্ত ছিল। ১৫৬৯ সালের প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে এই অংশটি মূল ভূ–খণ্ড হতে আলাদা হয়ে যায়। আর সে কারণে ইউরোপিয়ানরা এটাকে ‘Mexal’ বা ‘বিচ্ছিন্ন দ্বীপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই ‘Mexal’ শব্দই ক্রমান্বয়ে Moiscal বা Mohesh Island বা Moheskhali Island হয়েছে। তিনি আদিনাথ মন্দির সম্পর্কে লিখেছেন : The Second important centre of Saivism in the district is the shrin of Adinath, situated in island of Moheskhali. The origin of the name of Adinath can be examined in light of the Tantrik works. Dr. Muhammad Shahidullah is not far from the truth to say that the Buddha of the Buddhist Tantrik works was transformed into Adinath (adi means first, the first of the Naths) in the Natha cult. Adinath, may also be identified with Adideva or Mohadideva of the Tantras. In Mohanivanara-tantra, Adinath is stated as the first guru.
বীর কমলার দীঘি: ‘বীর কমলার দীঘি’ চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নে অবস্থিত। কাকারা তথা কক্সবাজার জেলার কৃতী সন্তান সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুর রশিদ ছিদ্দিকী এই দীঘির পাড়ে একটি শিলালিপির কথা তাঁর গবেষণাগ্রন্থ ‘চট্টগ্রামী রোয়াইতত্ত্ব’ এ উল্লেখ করেছেন। তবে এ শিলালিপির পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পাঠোদ্ধার করা গেলে এ সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যেত। দুঃখের বিষয় শিলালিপিটি বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে ত্রিপুরার রাজকীয় ইতিহাস ‘রাজমালা’ তে এ দীঘির উল্লেখ আছে। রাজা ধন্যমানিক্যের শাসনামলে ১৪৩৬ শতাব্দে (১৫১৩–১৪ খ্রিষ্টাব্দ) ত্রিপুরা বাহিনী রোসাঙ্গ (আরাকান) আক্রমণ করে। ত্রিপুরা বাহিনী রোসাঙ্গেও রামু পর্যন্ত জয় করে। ১৫১৫ সাল পর্যন্ত এই বাহিনী আরাকানের ছত্রসিক পর্যন্ত অধিকার বিস্তার করে। রাজা ধন্যমানিক্য এ অভিযানের সেনাপতিকে ‘রোসাঙ্গ মর্দ্দন’ উপাধি দেন। তিনি বিজয়ের স্মারক হিসেবে একটি পুষ্করণী খনন করেছিলেন বলে রাজমালায় সাক্ষ্য পাওয়া যায়। রাজমালায় বর্ণিত হয়েছে –
“রাম্বু ছত্রসিক রাজা আমল করিল।
রসাঙ্গ জিনিয়া কিল্লা পুষ্কর্ণী খনিল”॥
এ থেকেই মনে করা হয় যে, ত্রিপুরা বাহিনী চকরিয়া দখল করে পুষ্করিণী খনন করেছিল। সেই পুষ্করিণীটি রাজা ধন্যমানিক্যের স্ত্রী কমলাদেবীর নামে নামকরণ করা হয়। সেটিই আলোচ্য ‘বীর কমলার দীঘি’। অতএব এই পুষ্করণী বা দীঘি ত্রিপুরার রাজা কর্তৃক আরাকান বিজয়ের স্মারক হিসেবে ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
গ. মুসলিম নিদর্শন
সাচী চৌধুরী মসজিদ: কক্সবাজার জেলা সদর থেকে প্রায় ২ কি.মি. দক্ষিণে ঝিলনজা ইউনিয়নের চৌধুরী পাড়ায় প্রায় তিনশত বছরের পুরনো এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি অবস্থিত। মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই প্রাচীন মসজিদটি স্থানীয়ভাবে গায়েবি বা পোটকা মসজিদ নামেও পরিচিত। এ মসজিদের নির্মাতা সাচী চৌধুরীর নামানুসারে স্থানীয় জনসাধারণ এটিকে সাচী চৌধুরী মসজিদ বলে অভিহিত করে থাকে। তবে কোনো শিলালিপি না থাকায় নামকরণের সুনির্ধারিত কোনো সূত্র নেই। এ সম্পর্কে বাংলার স্থাপত্য বা প্রত্নতত্ত্বের ওপর লিখিত কোনো বইতে উল্লেখ নেই। বাস্তব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এর একটি বিবরণ তুলে ধরা হলো।
সোনালী গম্বুজ ও সাদার মাঝে গোলাপী নকশায় অপরূপ এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও গঠন দৃষ্টিনন্দন। মসজিদের উত্তর পাশে রয়েছে বিশাল এক দীঘি। আয়তাকার মসজিদটির উত্তর–দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ২৩ ফুট এবং পূর্ব–পশ্চিমে প্রস্থ ১৫ ফুট ৩ ইঞ্চি। মসজিদের দরজা একটি, উচ্চতা ৫ ফুট। দুটি জানালার উচ্চতা সাড়ে ৪ ফুট, প্রস্থ ৩ ফুট। মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। প্রাচীন মসজিদটি ইট–সুরকি–চুন দ্বারা নির্মিত। এই মসজিদেও মাঝখানে রয়েছে একটি বড় গম্বুজ। গম্বুজটিন দু’পাশে ক্ষুদ্রাকার গম্বুজের মতো দু’টি গোলাকার বুরুজ আছে। মসজিদের চার কোণায় ৪টি অষ্টভুজাকৃতি বুরুজ রয়েছে যার দু’টি ভুজ দেয়ালের কোণায় ডুবন্ত এবং বাকি ছয় ভুজ বহির্দিক থেকে দৃশ্যমান। এই চারটি বুরুজের উপরই বলা যায় মসজিদের মূল ভিত্তি রচিত হযেছে।
সাচী চৌধুরী মসজিদের গঠনরীতি, স্থাপত্যশৈলী এবং অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ইটের ব্যবহার দেখলে বুঝা যায় যে, এটি পরবর্তী মোগল আমলের (Late Mughal Period) একটি মসজিদ। কোনো শিলালিপি না থাকায় এ সম্পর্কে হলফ করে কিছু বলা কঠিন। তবে বাংলার স্থাপত্যশিল্পে রাজকীয় মোগল রীতি (Imperial Mughal Style) এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামস্থ শায়েস্তাখানী রীতির অনেকটা ভিন্নতর এই মসজিদটি পরবর্তী মোগল আমলের স্থানীয় গঠন রীতি নির্দেশ করে। এতে অয়তাকার অষ্টকোণাকার বুরুজ বা ছাদের প্যারাপেট অতিক্রম করে উর্ধ্বগামী হয়েছে। এছাড়া সুনির্দিষ্ট চারটি প্যানেলের প্রতিটির পার্শ্বে দু’টি করে মোট ৮টি গোলাকার স্তম্ভ একইভাবে প্যারাপেট অতিক্রম করে উর্ধ্বগামী হয়েছে। বাংলার বিভিন্ন মফস্বল অঞ্চলে মোগল রীতির কথা লিখতে গিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদ এ. এইচ. দানী বলেন, “The three domed mosque is generally adopted, but the single dome is seen more commonly as it was cheaper to build them.” অতএব সাচী চৌধুরী মসজিদটি মোগল সাম্রাজ্যের সর্ব পূর্বপ্রান্তে স্থানীয় প্রতিনিধি কর্তৃক অষ্টাদশ শতাব্দীতে নির্মিত একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ।
ফজল কিউকের মসজিদ: কক্সাবাজার জেলার চকোরিয়া উপজেলার বর্তমান সুরাজপুর–মানিকপুর ইউনিয়নের মানিকপুর বাজার সংলগ্ন মাতামুহুরী নদীর তীরে শতাব্দী প্রাচীন এই মসজিদটি অবস্থিত। ১৫১৪ সালে ত্রিপুরার রাজা ধন্যমানিক্যের ছেলে রাজপুত্র রাজদাহার নারায়নের নেতৃত্বে আরাকান রাজার অধীনস্থ বর্তমান মানিকপুরসহ পাহাড়ী অঞ্চল দখল করে ত্রিপুরারাজ ধন্যমানিক্যের নামে গ্রামের নামকরণ করা হয় ‘মানিকপুর’। পরবর্তীতে গ্রামে মুসলিম বসতি গড়ে উঠলে এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও আধ্যাত্মিক সাধক ফজলুল করিম সিকদার ১৮৯০ সালে (মতান্তরে হিজরি ১৩২১) মোগল স্থাপত্যরীতি অনুসরণ করে ৩টি গম্বুজ ও ১২টি মিনার বা খিলান সম্বলিত উক্ত মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদের দেয়াল প্রায় ৩ ফুট চওড়া। ইটের সুরকির সাথে চুনা মিশিয়ে মসজিদের দেয়াল ও ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে তাঁর কবরও রয়েছে। বিভিন্ন সময় সংস্কার করতে গিয়ে মসজিদটি নির্মাণের সন–তারিখ মুছে গেছে। প্রাচীনকালে মানিকপুর গ্রামটি উপজাতীয় চাক ও চাকমা সম্প্রদায়ের লোকজন অধ্যুষিত এলাকা ছিল। ফজলুল করিম সিকদার এর পূর্বপুরুষরা এই এলাকায় আগমনের পরেই তাদের জমিদারির পত্তন হয়। চাক সম্প্রদায়ের লোকজন ফজলুল করিম সিকদারকে ‘কিউক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এরপর থেকেই তিনি ‘ফজল কিউক’ নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত মসজিদটি ‘ফজল কিউকের মসজিদ’ নামকরণ হয়। চাক ভাষায় ‘কিউক’ শব্দের অর্থ জমিদার। নদী ও পাহাড়ের নৈসর্গিক পরিবেশে অবস্থিত এ মসজিদটি কক্সবাজার জেলার পর্যটনেরও সম্পদ। প্রাচীনত্ব ও বিশেষ স্থাপত্যসমৃদ্ধ হওয়ায় এ মসজিদটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে।
শাহ্ ওমর (র.) এর মাজার: কক্সবাজার জেলার চকোরিয়া থানার পূর্ব পার্শ্বস্থ কাকারা ইউনিয়নে পাহাড়ের উপত্যকায় হযরত শাহ ওমর (র.) এর মাজার অবস্থিত। তিনি ইয়েমেনের বাসিন্দা ছিলেন এবং বিখ্যাত দরবেশ হযরত শাহজালাল (র.) এর সাতশ অনুসারীর একজন ছিলেন। তিনি ১৩৩৮ খিষ্টাব্দে সুলতার ফখর উদ–দীন মোবারক শাহ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ে সাহায্য করেছিলেন। ড. মুহাম্মদ এনামূল হকের মতে, তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও এ মহান যশস্বী সূফী চট্টগ্রামের বিখ্যাত ‘বার আউলিয়ার’ অন্যতম যিনি জেলার দক্ষিণাংশে ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার করেন। নোয়াখালি জেলার পরগণা উমরাবাদেও শাহ ওমর নামক সূফীর মাজার দেখা যায়। চকোরিয়া এবং নোয়াখালিতে শাহ ওমর নামে একই সূফী–সাধকের দুটি মাজার হতে পারে। যেমন হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর মাজার চট্টগ্রাম ও ইরানের বোস্তাম শহর দু’জায়গায় রয়েছে। পুরাকীর্তি হিসেবে নয় শুধু জনসাধারণের দর্শনীয় স্থান হিসেবে এটির গুরুত্ব রয়েছে। অনুরূপভাবে রামুতেও কুতুব আউলিয়ার মাজার রয়েছে।
উপরোক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারসহ সমগ্র জেলা বৌদ্ধ, হিন্দু ও মুসলিম আমলের নানাবিধ প্রত্নসম্পদে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই দিকটি যথাযথভাবে উন্মোচন, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ করা গেলে এখানে দেশ–বিদেশের পর্যটকদের আরও বেশি আকৃষ্ট করা সম্ভব হবে বলে মনে হয়।
তথ্যসূত্র: কক্সবাজার ফাউণ্ডেশন কর্তৃক সম্পাদিত, কক্সবাজারের ইতিহাস, ১৯৯০; মোঃ আখতারুজ্জামান, ‘আরাকানি মুসলিম জনগোষ্ঠীর উৎস ও ক্রমবিকাশ: একটি ঐতিহাসিক সমীক্ষা’ (১২০৪–১৭৮৫); ওয়াকিল আহমদ, বাংলায় বিদেশী পর্যটক, ২০০০; আবদুল হক চৌধুরী, প্রবন্ধ বিচিত্রা, ইতিহাস ও সাহিত্য, বাংলা একাডেমি, ১৯৯৫; মাহবুব–উল–আলম, চট্টগ্রামের ইতিহাস (পুরানা আমল), ১৯৬৫; শ্রীকালিপ্রসন্ন সেন বিদ্যাভূষণ সম্পাদিত, শ্রীরাজমালা, ২য় লহর, ১৩৩৭; Dr. Nazimuddin Ahmed, Discover the Monuments of Bangladesh, 1984; A. H. Dani, Muslim Architecture in Bengal, 1961; Syed Murtuza Ali, History of Chittagong, 1964; Muhammad Enamul Haq, A History of Sufism in Bengal, 1975; Suniti Bhushan Qanungo, A History of Chittagong, 1988।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যাংকার।












