ইরানে কঠোর আঘাত হানব, যুদ্ধবিরতি বাতিল ঘোষণার পর ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

তেহরান পিছু হটবে না বা আত্মসমর্পণ করবে না : গালিবাফ । ৮০টি মার্কিন আঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার দাবি আইআরজিসির

আজাদী ডেস্ক | বৃহস্পতিবার , ৯ জুলাই, ২০২৬ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে একের পর এক পাল্টাপাল্টি হামলা, যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার ঘোষণা, নতুন সামরিক অভিযানের হুমকি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার দাবির মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠেছে।মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে বলে ঘোষণা দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ইরান কখনো পিছু হটবে না কিংবা আত্মসমর্পণ করবে না। একই সময়ে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, দক্ষিণ ইরানে ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সংঘাতের এ ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তুরস্কের আঙ্কারায় নেটো সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বুধবার (গতকাল) রাতেই ইরানের বিরুদ্ধে খুব কঠোর সামরিক আঘাত হানা হতে পারে। তিনি অভিযোগ করেন, ইরান প্রতিদিনই দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা লঙ্ঘন করছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হবে নাকি কূটনৈতিক আলোচনার সুযোগ থাকবেএ বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি। ট্রাম্প বলেন, শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে কিনা, তা তিনি জানেন না; প্রয়োজনে কোনো চুক্তি ছাড়াই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। আলোচনাকারী দলের প্রধান এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, আমরা পিছু হটা বা আত্মসমর্পণ করার পাত্র নই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেন, দাদাগিরি ও ব্ল্যাকমেইলের যুগ শেষ হয়ে গেছে এবং এ ধরনের চাপ প্রয়োগ করে ওয়াশিংটন কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। গালিবাফ আরও অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ, দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক হামলা, ইরানের জ্বালানি খাতে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযানএসবই দুই দেশের মধ্যে হওয়া ১৪ দফা সমঝোতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রই ধারাবাহিকভাবে চুক্তির শর্ত ভেঙে পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবির ইংরেজি চ্যানেল প্রেস টিভি নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো সামরিক হামলা হলে দেশটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের সামুদ্রিক চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। একই সূত্র আরও দাবি করেছে, ইরানের একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে জবাবে অন্তত দুটি লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে ইরান কোনো পার্থক্য করবে না। অন্যদিকে আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ‘মৃত্যু’ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইরানের এখন আরও স্পষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক ম্যান্ডেট তৈরি হয়েছে।

সামপ্রতিক সংঘাতের সূত্রপাত হয় হরমুজ প্রণালিতে ধারাবাহিক হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানায়, সোমবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রসদৃশ বস্তুর আঘাতে আগুনে পুড়ে যায়। পরদিন আরও দুটি তেলবাহী জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যায়। এসব হামলার দায় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে তারা ইরানের বিরুদ্ধে ‘একাধিক শক্তিশালী সামরিক অভিযান’ পরিচালনা করেছে এবং ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব হামলা ছিল যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের জবাব।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় গতকাল বুধবার ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানায়, তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান পরিচালনা করেছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রাথমিক জবাব হিসেবে বাহরাইনের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি, পোর্ট সালমান এবং কুয়েতের আলি আলসালেম বিমানঘাঁটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। একই অভিযানে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করা একটি এমকিউ৯ ড্রোন ভূপাতিত করারও দাবি করা হয়েছে। আইআরজিসির এই ঘোষণার আগে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় তারা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। একই সময়ে বাহরাইনে সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানোর খবরও পাওয়া যায়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এসব হামলায় ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে ইরানি সেনাবাহিনীর জনসংযোগ বিভাগ পৃথক এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, বাহরাইনের শেখ ইসা ঘাঁটিতে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনীর সমাবেশস্থলকে লক্ষ্য করে হামলাকারী ড্রোন ব্যবহার করে অভিযান চালানো হয়েছে।

সংঘাতের এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও সামনে আসতে শুরু করেছে। নেটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে ‘প্রয়োজনীয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে কাতার, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য আইআরজিসিকে দায়ী করেছে। যদিও তেহরান এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামলাগুলোর সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে।

সামরিক উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারেও পড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সর্বশেষ শিপিং তথ্য অনুযায়ী, অন্তত চারটি বড় তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার ঝুঁকি এড়িয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করে মাঝপথ থেকেই ফিরে গেছে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধসংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের রায় আজ
পরবর্তী নিবন্ধটানা বর্ষণে বিপর্যস্ত খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি