ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক জৌলুস আর আগের মতো নেই। বহুমুখী সংকটে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে বাজার। এক সময় খাতুনগঞ্জ থেকে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ হলেও গত ১৫–২০ বছর ধরে সেটি কমতে শুরু করেছে। বিশেষ করে সরু সড়কে নিত্য যানজট, অবকাঠামোগত সমস্যা এবং চেক প্রতারণাসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর টাকা মেরে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। শুধু তাই নয়, বিগত কয়েক দশকে খাতুনগঞ্জ থেকে অনেক বড় বড় শিল্প গ্রুপ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নানা সমস্যার কারণে খাতুনগঞ্জে ব্যবসা কমে গেছে। এছাড়া শত শত বছর ধরে চলে আসা মৌখিক বিশ্বাসের ওপর লেনদেনের সংস্কৃতিতেও ধরেছে বড় ফাটল। অন্যদিকে বর্তমানে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের বড় দারোগা হাটের ওজন নিয়ন্ত্রণ স্কেলের কারণে অনেক আমদানিকারকরা নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এবং যশোর নওয়াপাড়াতে পণ্য আনলোড করছেন। আগে এক সময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি সব পণ্য চাক্তাই খাতুনগঞ্জে আসতো। তারপর সেখান থেকে নৌপথে এবং সড়কপথে আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় যেত। এখন সেই সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙ্গে পড়েছে।
জানা গেছে, খাতুনগঞ্জে বাপ দাদার আমল থেকেই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এই বাজারের ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু এরমধ্যে নিয়মিত বিরতিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর পাওনা টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন চাক্তাই খাতুনগঞ্জে বিশ্বাসের বাণিজ্য বিশেষত্ব হারাচ্ছে, আবার বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চাক্তাই খালের কর্ণফুলী মোহনায় জোয়ারের পানি ঠেকাতে নির্মিত স্লুইচ গেট বড় নৌকা প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে কর্ণফুলী মোহনায় ছোট নৌকায় করে পণ্য আনলোড করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীদের পরিবহন খরচও বাড়ছে।
খাতুনগঞ্জের প্রবীণ ব্যবসায়ী এবং বিএসএম গ্রুপের কর্ণধার আবুল বশর চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, সংকীর্ণ সড়ক ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ থেকে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে গেছেন। এক সময় এখানে পারটেঙ গ্রুপ, পিএইচপি গ্রুপ, টিকে গ্রুপ, ইলিয়াছ ব্রাদার্স, মোস্তফা গ্রুপ, এস এ গ্রুপ, শাহ আমানত গ্রুপসহ কর্পোরেট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু যুগের সাথে তাল মিলিয়ে খাতুনগঞ্জের আধুনিকায়ন না হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা তাদের প্রতিষ্ঠান অন্যত্র স্থানান্তর করতে বাধ্য হন। এছাড়া ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেলের কারণে পণ্য পরিবহনে খরচ বেড়ে গেছে। তাই অনেক আমদানিকারক এখন লাইটার জাহাজে করে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এবং যশোর নওয়াপাড়াতে পণ্য আনলোড করছেন। আগে এক সময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি সব পণ্য চাক্তাই খাতুনগঞ্জে আসতো। তারপর সেখান থেকে নৌপথে এবং সড়কপথে আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় যেত। এছাড়া খাতুনগঞ্জ থেকে নৌপথে বাণিজ্যও কমে গেছে। চাক্তাই খালের কর্ণফুলী মোহনায় স্থাপিত স্লুইচ গেট দিয়ে বড় নৌকা প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে আলাদা গাড়ি দিয়ে কর্ণফুলী মোহনায় বড় নৌকাতে লোড আনলোড করতে হচ্ছে। অপরদিকে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়িক পরিবেশও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। বিভিন্ন অব্যবসায়ী স্লিপের মাধ্যমে বেপরোয়া ট্রেডিং করছে। এতে নষ্ট হচ্ছে ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা। সব মিলিয়ে খাতুনগঞ্জের ব্যবসা বাণিজ্যের অবস্থা এখন মৃতপ্রায়।
চাক্তাই খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, অবকাঠামোগত নানা সমস্যার কারণে চাক্তাই খাতুনগঞ্জ থেকে ব্যবসা বাণিজ্য কমে যাচ্ছে। এছাড়া যানজট তো লেগে আছেই। ফলে অনেক গাড়ির চালক চাক্তাই খাতুনগঞ্জে আসতে চান না। যারা আসতে রাজি হয়, তারা আবার অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে। বিশেষ করে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওজন স্কেলের কারণে পণ্য পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু বক্কর দৈনিক আজাদীকে বলেন, খাতুনগঞ্জের বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থা খুবই শোচনীয়। দিন দিন ব্যবসা কমে যাচ্ছে। চোরাইপথে ভারত থেকে এলাচ, জিরাসহ বিভিন্ন পণ্য অবাধে আসার কারণে প্রকৃত আমদানিকারকরা এখন আর পণ্য আমদানি করছেন না। এছাড়া ওজন স্কেলের কারণে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা একটি ট্রাকে ১৩ টনের বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারছে না। এতেও চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এর বাইরে খাতুনগঞ্জের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া কিছু ভাসমান ব্যবসায়ী বর্তমানে বেপরোয়া ট্রেডিং করছে, এতেও প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অপরদিকে মৌখিক বিশ্বাসই ছিল খাতুনগঞ্জের লেনদেনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বছরের পর বছর এই প্রথাই চলে আসছিল। কিন্তু টানা কয়েকটি প্রতারণায় ঘটনায় সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। ফলে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস আগের জায়গাতে নাই। দেখা যায়, একজনের বাকিতে পণ্য নেয়ার সক্ষমতা আছে ৫ লাখ টাকার, তাকে বাকি দেয়া হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা। এতে কোনো কারণে পণ্যের দরপতন হলে ওই ব্যবসায়ীর পক্ষে লোকসান সামাল দেয়া কঠিন হয়ে যায়। তখন এক পর্যায়ে সেই ব্যবসায়ী টাকা মেরে দেয়ার পরিকল্পনা করে। এতে টাকা মেরে লাপাত্তা হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।












