দেশের রাষ্ট্রায়ত্ব একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল তা আবারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। প্রায় ১৩ বছর ধরে পরিকল্পনা, ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়ন জটিলতা এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে টানাপোড়নের পর প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার নতুন উদ্যোগ শুরু হলেও এবার প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক (পিএমসি) নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নতুন করে দরপত্র আহ্বান এবং শর্ত পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক নিয়োগের দরপত্র বাতিলের এই সিদ্ধান্তে প্রকল্পটি নতুন করে দীর্ঘসূত্রতায় পড়ল বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। ১৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধনের ক্ষমতা সম্পন্ন এই রিফাইনারি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালে। দেশে ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধনের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ফলে বাড়তি মূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির পরিমাণ এবং নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর বেশির ভাগ আমদানি করা হয় পরিশোধিত অবস্থায়। ক্রুড অয়েল থেকে রিফাইনড অয়েলের মূল্য চড়া। এতে দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে। ক্রুড অয়েল আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পেত।
বিপিসি বলেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে দেশে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। বিপুল অর্থ সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল পরিশোধনের ক্ষমতাসম্পন্ন ইস্টার্ন রিফাইনারি–২ নামে নতুন একটি রিফাইনারি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু নকশা প্রণয়ন, পরামর্শক নিয়োগ, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারেনি।
২০১৬ সালে প্রকল্পটির ব্যয় সংশোধন করে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ফ্রান্সের টেকনিপকে প্রকল্পের ফ্রন্ট–এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন (ফিড) প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই বছরের ১৯ এপ্রিল ভারতের ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডের (ইআইএল) সঙ্গে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে চুক্তি করে বিপিসি। তখন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তী বছরে প্রকল্পের ভৌত কাজ শুরু হবে। এজন্য ইস্টার্ন রিফাইনারির ২শ একর জায়গা থেকে ৭০ একর জায়গা আলাদা করে কিছু কার্যক্রমও চালানো হয়।
২০২২ সালের শেষ দিকে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সরকারি অর্থায়নের আওতায় ঋণ হিসেবে ১৬ হাজার ১৪২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা অনুমোদনের কথা জানানো হয়। বাকি অর্থ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার কথা ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প ব্যয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা প্রস্তাব করা হয়। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়নের প্রস্তাব ছিল ১৬ হাজার ৬৩৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা এবং বিপিসির নিজস্ব অর্থায়ন ৭ হাজার ১০০ কোটি ৮৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।
ইতোমধ্যে প্রকল্প ব্যয় আরো বেড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। পরিবর্তন করা হয়েছে প্রকল্পের নামও। ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পরিবর্তে ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)’ করা হয়। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট পুনর্গঠিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। প্রকল্পের অর্থায়নে দীর্ঘদিন ধরে থাকা সংকটও কেটে যায়। ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ১ দশমিক ০০৪ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে বলে ৩ সেপ্টেম্বর সরকারের সাথে চুক্তি করেছে। ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের পর সম্প্রতি আইডিবির একটি প্রতিনিধিদল ইস্টার্ন রিফাইনারি পরিদর্শন করে গেছেন। আইডিবির অর্থায়নের পাশাপাশি প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারেরও বড় অঙ্কের অর্থায়ন থাকবে।
প্রকল্পটির জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়। আহ্বান করা হয় আন্তর্জাতিক দরপত্র। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে বিশ্বের খ্যাতনামা ৫টি প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে যাচাই বাছাই করে শর্টলিস্ট করা হয়। প্রতিষ্ঠান ৫টি হলো থাইল্যান্ডের ফোস্টার হুইলার, তুরস্কের বিইআরআর ইন্ডাস্ট্রিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স ও সৌদি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগ, ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটিকে পরামর্শক নিয়োগের কথা ছিল।
কিন্তু ১৯ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে পাঠানো চিঠিতে চলমান দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণে নতুন করে আগ্রহপত্র আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হয়। ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আরও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরিকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। একই সঙ্গে পিএমসি নিয়োগের কার্যপরিধি বা টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
এতে প্রকল্পটি আবারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হলেও সূত্র বলেছে, নতুন করে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও পরামর্শক নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এতে সামগ্রিক বাস্তবায়ন কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে। আগে ৪২ দিন সময় দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এবার ২১ দিন সময় দেওয়া হবে। ফলে আগামী তিন মাসের মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ সম্ভব হবে বলে প্রকল্প পরিচালক আসমা আরা বেগম আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পরামর্শক নিয়োগের উদ্দেশ্যেই সম্ভবত দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। আগের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোরও নতুন দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রম চলমান থাকায় পিএমসি নিয়োগের এ পরিবর্তন পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় প্রভাব ফেলবে না।












