চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) কাছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রস্তাবিত বাৎসরিক পৌরকর ছিল ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ ৯২ হাজার ৮৬৮ টাকা। যা উভয় সংস্থা যৌথ সার্ভের মাধ্যমে নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে চবক নির্ধারিত পৌরকরের বিপরীতে মাত্র ৫০ কোটি পরিশোধ করার প্রস্তাব দেয়। চসিক তা না মানলে বিভাগীয় কমিশনারের আদালতে আপিল করে চবক। গতকাল সোমবার আপিলের চূড়ান্ত রায় দেয়া হয়। রায় অনুযায়ি, বন্দরকে ২০২৫–২০২৬ অর্থবছর থেকে বাৎসরিক ২২৪ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৭ টাকা পৌরকর পরিশোধ করতে হবে।
চসিক সূত্রে জানা গেছে, এ রায়ের মধ্য দিয়ে পৌরকর ইস্যুতে চসিক–বন্দরের র্দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসান হল। একইসঙ্গে একক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে থেকে সর্বোচ্চ রাজস্ব পাবে পাবে চসিক। চসিকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৯৪–১৯৯৫ অর্থবছর থেকে চবক কখনোই পঞ্চবার্ষিকী করপুনর্মূল্যায়ন এর আলোকে চসিকের প্রস্তাবিত পৌরকরের পুরোটা পরিশোধ করেনি। সাবেক মেয়রদের অনেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হন। কেউ ‘অজ্ঞাত কারণে’ চবককে ছাড়ও দেন। অবশেষে দীর্ঘ ৩০ বছর পর বর্তমান প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন–এর উদ্যোগে চসিকের প্রস্তাবিত পৌরকরের প্রায় পুরোটায় (৮৫ শতাংশ) আদায়ের পথ তৈরি হল।
এ বিষয়ে প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, আমরা যৌক্তিকভাবেই তাদের ২৬৪ কোটি টাকার ট্যাক্স ধার্য করেছি। এখানে বিভাগীয় কমিশনার যে ১৫ পার্সেন্ট কমিয়েছেন, এটাও আমার মনে হয় তাদেরকে দয়া করা হয়েছে। ‘রাজস্ব বাড়লে, জনগণ কী সুফল পাবে’ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্পোরেশনের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতনও বেড়ে গেছে, অনেককে স্থায়ী করেছি, বেতন স্কেলও বেড়ে গেছে অনেকটা। আগে যে বেতন ছিল, এখন ২০–৩০ শতাংশ বেতন বেড়ে গেছে। শিক্ষা খাতে ব্যয় বেড়েছে। আমরা এখন নতুন নতুন কিছু ভবনও করে দিচ্ছি, যেগুলো জরাজীর্ণ ছিল। এছাড়া নগরে যেখানে রাস্তাঘাট নেই, সেখানে রাস্তাঘাট করে দিচ্ছি। অলিগলিতে রাস্তাঘাট করে দেওয়ার প্ল্যান আছে। ওভারঅল একটা নগরের নগরায়ণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়বে।
তিনি বলেন, শহরের অধিকাংশ রাস্তা ৬–১০ টন বোঝার গাড়ির জন্য নির্মাণ করা হলেও বন্দরের পণ্যবাহী ৫০–৬০ টনের বোঝা নিয়ে গাড়ি চলাচল করছে। বন্দরে পণ্য আনা–নেওয়া করা হাজার হাজার ট্রাক, লরিসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করায় শহরের অভ্যন্তরীণ রাস্তাঘাট দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর, জেটি হতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সড়কে অসংখ্য ভারী যানবাহন চলাচল করে। বন্দরমুখী সড়কগুলো এ কারণেই প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে। বন্দরের ভারী যানবাহনের কারণে নিয়মিত রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিবছর কর্পোরেশনের অতিরিক্ত ৪০০–৫০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। তাই বন্দরের উচিত ন্যায্য পৌরকর পরিশোধ করে নগরের রাস্তাঘাট সংস্কারে ভূমিকা রাখা।
এ বিষয়ে চসিকের চসিব মো. আশরাফুল আমিন আজাদীকে বলেন, বন্দর রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস। তাদের গাড়ির জন্য আমাদের রাস্তাঘাট নষ্ট হচ্ছিল। সে হিসেবে ন্যায্যা হিস্যা পাচ্ছিল না চসিক। অবশেষ প্রশাসক মহোদয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় রাজস্ব ২২৪ কোটি টাকা নির্ধারিত হল।
যেভাবে ২২৪ কোটি নির্ধারণ করা হয় : চসিক সূত্রে জানা গেছে, বকেয়াসহ ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা পৌরকর পরিশোধে ২০২৫ সালের ১০ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিল দেয় চসিক। এর মধ্যে নির্ধারিত হাল পৌরকর ধরা হয় ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এরপর ২৭ জুলাই বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়ে চলতি অর্থবছরের পৌরকর পরিশোধে আপত্তি জানায়। বন্দরের দাবি, চলতি অর্থবছরে পৌরকর খাতে কোনো বকেয়া নেই। এরপ্রেক্ষিতে ১১ আগস্ট বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে চবকের বিভিন্ন স্থাপনা পুর্নমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা জানায় চসিক। এরপ্রেক্ষিতে যৌথ সার্ভে করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, যৌথ সার্ভেতে বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট ১ কোটি ৭৩ লক্ষ ৪৬ হাজার ৪৯১ বর্গফুট স্থাপনা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে আবাসিক স্থাপনা রয়েছে ১৭ লক্ষ ২৪ হাজার ১০৬ বর্গফুট। এছাড়া ১৬ লক্ষ ৩৫ হাজার ৩৭৯ বর্গফুট অনাবাসিক এবং ১ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৭ হাজার ৬ বর্গফুট ইয়ার্ড ও স্টোরেজ রয়েছে। স্থাপনার বিপরীতে বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডেলিং, পোর্ট ডিউটি, বার্থিং–আনবার্থিং, পাইলোটেজ, টাগবোট ও লেট ফি’সহ বিভিন্ন ভাড়া ও আয়ের ভিত্তি করে এবং বন্দরের সক্ষমতার উপরের বিবেচনা করেই চসিক ২৬৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পৌরকর নির্ধারণ করে।
যৌথ সার্ভের জন্য গঠিত কমিটির একটি সভা হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেখানে নির্ধারিত পৌরকরের বিপরীতে বন্দর মাত্র ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করার প্রস্তাব করে। কিন্তু চসিক পুরোটা আদায়ে অনড় থাকে। পরে কমিটির সভার সিদ্ধান্ত ও ১১ মার্চ বন্দরের বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এপ্রিল মাসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) মো. সামীমুজ্জামান একটি চিঠি দেন। পরে ২০ এপ্রিল নৌ–পরিবহন মন্ত্রণালয় বন্দরকে জানিয়ে দেয়, ‘কর সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম আইন ও বিধান অনুযায়ী নির্ধারণ হয়। তাই সেখানে নৌ–পরিবহন মন্ত্রণালয়–এর কিছু করার এখতিয়ার নেই।’ ওই চিঠিতে চসিককে পৌরকর পরিশোধ করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়।
অতঃপর আপিল : গত ২৯ জুন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চসিককে ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরের পৌরকর বাবদ ১৯৮ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার ৬৫১ টাকা পরিশোধ করে, যা প্রস্তাবিত পৌরকরের ৭৫ শতাংশ। এরপর বিভাগীয় কমিশনার আদালতে আপিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। গতকাল বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালক মনোয়ারা বেগম চূড়ান্ত রায় দেন। রায়ে বলা হয়, ‘২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে আদালত কর্তৃক নির্ধারিত চূড়ান্ত মূল্যায়ন অনুযায়ী বার্ষিক কর ২২৪ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৭ টাকা’।
প্রশাসকের উদ্যোগ : ২০১৭ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চসিকের প্রস্তাবিত পৌরকর ছিল ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা। যা চসিকের সাবেক মেয়র কমিয়ে ৫০ কোটি টাকা করে দেন। কিন্তু বন্দর পরিশোধ করে ৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ শতাংশ সারচার্জ মওকুপের সুবিধা নিয়ে পরিশোধ করে মাত্র সাড়ে ৪০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত চসিকের সাধারণ সভায় তা অনুমোদনও দেয়া হয়।
দায়িত্ব নেয়ার পর ডা. শাহাদাত হোসেন পুরোটা আদায়ের উদ্যোগ নেন। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর চবক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেন তিনি। এতে অর্থবছরে (২০২৪–২০২৫) বন্দরের পরিশোধিত অংক বাদ দিয়ে বাকি ১১৫ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। পত্রে বলা হয়, ২০২৪–২০২৫ অর্থবছর থেকে ১৬০ কোটি ১৬ লাখ ৪১ হাজার টাকা পৌরকর ধার্য করা হয়।
এরপর ২০২৫ সালের ২২ জানুয়ারি নৌপরিবহন সচিবকেও চিঠি দেয় চসিক। এতে চসিকের প্রস্তাবিত পৌরকর পরিশোধে চবককে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করতে বলা হয়। এর প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল চসিককে আপাতত ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করার নির্দেশনা দিয়ে চবক চেয়ারম্যানকে দাপ্তরিক পত্র দেয় নৌ–পরিবহন মন্ত্রণালয়।
জানা গেছে, ১৯৯৪–৯৫ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা পৌরকর দাবি করলেও চবক ৫ কোটি টাকা পরিশোধ করত। তবে ২০০১–০২ অর্থবছরে চসিক বকেয়া ১৯৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা দাবি করে। ওই সময়ে বন্দরের আপত্তিতে চসিক অনড় থাকায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে। পরে দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে চবক ২০১২ সালে ১১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করে চসিককে।












