রাঙামাটির সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজারসহ কয়েকটি স্থানে গতকাল বৃহস্পতিবার সড়ক অবরোধ করে ইউপিডিএফ ‘ঘনিষ্ঠ’ স্থানীয় দুটি সংগঠন। এতে করে আটকা পড়েন সাজেক ফেরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক। তাদের উজোবাজার এলাকা থেকে সরিয়ে আনার পর বেলা ১১টার দিকে সেখানে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এরপর থেকে সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যদিও, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা জানিয়েছে জেলা পুলিশ। এ ঘটনার জেরে আগামীকাল শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ ডেকেছে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদ নামে পাহাড়িদের একটি সংগঠন।
এদিকে, বৃহস্পতিবার বিকালে এক বিবৃতিতে আইএসপিআর জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় জনগণকে জোরপূর্বক ‘মানবঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ এবং পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় সাজেক–বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাজেকে ভ্রমণরত প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আটকা পড়া পর্যটকদের নিরাপদে খাগড়াছড়িতে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে সকাল আনুমানিক ১০টায় গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে পর্যটকবাহী যানবাহনের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় সেনাবাহিনী ও পুলিশের টহল দল পর্যটকদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবরোধকারীদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়। আলোচনা চলাকালে, সকাল আনুমানিক ১০টা ৪৫টার দিকে ইউপিডিএফের প্ররোচনায় অবরোধকারীরা আকস্মিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জের মাধ্যমে অবরোধকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং যানবাহনের চলাচলের ব্যবস্থা করে।
আইএসপিআর আরও জানায়, পরবর্তীতে বেলা আনুমানিক ১১টায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০–৪০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর টহল দল আত্মরক্ষা ও পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং এ ঘটনায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এদিকে বিকালে রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব নিজ কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সকালে পর্যটকরা সাজেক ভ্যালি থেকে রওনা হয়ে উজোবাজার এলাকায় পৌঁছালে অবরোধকারীরা তাদের আটকে দেয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবরোধকারীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে অবরোধকারীরা সেনাবাহিনী ও পুলিশে ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পর্যটকদের গাড়ি যখন সামনের দিকে অগ্রসর হয় তখন ইউপিডিএফ পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পরে পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী ও পুলিশ পাল্টা গুলি করে।
পুলিশ সুপার বলেন, পর্যটকদের নিরাপদে চলে যাওয়ার পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ১১টা থেকে প্রায় ১টা পর্যন্ত গোলাগুলি চলতে থাকে। ১টার পর থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং বর্তমানে সাজেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় কোনো পর্যটক আহত হয়নি। তবে অবরোধকারীদের ইটের আঘাতে সেনাবাহিনীর ৪ হতে ৫ জন আর পুলিশের ২ জন সদস্য আহত হয়েছে।
ইউপিডিএফের বক্তব্য : এদিকে, উজোবাজারে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনাকে ‘সর্বৈব মিথ্যা ও বানোয়াট’ দাবি করেছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। বৃহস্পতিবার দুপুরে এক বিবৃতিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার জনগণের সঙ্গে কথা বলে এমন খবরের সত্যতার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি। মূলত জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসীর চলমান শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বানচাল করার অপচেষ্টার অংশ হিসেবে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা নিজেরা একতরফা বিভিন্ন দিকে গুলি বর্ষণ করেছে।
শনিবার দুই জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ : রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের উজোবাজারে আইন–শৃঙ্খলাবাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনার জেরে শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা সড়ক অবরোধ ডেকেছে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদ নামে পাহাড়িদের একটি সংগঠন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংগঠনটি। ছাত্র– জনতার সংগ্রাম পরিষদ সংগঠনটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
বিবৃতিতে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার রাঙামাটির সাজেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে ডাকা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধে হামলা, লাঠিচার্জ ও ঘরবাড়ি–দোকান ভাঙচুরের প্রতিবাদে এবং সাজেকবাসীর ন্যায্য দাবির সমর্থনে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদ আগামীকাল (২৪ অক্টোবর) শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় আধাবেলা শান্তিপূর্ণ সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে।
বিবৃতিতে ছাত্র–জনতার সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি উষাতন চাকমা জানান, শনিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথ অবরোধ চলবে। অবরোধের সময় অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী গাড়ি, শববাহী যান, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন ও সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে।
প্রসঙ্গত, সাজেক থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) ‘সশস্ত্র সদস্যদের’ সরিয়ে নেয়াসহ তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবিতে বৃহস্পতিবার থেকে আবারও তৃতীয় দফায় রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ ডাকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন নামে স্থানীয় দুটি সংগঠন। তবে সংগঠন দুটি পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ ঘনিষ্ঠ। সাজেকে জনসংহতি সমিতির সদস্যদের সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগটি বরাবরই অসত্য বলে আসছে জনসংহতি সমিতি। এ নিয়ে তিন দফায় অবরোধ কর্মসূচির জেরে এখন থমথমে সাজেক উপত্যকা।












