আলহাজ্ব্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী (রহ.)

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান | রবিবার , ৫ জুলাই, ২০২৬ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় জন্মগ্রহণকারী আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি হলেন আল্লাহর এমনই বিশেষ নিয়মাতপ্রাপ্ত ক্ষণজন্মাদের একজন। জন্মসূত্রে তাঁর মধ্যে ছিলো অসাধারণ মেধা ও প্রতিভা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা আরম্ভ করার পূর্বেই তিনি পৈতিৃক ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করলেও তাঁর মেধা, শ্রম, অধ্যবসায়, তীক্ষ্ণবুদ্ধি ও দূরদর্শিতা বলে জীবনের এক পর্যায়ে তিনি এক বিশেষ গুণধর ব্যক্তিত্বের মর্যাদায় আসীন হন। ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি তাঁর খোদাপ্রদত্ত অসাধারণ যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে যেতে সক্ষম হন। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের অগণিত অবদানের মাঝে অমর, স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন ও থাকবেন। উল্লেখ্য, তাঁর ওইসব গুণের সাথে সংযুক্ত হয়েছে তাঁর প্রতি আপন মুর্শিদ ও গাউসে যমানের কৃপাদৃষ্টি, যা তাঁর জীবনে এনে দেয় অকল্পনীয় পূর্ণতা।

১৯২২ ইংরেজি মোতাবেক ১৩৭৪ হিজরিতে আলহাজ্ব্ব নূর মুহাম্মদ আলক্বাদেরী বাকলিয়ার এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত ও ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি পৈতিৃক ক্ষুদ্র ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রয়াসী হন। অল্প সময়ে তিনি পুরো চট্টগ্রামে এক সফল ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি বক্সিরহাট মার্চেন্ট ডিফেন্স কমিটির সভাপতি, চট্টগ্রাম শিল্প ও বণিক সমিতির সম্মানিত সদস্য, চট্টগ্রামের ভোজ্য তৈল ও তুলা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাস্ট সদস্য হিসেবে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ী পরিমন্ডলে খ্যাত হন। এমনকি তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ব্যবসায়ীদের দাবীদাওয়া আদায়ে মূখ্য ভূমিকা পালন করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, রাজনীতির অঙ্গনেও তিনি এক বিশেষ পদমর্যাদায় আসীন হন। তিনি ছিলেন জন দরদী, প্রসিদ্ধ সমাজ সেবকও। তিনি জমিয়তুল ফালাহ্‌ জাতীয় মসজিদের বোর্ড অফ গভর্নরস্‌ এর সদস্য ও হজ্জ্ব কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি নিজে যেমন জ্ঞানপিপাসু ছিলেন, তেমনি সমাজে জ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারের গুরুত্বকে যথাযথভাবে অনুভব করেছেন। সুতরাং তিনি চট্টগ্রাম শহর এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হন। তিনি লামাবাজার, চরচাক্তাই বালক উচ্চ বিদ্যালয়, গুলজার বেগম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং বাকলিয়ার প্রসিদ্ধ ফোরক্বানিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মূল ও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সর্বোপরি এশিয়া বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া (চট্টগ্রাম), জামেয়া ক্বাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া (ঢাকা) এবং হালিশহর ও চন্দ্রঘোনা মাদ্‌রাসাসহ বহু দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কায়েমের ক্ষেত্রে সর্বাধিক অবদান রাখেন এবং এগুলোর আজীবন অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

আলহাজ্ব্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী উপমহাদেশের সুপ্রসিদ্ধ মুর্শিদে বরহক্ব আওলাদই রসূল হযরতুল আল্লামা হাফেয ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্‌ সিরিকোটি (ওরফে হযরত পেশোয়ারী সাহেব) আলায়হির রাহমাহ্‌র হাতে বায়’আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর সান্নিধ্যে অতি অল্প সময়ে ‘ফানাফিশ্‌ শায়খের’ মর্যাদায় উন্নীত হন। তিনি শরীয়ত, ত্বরীকত, বিশেষত আহ্‌লে সুন্নাত ওয়াল জামা’আতের নিষ্ঠাপূর্ণ খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন।

সিলসিলাহ্‌ই আলিয়া ক্বাদেরিয়া সিরিকোটিয়ার জন্য তিনি যে অসাধারণ অবদান রাখেন, তা চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এরই অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় এতে যে, তাঁর মহান মুর্শিদের সুযোগ্য উত্তরসূরী মাদারাযাদ ওলী মুর্শিদে বরহক্ব সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্‌ (রাহমাতুল্লাহি তা’আলা আলাইহি) তাঁকে খিলাফতের মহা মর্যাদায় আসীন করেছিলেন। তাছাড়া তাঁর নামের সাথে ‘সওদাগর’ এর স্থলে ‘আলক্বাদেরী’ও শোভা পেতে থাকে। আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী আপন মুর্শিদে বরহক্বের আনুগত্য তথা ত্বরীকত জগতের এক অনন্য উদাহরণ। আন্‌জুমানের তিনি সর্বপ্রথম সহসভাপতি নিযুক্ত হন। তিনি বলুয়ারদিঘি পাড়স্থ নিজ বাসভবনের পূর্ণ এক তলা খানক্বাহ্‌ শরীফের জন্য ওয়াক্বফ করে দেন ও নিজ খরচে পরিচালনা করেন। জামেয়া প্রতিষ্ঠার সময়ও তিনি আপন মহান মুর্শিদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর ক্ষেত্রে বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। জামেয়া প্রতিষ্ঠার পরামর্শ সভায় বাঁশবেড়া ও টিনের ছাউনী কিংবা সেমি পাকা ঘর তৈরীর প্রস্তাবাবলী উপস্থাপিত হলে হুযূর ক্বেবলা তাতে রাজি হননি। হুযূর ক্বেবলার ইচ্ছা যে প্রথম থেকেই জামেয়া একটি মনোরম পাকা দালানেই প্রতিষ্ঠিত হোক সেটা আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী সহজেই অনুমান করতে পেরেছিলেন এবং তিনি সাথে সাথে প্রস্তাব দিয়েছিলেন জামেয়ার জন্য পাকা দালানই হবে আর যাবতীয় রডসিমেন্ট তিনিই প্রদান করবেন। এতে হুযুর কেবলা অত্যন্ত খুশী হন এবং বিশেষভাবে দো’আ করেন। আর আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী আজীবন জামেয়াআনজুমানের সর্বোচ্চ খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যান। তাছাড়া হুযূর ক্বেবলা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্‌ (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামেয়া কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া (ঢাকা)’র প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর জশনে জুলুসের প্রবর্তনের গোড়ায়ও আলহাজ্ব নূর মোহাম্মদ আলকাদেরীর ভূমিকা চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রবর্তিত বিশাল জশনে জুলুসের প্রথম দু’ বছর তিনিই নেতৃত্ব দেন।

ত্বরীকতের ক্ষেত্রে আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী সমস্ত পীর ভাইদের নয়নমণি ছিলেন। তাঁর সুন্নাত সম্মত চলাফেরা, লেবাসপোষাক ও অমায়িক ব্যবহার, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, খোদাপ্রদত্ত বাগ্মিতা ও সাবলীল ভাষার মুনাজাত পরিচালনা ইত্যাদিতে অগণিত নারীপুরুষ হুযূর ক্বেবলার এ মহান ত্বরীকতের অমীয় সুধাপানে তৃপ্ত হতে পারতেন। তদ্‌সঙ্গে তিনি জামেয়ার সম্মানিত শিক্ষকগণ ও ছাত্রদের পরম বরণীয় ও স্নেহবৎসল মুরুব্বী ছিলেন। তিনি সকলের নিকট শুধু শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন না বরং সকলের হৃদয়ে অকৃত্রিম ভালোবাসার স্থানও করে নিয়েছিলেন, যা তাঁর হৃদয়বিদারক ইন্তিকালের সময় প্রকাশ পেয়েছিলো।

আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ আলকাদেরী ১৯৭৯ সাল মোতাবেক ১৪০০ হিজরির ১৯ মহররম ইহজগতের মায়া ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমান। তাঁর ইন্তেকালের সাথে সাথে অগণিত পীরভাইবোন, সর্বস্তরের জনসাধারণ ও জামেয়ার ছাত্রশিক্ষকের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। সেদিন তাঁকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য এবং তাঁর নামাযে জানাযায় শরীক হবার জন্য অগণিত মুসল্লী অশ্রুসিক্ত নয়নে ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁর বাসভবন এলাকায় সমবেত হন। জামেয়া ময়দানে অনুষ্ঠিত বিশাল জানাযা নামাযের পর তাঁকে জামেয়ার পাশেই সমাধিস্থ করা হয়। এখানে তাঁর মনোরম সমাধি রয়েছে যাতে অগণিত মুসলমান নিয়মিত যিয়ারত করে ধন্য হন।

তাঁর অগণিত অসাধারণ অবদানের কারণে ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে অবস্থানরত অগণিত মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়ও অতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাপূর্ণ বিশেষ স্থান করে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে শাহেনশাহে সিরিকোট ও তাঁর বরকত মণ্ডিত উত্তরসূরী হুযূর ক্বেবলাগণের অদ্বিতীয় প্রিয়ভাজন ছিলেন এ পরম সৌভাগ্যবান ব্যক্তিত্ব। পরম করুণাময় আল্লাহ্‌ জাল্লাশানুহু তাঁকে রা’ফে দরাজাত দান করুন, জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমীন। দুনিয়া আখিরাতের সাফল্য কামনায় আমরা যেন তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পথ চলি, এ হোক আমাদের প্রতিজ্ঞা, নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও লক্ষ লক্ষ পীর ভাইবোন তথা নবী প্রেমিকদের মনে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন যুগ যুগ ধরে।

লেখক: গবেষক, অনুবাদক ও মহাপরিচালক

আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধদেশ হতে দেশান্তরে
পরবর্তী নিবন্ধসমকালের দর্পণ