পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসন জরুরি

| বৃহস্পতিবার , ৫ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ

সামপ্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে তৈরি পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে যে তীব্র আন্দোলন ও অস্থিরতা শুরু হয়েছে, তা নিয়ে সারাদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শত শত কারখানা বন্ধ। হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক রাস্তায়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়িতে আগুন জ্বালানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়ে গেল অল্প সময়ে। শ্রমিকদের দাবি ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। অনেকে এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করছেন। আবার অনেকে দেখতে চাইছেন দাবির যৌক্তিকতা কতটা। এরইমধ্যে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পর আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই–এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন। তাঁদের অভিযোগ– মূলত একটি গোষ্ঠী দেশকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছেন। তারা দেশের অর্থনীতি পঙ্গু করতে পোশাকশিল্পকে বেছে নিয়েছেন। কারণ পোশাকশিল্প অর্থনীতির মেরুদণ্ড। খুব সহজেই এই শিল্পের সহজ–সরল শ্রমিকদের মোটিভেট করা যায়।

বলা বাহুল্য, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয়েছিল। তারপর যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, গ্যাস–সংকট ইত্যাদি মিলিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অনেক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। এভাবে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর টানা মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ সাড়ে চার বছর ধরে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় প্রতি মাসেই কমেছে। খরচ বেড়েছে ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ, বেতন বেড়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বেতনে প্রতি ১ টাকা বৃদ্ধির বিপরীতে খরচ বেড়েছে ৩ টাকা।

মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকাগুলোতে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছেন। তাদের এই দাবির পেছনে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতার নেপথ্যে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা। রোববার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। ওই ঘটনা ও দায়ীদের বিস্তারিত পরিচয়সংবলিত প্রতিবেদন সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কাছে রয়েছে। জড়িতদের অনেককে গ্রেফতার ও বাকিদের নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার লক্ষ্যে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসাবে পরিচিত গার্মেন্টশিল্পকে টার্গেট করেছেন তারা। মজুরি বাড়ানোর শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নাশকতাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন। এমনকি রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন মেট্রোরেল, কেপিআইভুক্ত এলাকায় অগ্নিসংযোগ করে আতঙ্ক ছড়ানো এবং বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন নেপথ্যে থাকা এসব ব্যক্তি। গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শিল্প এলাকার মেট্রোরেল, ব্যাংক ও স্পর্শকাতর স্থাপনায় হামলা হতে পারে। এমনকি গুজব ছড়িয়ে সহিংস ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কাও করা হচ্ছে। এ অবস্থায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে।

তবে ভালো মজুরি প্রাপ্তি উৎপাদনের জন্য সুসংবাদ এনে দেয়। অর্থনীতিবিদ জর্জ আকারলফ, কার্ল শাপিরো ও জোসেফ স্টিগলিৎসের ‘দক্ষতা মজুরি’ তত্ত্ব বলে, ভালো মজুরি পেলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ে, চাকরি ছেড়ে যাওয়ার হার কমে, প্রশিক্ষণের খরচ বাঁচে। অর্থনীতিবিদ ডেভিড কার্ড ও অ্যালান ক্রুগার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে দেখিয়েছিলেন, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর পর কর্মসংস্থান কমেনি। এই গবেষণার ধারায় কার্ড ২০২১ সালে নোবেল পান। জন রলসের ন্যায়তত্ত্বে বলে, সমাজে অসমতা তখনই ন্যায্য, যখন তা সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের উপকারে আসে। খাতটি চার দশকে কোটি কোটি ডলারের হয়েছে। সেই সমৃদ্ধিতে কি সবচেয়ে নিচের মানুষটির জীবন ভালো হয়েছে? নাকি সাড়ে চার বছর ধরে খারাপ হয়েছে? এজন্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিকদেরও মনে রাখতে হবে, কারখানা ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনা তাদেরই সম্পদ। এগুলো ধ্বংস হলে দিনশেষে তাদের কর্মসংস্থানই হুমকির মুখে পড়বে। কাজেই যে কোনো প্ররোচনা থেকে নিজেদের সম্পূর্ণ মুক্ত রেখে নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি পথে দাবি আদায়ের চেষ্টা করতে হবে। সবার সম্মিলিত ও আন্তরিক প্রচেষ্টাতেই পোশাকশিল্পের চলমান সংকট নিরসন এবং একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে