তুরাগ নদে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ উদ্ধারের ঘটনায় অবশেষে মামলা করলেন তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। এ মামলায় তার বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে ৪ দিনের রিমান্ডে পেয়েছে নৌ পুলিশ। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস গতকাল শনিবার এ আদেশ দেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই সাইফুল ইসলাম। খবর বিডিনিউজের।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ–পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আসামিকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে তদন্তে সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ মামলার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সমাপ্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে কারাগারে আটক রাখা একান্ত প্রয়োজন।
রাষ্ট্রপক্ষে কৌঁসুলি আজিজুল হক দিদার রিমান্ড আবেদনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। দীপের পক্ষে মনিরুল ইসলাম ও মুতাসিম বিল্লাহ রিমান্ড আবেদন বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। শুনানি নিয়ে আদালত তার চার দিনের রিমান্ডের আদেশ দেয়। এদিকে রিমান্ডের আদেশ হওয়ার পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় দীপ এক স্বজনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি ফুললি স্ট্রং।’ তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা না করার কথা বলেন দীপ। রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাহসিফকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
এর আগে দীপকে বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছিল পিবিআই। তিন দিনেও মামলা না হওয়ায় তাকে নিয়ে কী সিদ্ধান্ত হবে, সেই আলোচনার মধ্যে শুক্রবার রাতে তাকে নৌ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা মামলা করার পর দীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ধারণকারী হিসেবে আলোচনায় থাকা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ বুধবার বিকালে তুরাগের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তিনি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দীপের ডাকে বাসার নিচে নামেন এবং নিজের বাইক নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গিয়েছিলেন। দীপ বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে উত্তরা হাউজবিল্ডিং এলাকা থেকে তাহসিফের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান। রাতেই মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পিবিআই। তার দেওয়া তথ্যেই শুক্রবার সকালে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে তাহসিফের বাইকটি উদ্ধার করা হয়। মাদকস্পট হিসেবে পরিচিত ওই এলাকায় মধ্যরাতে তাহসিফের সঙ্গে যাওয়ার কথা স্বীকারও করে দীপ। একপর্যায়ে তাকে নিয়ে শুক্রবার টঙ্গীর ওই এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছিলেন পিবিআই কর্মকর্তারা।
এদিকে তুরাগ নদে বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির ভাসমান লাশ উদ্ধারের ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা হলেও মামলার আবেদনে সরাসরি হত্যার অভিযোগের কথা বলেননি বাবা কে এম এনায়েতুল করিম। উত্তরখান থানায় করা শুক্রবার গভীর রাতে ওই আবেদনে তিনি ছেলের মৃত্যুর কারণ উদঘাটন পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এর বাইরে ছেলের নিখোঁজের পরদিন লাশ উদ্ধারের প্রেক্ষাপট এবং পরে ময়নাতদন্ত ও দাফনের বাইরে কোনো সন্দেহ বা ধারণার কথাও বলেননি। পরে সেই আবেদনটিকেই এজাহার হিসেবে আমলে নিয়ে ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা যুক্ত করে মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পুলিশ। দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মূলত একাধিক ব্যক্তির পূর্বপরিকল্পনায় সংঘটিত হত্যা, ২০১ ধারায় আলামত ধ্বংস এবং ৩৪ ধারায় যৌথ অপরাধমূলক অভিপ্রায়ের অভিযোগ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। কারো বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কথা ওই আবেদনে না থাকায় আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামাদের।
গতকাল শনিবার দুপুরে নিজ বাসা উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এনায়েতুল করিম নিজেও এই আবেদনের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, একটা আবেদন করেছি উত্তরখান থানা বরাবর। আমি তাদেরকে জানিয়েছি আমার ছেলের মৃত্যুর কারণটা উদঘাটনের জন্য। সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন জানিয়েছি।
ছেলে তাহসিফের সঙ্গে সবার সম্পর্ক ভালো ছিল এবং অন্যের যে কোন সমস্যায় ছুটে যেত জানিয়ে তিনি বলেন, এমন ছেলের এমন দুর্ঘটনা আমরা মেনে নিতে পারছি না। আমরা আশা করি যে, যাতে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হয়। রাষ্ট্র তার বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে তদন্ত করে জড়িতদের যেন বিচারের আওতায় আনে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা যেন আর না ঘটে। একজন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার প্রত্যাশা। দীপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, ছেলেটির তাদের বাসায় যাতায়াত ছিল। পিবিআইয়ের তদন্তে স্বীকার করেছে তারা টঙ্গীতে গিয়েছিল। কিন্তু দীপ আমাকে বলেছিল যে, এই কম্পাউন্ডে (তাহসিফের বাসা এলাকা) রেখে গিয়েছিল, বিষয়টা প্রশ্নবিদ্ধ। আমি জানি না কে জড়িত বা কে কি করেছে বুঝতে পারছি না।
আসল সত্য উদঘাটন চায় রাওয়া : বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আসল সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনী কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতি–রাওয়া। গতকাল শনিবার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন রাওয়ার নেতারা।










