যেন ভুলে না যাই : অনেকে বলতে সঙ্কোচ বোধ করতে চান না মোটেই যে, নবী করিম সাল্ল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মতই মানুষ। নবীর নাম উচ্চারণ করার সাথে সাথে দরুদ পাঠ করার বাধ্যবাধকতার কথা বলতেও তাদের কিন্তু খুব একটা দেরি হয় না। কারণ বিশ্বাসী মানুষদের মধ্যে সে–ই সবচেয়ে কৃপণ যে নবীর নাম বললে বা শুনলে নির্দিষ্ট দরুদ পড়ে না। আমাদের/ তোমাদের নামের পরে কি দরুদ পড়া হয়? তাহলে নবী আমাদের মতো মানুষ বলতে দ্বিতীয়বার চিন্তা করার কথা আমরা যেন ভুলে না যাই।
কোরআন ও আয়াত শরীফ : আল্লাহ কোরআনকে গ্রহণ করার জন্য আকাশের কাছে পেশ করেছেন, ভয়ে আকাশ তা গ্রহণ করতে বিনীতভাবে অপারগতা জানিয়েছে। পাহাড়ের কাছে কোরআন পেশ করা হলে পাহাড়ও ভয়ে কম্পিত হয়েছে, জানিয়েছে তার অক্ষমতা। অথচ সে কোরআন গ্রহণ করেছেন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর অন্তর আকাশের চেয়েও বিশাল ও ভারী, পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী। পবিত্র কোরআন শরীফে ৬২৩৬টি আয়াত আছে। সব আয়াত নাযিল হয়েছে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওপর। আমাদের কারো কাছে কি ওহী এসেছে? ফেরেশতাদের সরদার তাঁর কাছে যাওয়া আসা করেছেন হাজার হাজার বার। ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন ও জানতেন তাঁরা একজন অন্যজনকে। আমাদের দু’কাঁধে যে দু’জন সম্মানিত লেখক ফেরেশতা আছেন, আমাদের ভালো মন্দ সবকর্ম লিপিবদ্ধ করতে, তাঁদেরকেও কি আমাদের কেউ কোনোদিন প্রত্যক্ষ করেছে? তাহলে নবীকে নিজেদের মতো মানুষ বলার সাহস আমাদের আসে কোন উৎস হতে?
সর্বপ্রথম সৃষ্টি : মহান আল্লাহতায়ালা ছিলেন গুপ্তভাণ্ডার। তিনি যখন প্রকাশিত হতে চাইলেন তখন সর্বপ্রথম সৃষ্টি করলেন নুরে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। হযরত আদম আলাইহিস সালাম যখন মাটি ও পানির মাঝামাঝি অবস্থান করছিলেন তখন থেকেই তিনি নবী ছিলেন। হযরত জিবরিল আলাইহিস সালাম ফেরেশতাদের সরদার। তিনি পয়দা হবার পর থেকে আল্লাহর নুরের পর্দায় একটি তারকা দেখতে পেয়েছিলেন। তারকাটি ৭০ হাজার বছর পর পর একবার উদিত হতো। তিনি এটাকে ৭২ হাজার বার দেখেছিলেন। ‘তারকাটি ছিলাম আমি’ বলেছেন তিনি নিজে। জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন আল্লাহর প্রধান ফেরেশতা। হযরত রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম–এর নুর হতে বাকী সব সৃষ্টি অস্তিত্বে এসেছে। সৃষ্টিতে তাঁর কোনো তুলনা আছে কি?
চরিত্রের পূর্ণতা সাধন : মানব চরিত্রের পূর্ণতা সাধনের জন্য তাঁর আবির্ভাব হয়েছে। ইনসানে কামিল তিনি। একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়া ও আখিরাতে যতটুকু সাফল্য অর্জন সম্ভব সবকিছু তিনিই অর্জন করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। জ্বীনরাও তাঁর অনুসরণ করতে বাধ্য। তাঁকে যারা গ্রহণ করেছে তারা আল্লাহর কাছে গৃহীত হয়েছে। যারা তাঁকে বর্জন করেছে নিগ্রহই তাদের পরিণতি। তাঁর ঘোষণাই আইন। আল্লাহর অমোঘ নির্দেশ: তিনি যা দেন তা যেন মানুষ গ্রহণ করে, তিনি যা নিষেধ করেন তা যেন বর্জন করে। কে বলতে পারে তিনি আমাদের মতো মানুষ?
মানবজাতির শিক্ষক : মানবজাতির শিক্ষক হয়ে এসেছেন তিনি। ‘এসেছেন’ বললে বিবরণ যথার্থ হয় না। বরং বলতে হয় তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছে। আর জ্বীন ইনসান সবাই তাঁর শিক্ষার মুখাপেক্ষি। তিনি মুখাপেক্ষি শুধু আল্লাহর। আল্লাহর ভালোবাসা পেতে হলে তাঁর অনুসরণ করতে হয়। যারা তাঁকে অনুসরণ করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন, তাদের গোনাহ মাফ করে দেন। এর কোনো বিকল্প নেই।
আল–আমীন আস সাদিক : পৃথিবীর ইতিহাসে আল–আমীন–বিশ্বাসী, আস–সাদিক– সত্যবাদী এ অভিধায় অভিষিক্ত হয়েছেন একজন মহাপুরুষ। প্রকাশ্য নবুয়তের দায়িত্ব পাননি তখন তিনি। কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির তরফ হতে এ বিষয়ে কোনো প্রস্তাব উত্থাপিতও হয়নি। তিনি নিজেও তা দাবি করেননি। সমাজের মানুষ যাদের সাথে ছিল তাঁর নিত্য চলাফেরা, উঠকবৈঠক, লেনদেন তারাই তাঁকে এ অভূতপূর্ব ও অভিনব উপাধি দিয়েছিল। এমন বিরল উপাধির মানুষ কি আমাদের মতো সাধারণ মানুষ? যারা সত্যের ছদ্মবেশে, স্বার্থের অনুরোধে, প্রয়োজনের খাতিরে মিথ্যার বোঝা বয়ে বেড়ায়? সত্যকে মিথ্যার আবরণে ঢেকে রাখে, জেনেশুনে সত্যকে গোপন করে? সুযোগ পেলেই করে আমানতের খেয়ানত? আর বলে তিনি আমাদের মতো মানুষ?
তাঁর জন্য অহরহ নাযিল হয় রহমত ও শান্তি : মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের নিয়ে তাঁর ওপর দরুদ প্রেরণ করেন। আল্লাহর অন্য কোনো আমল নেই। কোনো আমলের জন্য কারো বাধ্য নন তিনি। মুমিনদের প্রতি তাঁর নির্দেশ তারাও যেন নবীর প্রতি যথাযথ সালাম পেশ করে। এ নির্দেশ আম জনতার প্রতি দেয়া হয়নি। এ দায়িত্ব তাদের যাদের ঈমান নসীব হয়েছে। এ মোবারক নির্দেশ এসেছে শুধু ঈমানদারদের জন্য। আর কারো জন্য নয়। তাঁর নবুয়তী কর্তৃত্ব সৃষ্টির লয় অবধি থাকবে বহাল। পরকালে ‘ইয়া নফসি’ মাতমের সময় তাঁর উপস্থিতির অপরিহার্যতা উপলব্ধি করতে পারবে নেককার বদকার, আস্তিক নাস্তিক সবাই। তিনি কীভাবে হতে পারেন আমাদের মতো মানুষ? সাধারণ পাথর আর জমরুদ পাথর কি এক?
নবীর কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে : নবীর কণ্ঠস্বরকে ছাপিয়ে উঠতে পারবে না উম্মতের গলার স্বর। তাহলে তাদের সব সৎকর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে তাদের অজান্তে। সকল মুমিন মুসলমানদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে যাতে নবীকে সেভাবে ডাকাডাকি না করে যেভাবে নিজেদের মধ্যকার একজন অন্যজনকে ডাকাডাকি করে। যারা মনে করে নবী আমাদের মতো মানুষ তারা যেন এ ঝুঁকি নেয়ার সাহস দেখায় অন্তত জীবনে একবার। তখন তারা দেখতে পাবে কত ধানে কত চাল।
কাওসার : তাঁকে বদনসীব কাফিররা বলেছিল লেজকাটা, নির্বংশ। আল্লাহ তাঁকে দিয়েছেন কাওসার। কাওসার যাঁর অধিকারে কে হতে পারে তাঁর সমতুল্য? দেখতে ইচ্ছে করে সে সাহসী বেটার বুকের পাটা কত বড়? কোন্ মায়ের গর্ভে পয়দা হয়েছে তার, কোন্ বাপের ঔরসে? সে কি দোসর নয় মরদুদ শয়তানের? আল্লাহর পানাহ চাই বিতাড়িত শয়তান ও তার দোসরদের কাছ থেকে।
ওয়ারা ফা’না লাকা জিকরাক : আল্লাহ তাঁর স্মরণকে উর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। আল্লাহর কুদরতি হাত কত দীর্ঘ? তিনি যাঁকে উর্ধ্বে তোলেন কত উচ্চতায় হতে পারে তাঁর অবস্থান? তাঁর মর্যাদার লক্ষ যোজন দূরত্বে অবস্থান নিতে পারে কে আছে এমন এক দ্বিতীয় জন?
লেওয়াই-’য়ি হামদের পতাকা : কিয়ামতের কঠিন মুসিবতের সময় যখন ‘ইয়া নাফসি’–র চলবে নজিরবিহীন মাতম সেদিন লেওয়াই-’য়ি হামদের পতাকা থাকবে তাঁর হাতে। এজন্য তাঁর কোন অহঙ্কার নেই। যেদিন আল্লাহর জালালিয়তের সামনে সকল নবী রাসুল আলাইহিস সালাম পর্যন্ত থাকবেন সন্ত্রস্ত সেদিন কে করবেন মানবজাতির জন্য সুপারিশ আল্লাহর দরবারে? যেদিন হযরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম পর্যন্ত সবাই প্রকাশ করবেন মানবজাতির জন্য আল্লাহর সমীপে সুপারিশ করার বিষয়ে নিজ নিজ অপারগতা?
মাকামে মাহমুদ : কে হবেন সেদিন মাকামে মাহমুদের অধিকারী? সেদিন কে তাঁকে শিখিয়ে দেবেন আল্লাহর অভিনব প্রশংসার অশ্রুতপূর্ব বাণী? যে প্রশংসায় সন্তুষ্ট হয়ে কে বলবেন: ‘সিজদা হতে মাথা তোলো মুহাম্মদ। তুমি সুপারিশ করো, তোমার সুপারিশ কবুল করা হবে। তুমি যা ইচ্ছা চাও তোমার ইচ্ছা পূরণ করা হবে।’
মি’রাজ : দুনিয়ার বেবুঝ মানুষের কাছে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহায়েছেন তিনি। অসহায় মুহূর্তে শুধু নয় জীবনের প্রতিটি ক্ষণ ছিলেন তিনি আল্লাহর প্রতি রুজু। কোনোদিন বলেন নি তিনি, ‘প্রভু তোমাকে আমি দেখতে চাই।’ আল্লাহ নিজ উদ্যোগে তাঁর প্রিয় হাবিবকে ডেকে নিয়েছেন আরশ আজিমে। পাঠিয়েছেন বাহন ও অভ্যর্থনা করে নিয়ে যাওয়ার সাথী। সৃষ্টির প্রতিটি রহস্য জানিয়েছেন ও দেখিয়েছেন তাঁকে। সূষ্টিতে কে আছে তাঁর মত আরেকজন?
কারা বলতো তাঁকে আমাদের মতো মানুষ : তাঁর প্রতি যাঁরা ঈমান এনেছিলেন তাঁদের একজনও কখনো বলেন নি তিনি আমাদের মতো মানুষ। যারা ছিল কাফির, মুনাফিক, নাস্তিক যারা আল্লাহর একত্ববাদকে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি তারাই শুধু বলেছে তিনি আমাদের মতো মানুষ। নবুয়তের প্রমাণ চেয়েছে তারাই। তাঁকে উপস্থাপন করতে বলেছে মোজেজা। জানতে চেয়েছে অদৃশ্যের খবর। আল্লাহর ইচ্ছায় সব প্রমাণ পেশ করার পরও তারা ফিরে গেছে মিথ্যার দিকে। হেসে উড়িয়ে দিয়েছে সকল তথ্য উপাত্ত, তত্ত্ব ও প্রমাণ। বলেছে এ তো এক বিলকুল যাদু। জলজ্যান্ত তেলেসমাতি। শয়তানের হাত ধরে নেচেছে তারা, অন্তরে প্রবেশ করতে দেয়নি ঈমানের এক টুকরো রেশ। কুরআন তাদের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়নি। বলতে বলেছে,‘ আমি তোমাদেরই মতো মানুষ (যেমন তোমরা বলে থাকো) তবে আমার প্রতি অহি নাযিল হয়।’ সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশক বাক্যের শেষ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশের প্রতি সামান্য নজরপাত না করে প্রথম উচ্চারণ নিয়েই তারা শোরগোল শুরু করে দিয়েছে যাতে সত্যের আওয়াজ তলিয়ে যায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক।












