চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গড়ে ওঠা চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে ৩০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর চীনা দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামপ্রতিক চীন সফরের ফলাফল তুলে ধরতেই এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকার চীনা দূতাবাস। খবর বাংলানিউজের।
বিনিয়োগসংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে ইয়াও ওয়েন বলেন, আনোয়ারার চাইনিজ ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন প্রকল্পে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ১০ বছর ধরে প্রকল্পটি আটকে ছিল। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যেই এ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রায় সব প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হয়েছে। এতে চীনা বিনিয়োগের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। আমার জানামতে, এখন পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি এ জোনে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় আমি তার সঙ্গে ছিলাম। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বড় বিনিয়োগ ফোরামে তিনি অংশ নেন এবং দালিয়ানে চীনের বেশ কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন। আমিও চীনের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী চীন : সংবাদ সম্মেলনে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, চীন যেকোনো দেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী। যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে বাংলাদেশের পাশে আছে চীন।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল– আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার পর, স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যেকোনো ধরনের বিদেশি হস্তক্ষেপ চীন প্রত্যাখ্যান করবে। আপনি কি এটি ব্যাখ্যা করতে পারেন? এমন প্রশ্নের জবাবে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নয়, আমাদের বৈদেশিক নীতি হলো– চীন যেকোনো দেশে যেকোনো বিদেশি হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী।
নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’ গঠন : চীন–বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার যাত্রায় কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে সমন্বয় সাধনের জন্য নতুন ‘প্ল্যাটফর্ম’ গঠনের আলোচনা চলার কথা বলেছেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের লক্ষ্যে চীন–বাংলাদেশ কমিউনিউটি’। এটা সহযোগিতার নতুন সংজ্ঞায়ন। তার মানে হচ্ছে, সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতা। সুতরাং এই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সহযোগিতার সমর্থনে আমাদের কিছু ব্যবস্থাপনা দরকার।’
রাষ্ট্রদূত বলেন, সেই ব্যবস্থাপনা তৈরির জন্য ‘রাজনৈতিক পর্যায় থেকে’ দুটি নতুন প্ল্যাটফর্ম গঠনের কথা এসেছে দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে। একটি হল, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কৌশলগত সংলাপ। আরেকটি কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে ‘টু প্ল্যাস টু’ আলোচনার প্ল্যাটফর্ম অনুসন্ধান।
জাতিসংঘের পরবর্তী অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের আসার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, তার মানে হচ্ছে, দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর কৌশলগত দিক নিয়ে আরও বেশি করে আলাপ করবেন।
অন্য প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, ‘টু প্লাস টু’র মানে হচ্ছে, চীন শুধু রাজনৈতিক আলোচনা ও সংলাপ করবে না, বিস্তৃত প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও আমাদের রয়েছে। সুতরাং এই প্ল্যাটফর্মের কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতকে উভয় দেশ কীভাবে দেখে, সেটার আরও সমন্বয় সাধন হবে। এর মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে আমাদের কৌশলগত যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়বে। কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে ‘টু প্লাস টু’ হবে, তা নিয়ে আলোচনা সামনের দিনে চলার কথা বলেন ইয়াও ওয়েন।
প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘চায়না–বাংলাদেশ কমিউনিটি উইথ শেয়ার্ড ফিউচার’ হিসাবে উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বিবেচনার ক্ষেত্রে এটি চীনর সর্বোচ্চ পর্যায়।
এক প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সম্পর্ক ২০টির বেশি দেশের সঙ্গে রয়েছে চীনের। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশ এল এই তালিকায়।
তিস্তা প্রকল্পে বাংলাদেশ চাইলে চীন দ্রুত এগোবে : ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন জানিয়েছেন, তিস্তা নদী প্রকল্পটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প। তিস্তা প্রকল্প বাংলাদেশ যত দ্রুত চাইবে, চীন তত দ্রুতই এগোবে।
তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের উদ্বেগ থাকতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, তিস্তা নদী প্রকল্পটি বাংলাদেশের নিজস্ব প্রকল্প। এখানে চীনের সহযোগিতা বা এন্টারপ্রাইজের বিষয়টি বাংলাদেশ পারস্পরিক স্বার্থ–সংশ্লিষ্ট বা লাভজনক হিসেবেই বিবেচনা করবে। এটি মূলত মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি সহযোগিতা, যার সঙ্গে এই নদীর অববাহিকায় বসবাসকারী ১০ লাখেরও বেশি মানুষের জীবন–জীবিকা জড়িয়ে আছে।
মূলত এই উদ্দেশ্যেই চীন সহায়তা দিতে আগ্রহী; কারণ এটি বাংলাদেশের মানুষের, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের একটি বড় প্রয়োজন।
জে–১০সি যুদ্ধবিমান কেনা প্রসঙ্গে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফর ঘিরে বেইজিং থেকে বাংলাদেশের জে–১০সি যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছে। এ বিষয়ে এক প্রশ্নে কোনো মন্তব্য না থাকার কথা বলেছেন ইয়াও ওয়েন। তিনি বলেন, আপনি নিশ্চয় দেখেছেন, যৌথ বিবৃতিতে উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা গভীর করার বিষয়ে একমত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আলোচনা, সফর ও প্রশিক্ষণ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও একমত হয়েছে। সুতরাং আমি যেভাবে বলেছি, আমাদের সহযোগিতা খুবই সমন্বিত। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা তারই অংশ। কোনো নির্দিষ্ট কেনাকাটার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার মতো জায়গায় আমি নেই। সুতরাং, দয়া করে বুঝুন, আমি কোনো মন্তব্য করার মতো অবস্থানে নাই।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি সরকার গঠনের পর তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে গত ২১ জুন মালয়েশিয়া যান। পরের দিন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে একান্ত ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। সে দিনই প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান চীনের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় শহর তালিয়ানে। সেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে অংশগ্রহণ শেষে বুধবার বিকালে তারেক রহমানের বেইজিংয়ে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে তার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তাদের নিজেদের মধ্যে একান্ত বৈঠকও হয়েছে।
সফর শেষে দুই দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছে বাংলাদেশ ও চীন।
অর্থনৈতিক করিডোর : এদিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীনের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, ভারতসহ অন্যদেরও এখানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে। ভারতকে সঙ্গে নিয়ে চার দেশের এমন করিডোরের প্রসঙ্গ টেনে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাই, এখানেই শেষ নয়। আমরা উন্মুক্ত। আমরা অন্যান্য দেশকেও স্বাগত জানাই, যদি তারা প্রস্তুত থাকে, তাহলে আমরা উন্মুক্ত আছি। কিন্তু এটা তাদের বিষয়, তারা অংশীদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি অপেক্ষা করে দেখবে। বাংলাদেশ–মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে এই অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে নতুন করে সামনে এনেছে বেইজিং। কিন্তু চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ নিয়ে ভারতের ভূ–রাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ–চীন–ভারত–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা বিসিআইএম নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের দিকে সেই উদ্যোগ আন্তঃসরকার স্বীকৃতিও পায়।












