বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড–এই দুই নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হলেই ফুটবল ইতিহাসের অসংখ্য স্মৃতি ফিরে আসে। ১৯৬৬–এর বিতর্ক, ১৯৮৬–তে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল, ১৯৯৮–এর বেকহ্যামের লাল কার্ড–প্রতিটি অধ্যায়ই এই দ্বৈরথকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
আজ সেই ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে নতুন একটি অধ্যায়। আজ বুধবার দিবাগত রাত ১টায় (বাংলাদেশ সময়) আটলান্টায় বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপিয়ান শক্তি ইংল্যান্ড। ম্যাচটি শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, অনেকের কাছে এটি লিওনেল মেসির আরেকটি বড় পরীক্ষা। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেন সময়কে হার মানাচ্ছেন। পুরো টুর্নামেন্টে তার নেতৃত্ব, গোল করার ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার বলা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ম্যাচটিকে উপস্থাপন করছে ‘মেসি বনাম ইংল্যান্ড’ এবং ‘মেসি বনাম বেলিংহ্যাম’–এর লড়াই হিসেবে। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এটি হবে মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম ম্যাচ। তাই ব্যক্তিগতভাবেও এটি তার জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। ম্যাচের আগে মেসি বলেছেন, শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে পারাটা বিশেষ অনুভূতির।
আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচ মানেই আবেগের বিস্ফোরণ। ফুটবলের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই লড়াই বহুবার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও তৈরি করেছে। তবে এবার দুই দলের কোচই অতীতকে পাশে রেখে বর্তমানের ফুটবলেই মনোযোগ দিতে চাইছেন। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইতিহাস ম্যাচ জেতায় না; মাঠে ভালো খেলাই সবকিছু নির্ধারণ করবে। একই সুর মেসির কণ্ঠেও।
১৯৬৬’র বিতর্কিত কোয়ার্টার ফাইনাল : ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলাইন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিওকে লাল কার্ড দেখান। তিনি ইংরেজি বুঝতেন না, আবার রেফারির সিদ্ধান্তও মানতে চাননি। প্রায় ১০ মিনিট মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান তিনি। পরে জিওফ হার্স্টের গোলে ১–০ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড এবং শেষ পর্যন্ত প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ জেতে। তবে সেই লাল কার্ডকে আর্জেন্টিনায় আজও অন্যায্য সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়।
‘হ্যান্ড অব গড’ ও শতাব্দীর সেরা গোল : ১৯৮৬ সালে মেঙিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি। ম্যাচের ৫১ মিনিটে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে লাফিয়ে উঠে হাত দিয়ে বল জালে পাঠান। রেফারি গোলের বাঁশি বাজান। পরে ম্যারাডোনা এটিকে আখ্যা দেন, ‘ঈশ্বরের হাত’ (হ্যান্ড অব গড)। মাত্র চার মিনিট পর তিনি নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচজন খেলোয়াড় ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে অসাধারণ একক নৈপুণ্যে গোল করেন। ফিফা পরে এই গোলকে বা শতাব্দীর সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ২–১ ব্যবধানে জিতে এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপও জিতে নেয়।
১৯৯৮তে বেকহ্যামের লাল কার্ড : ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আবারও মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে ডেভিড বেকহ্যাম আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার দিয়েগো সিমিওনের ফাউলের শিকার হওয়ার পর মাটিতে শুয়ে পা দিয়ে সিমিওনেকে আঘাত করেন। রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান। ১০ জনের ইংল্যান্ড ২–২ সমতায় ম্যাচ শেষ করলেও টাইব্রেকারে ৪–৩ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়। সেই লাল কার্ডের জন্য দেশে ফিরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন বেকহ্যাম। পরে অবশ্য ২০০২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে জয়সূচক গোল করে তিনি অনেকটাই সেই তিক্ত স্মৃতি মুছে দেন।
এদিকে, এবারের আসরে আর্জেন্টিনার সেমিফাইনালে ওঠার পথ মোটেও সহজ ছিল না। শেষ ষোলোতে মিশর, কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড; দুই ম্যাচেই অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পাওয়ার পর স্কালোনি স্বীকারও করেছেন, ভাগ্য কিছুটা তাদের পক্ষেই ছিল। অন্যদিকে ইংল্যান্ডও কম কঠিন পথ পাড়ি দেয়নি। নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে জয় এনে দিয়েছেন জুড বেলিংহ্যাম। পুরো টুর্নামেন্টে হ্যারি কেইন ও বেলিংহ্যামই ইংল্যান্ডের আক্রমণের মূল ভরসা হয়ে উঠেছেন।
বিশ্বজুড়ে বিশ্লেষকদের মতে, ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে। একদিকে থাকবেন মেসি, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেঙিস ম্যাক অ্যালিস্টার। অন্যদিকে বেলিংহ্যাম, ডেকলান রাইসদের নিয়ে শক্তিশালী ইংল্যান্ড। মেসি যদি নিজের স্বাভাবিক জায়গা ছেড়ে নিচে নেমে খেলার সুযোগ পান, তাহলে ইংল্যান্ডের রক্ষণকে বড় পরীক্ষায় পড়তে হতে পারে। আর ইংল্যান্ড চাইবে শুরু থেকেই তাকে ঘিরে রেখে আক্রমণের ছন্দ নষ্ট করতে।
এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাদের ঐতিহ্যবাহী আকাশি–সাদা ডোরাকাটা জার্সি নয়, নীল অ্যাওয়ে জার্সি পরে মাঠে নামবে। আর্জেন্টাইন সমর্থকদের বড় একটি অংশ বিশ্বাস করেন, এই জার্সি সৌভাগ্যের প্রতীক। যদিও জার্সি নির্বাচনের পেছনে টুর্নামেন্টের কিট–সংক্রান্ত নিয়মও ভূমিকা রেখেছে।
একসময় হ্যারি কেইনকে ঘিরেই আবর্তিত হতো ইংল্যান্ডের আক্রমণ। এবার তার পাশে উঠে এসেছেন জুড বেলিংহ্যাম। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই বড় ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠা এই মিডফিল্ডারকে অনেকেই ইংল্যান্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে দেখছেন।
কাগজে–কলমে দুই দলের শক্তির পার্থক্য খুবই সামান্য। একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অভিজ্ঞতা ও মেসির জাদু, অন্যদিকে ইংল্যান্ডের গতি, শারীরিক শক্তি এবং তরুণদের আত্মবিশ্বাস। ৯০ মিনিট, অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকার–যেভাবেই হোক, একজন জিতবে, অন্যজনের স্বপ্ন শেষ হবে। আর ফুটবল বিশ্ব অপেক্ষা করছে, আজকের রাত কি হবে মেসির আরেকটি মহাকাব্যিক অধ্যায়ের? নাকি ইংল্যান্ড লিখবে নতুন ইতিহাস?










