এটিকে জলাবদ্ধতা বলা যাবে না, এটি সাময়িক জলজট

চাক্তাইসহ বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন কাজ পরিদর্শন শেষে এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ তোপের মুখে সিডিএ চেয়ারম্যান

আজাদী প্রতিবেদন | শুক্রবার , ১ মে, ২০২৬ at ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমএর তোপের মুখে পড়েছেন সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম। এসময় সিডিএ চেয়ারম্যানকে ‘সরকারের বিরুদ্ধে লোক’ বলেও মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী। গতকাল সকালে টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয়ে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন প্রতিমন্ত্রী। সেখানে উপস্থিত সিডিএ চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি তো প্ল্যানিং করে ষড়যন্ত্র করছেন। আপনি সরকারের বিরুদ্ধে লোক।’

তখন প্রকৌশলী নুরুল করিম প্রতিমন্ত্রীকে বলেন, শাহাদাত ভাই (সিটি মেয়র) আমাকে চেনে স্যার।’ এরপর প্রতিমন্ত্রী প্রতিউত্তরে বললেন, ‘শাহাদাত ভাই চিনলে কি হবে? চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৩৬টি ড্রেন (খাল)। প্রবলেমটা হয়েছে আপনাকে নিয়ে। মিডিয়ায় আপনার কোনো বক্তব্য নাই। আপনি বক্তব্য দেন না। আপনার বক্তব্য নেয় না, এটা কোনো কথা না। সাধারণ মানুষ রাগক্ষোভ ঝাড়ছে মেয়র শাহাদাতের ওপর।’

এর আগে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডারসহ বিভিন্ন সেবা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে মহেশ রেগুলেটর ও মহেশখাল কুমার রেগুলেটর এলাকা ঘুরে দেখেন। পরে বারেক বিল্ডিং মোড়, কোতোয়ালী মোড়, মেরিন ড্রাইভ, মরিয়ম বিবি, কলাবাগিচা, টেকপাড়া, চাক্তাই ও রাজাখালী খাল এলাকার চলমান কাজ পরিদর্শন করেন। এছাড়া শাহ আমানত সেতু সংযোগ সড়ক হয়ে বাকলিয়া এঙেস রোডের মোড়, চাক্তাই ডাইভারশন খাল, চন্দনপুরা, চকবাজার ফুলতলা ব্রিজ, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ ও প্রবর্তক মোড় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমও ঘুরে দেখেন তিনি।

চাক্তাই এলাকায় সাংবাদিকের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে পাঠিয়েছেন। এবং উনার কাছে যে খবর ছিল চট্টগ্রামে ব্যাপক জলাবদ্ধতা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে চব্বিশ সালের তেইশ সালের বিভিন্ন ছবি প্রকাশ করে একটা অপপ্রচার চালানো হয়েছে যে, চট্টগ্রাম মহানগর পানির মধ্যে ভাসছে। এই খবরে উনি সংসদে দাঁড়িয়ে চট্টগ্রাম নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারপরে সংসদেই তার কার্যালয়ে ডেকে উনি আমাকে নির্দেশনা দিয়েছেন যে, আপনি এক্ষুণি চট্টগ্রাম যান। এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও কর্তৃপক্ষগুলোকে নিয়ে বসে কী সমস্যা আছে, সমাধান করে তারপর আপনি ফিরবেন। তিনি বলেন, আমি গতকাল সন্ধ্যার পরে এসেছি ঘুরেছি। যেভাবে মিডিয়াতে নিউজটা এসছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও, এরকম জলাবদ্ধতা আমি এসে দেখিনি। এবং রাতে আমি বলেছি, চট্টগ্রাম পানির মধ্যে ভাসছে না। অনেকে ট্রল করে বলেছেন, মাননীয় মন্ত্রীর চশমার সমস্যা আছে। চোখে কম দেখে। কিন্তু আপনারা তো কাল থেকে আমার সাথে ছিলেন। আজকেও আছেন। আপনাদের কাছেও আমি প্রশ্ন রাখতে চাই। আজকে তো কোথাও আপনারা জলাবদ্ধতা দেখেননি।

এসময় সাংবাদিক ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আপনারা সজাগ, সচেতন ও খুব ট্যালেন্ট মানুষ। তবে এইটুকু অনুরোধ করি, শুকনা রাস্তাকে আপনারা ভাই চট্টগ্রাম বৃষ্টির মধ্যে ভাসছে এটা দেখাইয়েন না। তিনি আরও বলেন, হঠাৎ ৮০ থেকে ৯০ মিলিমিটার ভারী বৃষ্টি হলে স্বাভাবিকভাবেই পানি সরতে কিছুটা সময় লাগে। এটিকে জলাবদ্ধতা বলা যাবে না, এটি সাময়িক জলজট। প্রকৃত জলাবদ্ধতা তখনই বলা যায়, যখন তিনচার দিন পানি নেমে না যায়।

তিনি বলেন, নগরের ৩৬টি খালের মধ্যে কয়েকটি খালে উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় কিছু এলাকায় পানি জমেছিল। বিশেষ করে রিটেইনিং ওয়াল ও অস্থায়ী প্রতিবন্ধকতার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। তবে সিটি কর্পোরেশন, সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেড, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করেছে।

তিনি বলেন, বর্ষাকালের আগে আপাতত ড্রেন ও খাল উন্নয়নকাজ সীমিত রাখা এবং চলমান কাজের ব্যারিকেড ও রিটেনিং ওয়াল অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্ষা শেষে আবার উন্নয়নকাজ শুরু হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ উন্নতি হয়েছে। চলমান প্রকল্পের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হলে স্থায়ী সমাধান আরও দৃশ্যমান হবে। আগামী বর্ষা মৌসুমে চট্টগ্রামবাসীকে ২০২৪ সালের পরিস্থিতিতে ফিরতে হবে না।

তিনি বলেন, অস্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের নকশা অনুযায়ী খাল, সুইসগেট ও নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নয়ন করা হচ্ছে। স্বাভাবিক বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হবে না, যদিও অতিভারী বর্ষণে কয়েক ঘণ্টার জলজট তৈরি হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, চলমান খাল সংস্কার কাজের কারণে সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় ভোগান্তি তৈরি হলেও দীর্ঘমেয়াদে এ প্রকল্প নগরবাসীর উপকারে আসবে। পানি চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি পয়েন্টে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি ও ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের বাকি কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, কালকে আসার পরে আমি মেয়র সাহেবকে মজা করে বলছিলাম কিছু পানি নিষ্কাশনের পাম্প গাড়ির মধ্যে নেওয়ার জন্য। আমরা কোথাও যদি পানি পাই, নিজেরাই পানি নিষ্কাশন করে দিব। কিন্তু কাল থেকে আমরা ঘুরছি। পাম্পও আমাদের গাড়িতে আছে। কিন্তু আমরা কোথাও পাম্প ইউজ করতে পারিনি। এটাই বাস্তবতা। এই কথা নিয়েও অনেক কথা হবে। সিডিএ’র ব্যর্থতা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যর্থতা ওইভাবে বলব না। সিডিএ’র জনবলের ঘাটতি আছে। এবং সিডিএ’র কাজটা তো আমাদের সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড করছে। উনারা মনিটরিং করছে। আমাদের কিছু অর্থ ছাড়ের বিষয় আছে। কিছু জটিলতা আছে।

এর আগে দুপুরে নগর ভবনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রশ্ন যাদের করার কথা ছিল, তারা দেশ থেকে পালিয়েছে। প্রকল্প দিয়েছে আগের স্বৈরাচার, এই প্রকল্প দিয়েছে বিনা ভোটের সরকার। আমরা তার দায়ভার বহন করছি। আমাদের সরকারের মেয়াদ ৭৬৭৭ দিন। আমরা দিনরাত পরিশ্রম করছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে। কোথাও যদি অন্যায় হয়ে থাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি, সেই অনিয়মের বিচার হবে।

তিনি বলেন, প্রকল্প শেষ তো হয়ে যাওয়ার কথা ছিল জুনের মধ্যে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য পাঁচটা পয়েন্ট থেকে কাজ স্থগিত করে দিলাম। আপনাদের বাঁধ ও সরঞ্জাম উঠিয়ে ফেলেন। আমাদের প্রকল্প মেয়াদ আবার বাড়াতে হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হবে। ৩৬টি খাল সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার রাখা এবং সবসময় সচল রাখার জন্য ও যাতে ময়লা ফেলতে না পারে সেজন্য ‘নেটিং সিস্টেম’ করতে ডিপিপি প্রণয়নের নির্দেশ দিয়েছি।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় বৃদ্ধির বিষয়গুলো সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপের তথ্য সরকারের কাছে রয়েছে। কোথায় কী কারণে ব্যয় বেড়েছে কিংবা জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা আন্তঃমন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, প্রবর্তক মোড়, কাতালগঞ্জ, জামালখানসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকার কাজ এখনো চলমান রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে আবারও চট্টগ্রাম সফর করে খাল সংস্কার কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করব।

মেয়রের সভা : এদিকে গতকাল বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সভা করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এসময় তিনি বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সবগুলো সেবা সংস্থার সহায়তায় গত বছরে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০৭০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছে। ৩০ বছরের একটি সমস্যা সমাধানে আমরা সিডিএ, সেনাবাহিনী, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে কাজ করছি। সরকার কমিটি গঠন করে দিয়েছে। আমরা সবাই এক সাথে কাজ করলে ইনশাল্লাহ আগামী বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে বিশ্বাস করি।

এসময় সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম বলেন, জনগণের যে কষ্টটা হয়েছে, তার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত। এরমক কষ্ট হবে সেটা আমরা চিন্তা করিনি। কাজের প্রয়োজনে যেখানে যেখানে ব্লকেড ছিল সেটা আগামী ৫৭ দিনের মধ্যে সেনাবাহিনী উইথড্র করবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না
পরবর্তী নিবন্ধকালু শাহ ব্রিজে বড় ফাটল