আনোয়ারায় ‘নতুন যুগের’ অপেক্ষা

চায়না ইকোনোমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন ৮শ একর এলাকা, প্রথম পর্যায়ে ৩০ টি চীনা প্রতিষ্ঠান ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে দেড় বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে কারখানা গ্যাস বিদ্যুৎ পানি পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তায় জোর

হাসান আকবর ও এম নুরুল ইসলাম | রবিবার , ১৬ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৫৯ পূর্বাহ্ণ

এক দশকের অপেক্ষা, নানা প্রশাসনিক জটিলতা ও স্থবিরতা পেরিয়ে অবশেষে বাস্তবে নির্মাণের পথে যাত্রা শুরু করেছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বহুল প্রত্যাশিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)। প্রায় ৮০০ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চলের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে গত ২৭ জুলাই। এর পরপর বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সাবলিজ চুক্তি, ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টারের উদ্বোধন এবং ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রকল্পটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে এই ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে কারখানা উৎপাদনে যাবে।

সরেজমিনে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে। এই শিল্পজোনকে ঘিরে চীনা বিনিয়োগকারীদের মাঝে আগ্রহ দেখা দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিনিয়োগের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে ইতোমধ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চায়না ইকোনমিক জোন ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আলোর মুখ দেখা এই চীনা শিল্পজোনে আশার কথা শুনিয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী ১৮ মাসের মধ্যে এই শিল্পাঞ্চলের প্রথম কারখানায় উৎপাদন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় প্রকল্পের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনায় প্রথম কারখানা দ্রুত চালুর বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়। শুরুতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি ধারণা দিলেও ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদন শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা।

চীনের সঙ্গে জিটুজি (সরকারটুসরকার) সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠছে বিশেষায়িত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রায় ৭৮৩ একর জমির ওপর এর অবস্থান কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে, আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায়। একদিকে কর্ণফুলী টানেল, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় শিল্প ও লজিস্টিকসের দিক থেকে প্রকল্পটির অবস্থানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পটির সহায়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ইতোমধ্যে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার একটি প্রকল্প একনেকের অনুমোদন লাভ করেছে। এর মধ্যে চীনের কাছ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা আসার কথা রয়েছে। বাকি অর্থের জোগান দেবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের আওতায় অভ্যন্তরীণ সড়ক, জেটি সংযোগ সড়ক, পানি সংরক্ষণাগার, গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামো, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার, বহুমুখী জেটি, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সীমানাপ্রাচীর এবং বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, এখানে মূলত রপ্তানিমুখী শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। বস্ত্র ও তৈরি পোশাক, ওষুধ, হালকা প্রকৌশলসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাতে চীনা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উচ্চপ্রযুক্তি ও কৌশলগত শিল্পে বিনিয়োগের জন্যও চীনা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বেশ কয়েকটি কোম্পানি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। ২৭ জুলাই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ৭০ জন চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধির উপস্থিতি প্রকল্পটিকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছে। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন কোনো না কোনো চীনা বিনিয়োগকারী প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন এবং বিনিয়োগের আগ্রহ নিয়ে যোগাযোগ করছেন।

প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় এই প্রকল্প নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল। আনোয়ারায় জমি অধিগ্রহণের পর বেজা চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে (সিএইচইসি) ডেভেলপার হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ডেভেলপার চুক্তি ও ভূমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় উদ্যোগটি আটকে যায়। ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনকে (সিআরবিসি) নতুন ডেভেলপার হিসেবে সামনে আনা হয়। ২০২৩ সালে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রকল্পের বহিরাগত অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব দেওয়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রকল্প এলাকায় প্রাথমিকভাবে কিছু কাজ হয়েছিল। প্রায় ৬০ একর জমি প্রস্তুত করা, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, প্রশাসনিক ভবন স্থাপন এবং সীমিত পানি ও গ্যাস অবকাঠামো তৈরির মতো কাজ এগিয়েছিল। কিন্তু কারখানা স্থাপন বা বড় ধরনের শিল্প অবকাঠামো নির্মাণ শুরু না হওয়ায় প্রায় এক দশক ধরে প্রকল্প এলাকাটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল।

সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে স্থবিরতা বিরাজ করছিল তার অবসান হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, এই প্রকল্প বাংলাদেশচীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এবং এটি বাংলাদেশের শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়তা করবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, প্রকল্পটির অন্যতম তাৎপর্য হলো চট্টগ্রামের শিল্প ও লজিস্টিকস খাতের সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া। কর্ণফুলী টানেল চালুর পর নদীর দক্ষিণ পাড়ের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় শিল্পায়নের সম্ভাবনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইতোমধ্যে কোরিয়ান ইপিজেডসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এ অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর সঙ্গে চায়না ইকোনমিক জোন যুক্ত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামে শিল্পকারখানা, পরিবহন, আবাসন, গুদামজাতকরণ, ব্যাংকিং, বীমা, খাবার ও অন্যান্য সেবা খাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটি নিয়ে আশায় ছিলাম। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আমাদের আশা পূরণ হয়নি। এখন যেন প্রকল্পটি কোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়ে সেই কামনা করছি। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বাইরে রাস্তার পাশে কিছু দোকান গড়ে উঠেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, আমরা আশা করছি অচিরেই একটি জমজমাট ইকোনমিক জোন দেখতে পাব। এতে আমাদের সন্তানদের কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার নতুন বাজার তৈরি হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবার পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভিন্ন। অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডেভেলপার নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। একনেকের অনুমোদন, চীনা অর্থায়নের ব্যবস্থা এবং আনুষ্ঠানিক নির্মাণ উদ্বোধনের পর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আগামী দেড় বছরের মধ্যে প্রথম কারখানাটি উৎপাদনে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তারা বলেন, অচিরেই এই কারখানার নির্মাণকাজ শুরু হবে। স্টিল স্ট্রাকচারের ভবন নির্মাণে খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না। এটি চীনা কোম্পানির ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। চীনা প্রযুক্তির ব্যবহারই এই প্রকল্পকে লক্ষ্যমাত্রায় নিয়ে যাবে।

তারা বলেন, শুধু বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান নয়, চায়না ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ভূগোলও বদলে দিতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী টানেল ও বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে এটি একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিকস হাবে পরিণত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে রূপ নিতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি গ্যাসবিদ্যুৎপানি সরবরাহ, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, যোগাযোগ এবং বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার প্রকল্পটির ব্যাপারে আন্তরিক উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে বলেন, বর্তমান সরকার সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বিনিয়োগকে। সরকারের কাছে প্রথম ও শেষ কথা হচ্ছে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, উৎপাদন বাড়বে এবং দেশের অর্থনীতির গতি আরো ত্বরান্বিত হবে। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য নিয়ে সরকার অগ্রসর হচ্ছে তা অর্জনে চায়না ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

একইভাবে চীন সরকারও প্রকল্পটি নিয়ে উচ্ছ্বসিত। চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে উদ্ধৃত করে সূত্রটি জানায়, চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন চীনবাংলাদেশ সহযোগিতার একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টা ও পারস্পরিক আস্থার প্রতিফলন। প্রকল্পটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করাবে। চীনের বিভিন্ন উন্নত মানের প্রতিষ্ঠানকে এখানে বিনিয়োগে ওই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যা এই শিল্পাঞ্চলকে নতুন মাত্রা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধচট্টগ্রামে এখনো চাহিদার অর্ধেকের কম গ্যাস
পরবর্তী নিবন্ধরামুতে ২ লাখ ইয়াবা উদ্ধার